—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন ঘিরে নতুন বিতর্ক।
বিবেচনাধীন পরিস্থিতির আগে ভোটার আর্জির নিষ্পত্তি এবং বিচারকদের হাতে বিবেচনাধীনদের নিষ্পত্তির পরিসংখ্যান দিয়ে অনেকেই দাবি করছেন, এই দুই পর্বে নাম বাদ যাওয়ার হারের মধ্যে কার্যত আকাশপাতাল পার্থক্য। রাজনৈতিক বিরোধিতা তুঙ্গে না উঠলে আরও মানুষের নাম ভোটার তালিকায় থাকতে পারত। তবে পাল্টা যুক্তিতে বলা হচ্ছে, এই তুলনামূলক পরিসংখ্যান দেখিয়ে কোনও দাবি করা অর্থহীন। কারণ যে অংশের নিষ্পত্তি ইআরও-এইআরও স্তরে আটকে থাকার কারণে জটিলতা বাড়ছিল, শীর্ষ আদালত হস্তক্ষেপ না করলে সেই অংশের যোগ্য ভোটারদের তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগই থাকত না।
কমিশনের তথ্য বলছে, বিবেচনাধীন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগে যে ৯০ লক্ষের নিষ্পত্তি হয়েছিল, তার মধ্যে প্রায় সাড়ে ৫% বা প্রায় ৫ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছে। আর পরের পর্বে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত যে প্রায় ৫২ লক্ষ বিবেচনাধীনের নিষ্পত্তি হয়েছে, তার মধ্যে প্রায় ৪০% (প্রায় ৮ গুণ বেশি) নাম বাদ গিয়েছে। সংখ্যার হিসাবে যা প্রায় ২০.৮০ লক্ষ। এই দুই দফার মাঝে ঘটে গিয়েছে কমিশন-রাজ্য সরকারের টানাপড়েন। সেই সূত্র ধরে হয়েছে আইনি লড়াই। তথ্যগ্রাহ্য অসঙ্গতির আওতায় থাকা প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারের ভবিষ্যৎ বিচারকদের হাতে যাওয়ার নির্দেশকে স্বাগত জানিয়েছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী। যদিও কমিশনের সূত্রে পাল্টা দাবি, আদালতে না গেলে নাকি সমস্যায় পড়তে হত না ভোটারদের একাংশকে।
খসড়া ভোটার তালিকায় নাম ছিল প্রায় ৭.৬৬ কোটি ভোটারের। তা থেকে মৃত, ঠিকানা বদল, অনুপস্থিত এবং ডুপ্লিকেট ভোটার মিলিয়ে বাদ যায় প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম। এর পরে প্রায় ৩২ লক্ষ ছিলেন ‘আন-ম্যাপড’ ভোটার এবং প্রায় ১.২০ লক্ষ ছিলেন তথ্যগ্রাহ্য অসঙ্গতির আওতায়। এমন ব্যক্তিদের শুনানির নোটিস পাঠায় কমিশন। তাতে প্রাথমিক ভাবে শুনানিতে অংশ নেওয়া ৯০ লক্ষের নিষ্পত্তি করেন ইআরও এবং এইআরও-রা। নাম বাদ যায় প্রায় ৫ লক্ষের। তার পর বাকিদের নিষ্পত্তির কাজ কার্যত থমকে যায়। পরিস্থিতি এমন হয়, যেখানে সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে বাকি অংশের ভোটারদের নামই তালিকার বাইরে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। রাজ্য প্রশাসন এবং কমিশনের টানাপড়েন দেখে ১৪২ ধারার প্রয়োগ করে শীর্ষ আদালত এবং বাকি প্রায় ৬০ লক্ষ তথ্যগ্রাহ্য অসঙ্গতি নিষ্পত্তির দায়িত্ব দেওয়া হয় বিচারকদের।
অভিজ্ঞ কর্তাদের একাংশের দাবি, কমিশনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়ে, সমন্বয়ের দিকটি ঠিক রেখে, ইআরও-এইআরওদের উপর রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক প্রভাবের অভিযোগ উঠতে না দিলে গোটা ব্যবস্থা রাজ্যের আধিকারিকদের দায়িত্বেই থাকত। আধিকারিকরা রাজ্যের মানুষের সুবিধা-অসুবিধা, নানা খুঁটিনাটি অনেক ভাল জানেন ফলে অনেক জটিলতা ছাড়াই ভোটার-দাবির নিষ্পত্তি হতে পারত, প্রাথমিক ভাবে যেমন ঘটেছিল ৯০ লক্ষের ক্ষেত্রে। বিচারব্যবস্থার হাতে বিষয়টি যাওয়ায় যাচাইয়ের গভীরতা এবং নজর— দুটিই বেড়েছে ন্যায্য কারণে। কমিশনেরও নজর বাড়ে খুঁটিনাটি প্রতিটি বিষয়ের উপর। ই-সইয়ের পদ্ধতি বিচারকদের সিদ্ধান্তকেও কার্যত দায়বদ্ধ করে দেয়। সব মিলিয়ে ছোট ত্রুটি বড় আকারে দেখা দেয়।
যদিও আধিকারিকদের অপর একাংশের মতে, পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত। নিষ্পত্তি আটকে থাকায় পুরো প্রায় ৬০ লক্ষের নামই তালিকার বাইরে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। শীর্ষ আদালতের নির্দেশ এই সম্ভাবনাকেই রুখে দিয়েছে। আর নির্বাচন কমিশন তো কার্যত বুঝিয়েই দিয়েছিল যে বাকি বিবেচনাধীনদের আর্জি নিষ্পত্তি সময়ের মধ্যে করা অসম্ভব। তার চেয়েও বড় কথা, ‘ম্যাপড’ ভোটারদের বড় অংশকে তথ্যগ্রাহ্য অসঙ্গতির তালিকায় ফেলে মানুষের দুর্ভোগ তো কমিশনই বাড়িয়েছে। ফলে আদালতে যাওয়ার আগে এবং পরে নাম বাদের তুলনামূলক হার দেখানো ‘রাজনীতি’ ছাড়া কিছু নয়।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে