PM Narendra Modi in Brigade Rally

শুধু হিন্দুত্ব নয়, বাঙালিয়ানায় জোর বিজেপির, শমীক-জমানায় মোদীর ব্রিগেড মঞ্চে দক্ষিণেশ্বর! ‘থিমপুজো’ খোঁচা দিল তৃণমূল

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সফরে আসা বিজেপির বিভিন্ন কেন্দ্রীয় নেতার গলায় ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানের চেয়ে বেশি ধ্বনিত হচ্ছে ‘জয় মা কালী’। সমাজমাধ্যমে বিভিন্ন পোস্টে ‘মা দুর্গা’কেও স্মরণ করছেন তাঁরা।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৩ মার্চ ২০২৬ ২০:৫৭
Share:

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

তৃণমূলের বাঁধা রাজনৈতিক ভাষ্য হল, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের স‌ংস্কৃতির বিরোধী। তাকে ভ্রান্ত প্রমাণ করতে সাম্প্রতিক অতীতে নানা কর্মসূচি নিতে দেখা গিয়েছে রাজ্য বিজেপিকে। তবে শনিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ব্রিগেডের মঞ্চে যা দেখা যাবে, তেমন উদ্যোগ শমীক ভট্টাচার্য জমানার আগে দেখা যায়নি।

Advertisement

মোদীর ব্রিগেডের মঞ্চ তৈরি হয়েছে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আদলে। ১২০ ফুট বাই ৭০ ফুট মঞ্চের মধ্যভাগে ভবতারিণী মন্দিরের অবিকল প্রতিরূপ। শুধু তা-ই নয়, মঞ্চের ডান এবং বাঁ’দিক জুড়ে তুলে ধরা হয়েছে বাঙালির কৃষ্টি, সংস্কৃতি এবং শিল্পের টুকরো টুকরো ছবি। মঞ্চের ঠিক সামনে ‘পাল্টানো দরকার, চাই বিজেপির সরকার’ লেখা বিশাল কাটআউট।

মঞ্চ দেখে অবশ্য খোঁচা দিতে ছাড়েনি রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল। তাদের কটাক্ষ, রাজনৈতিক সভাকে ‘থিম পুজো’র মণ্ডপ করে ফেলেছে বিজেপি। তাদের দাবি, এ সব করেও বাঙালির মন পাবে না পদ্মশিবির।

Advertisement

তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষের কথায়, ‘‘ওটা রাজনৈতিক মঞ্চ না থিমপুজো? দক্ষিণেশ্বর মন্দিরকে থিম করতে চাওয়া বিজেপিকে মনে করিয়ে দিই, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী থাকাকালীন দক্ষিণেশ্বর স্টেশনের টিকিট কাউন্টারটিই ভবতারিণীর মন্দিরের আদলে তৈরি করেছিলেন।’’

শনিবার দুপুরে যুগপৎ সরকারি এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে কলকাতায় আসছেন মোদী। ব্রিগেডেই সরকারি মঞ্চ থেকে ১৮,৮৬০ কোটি টাকার সরকারি প্রকল্পের শিলান্যাস এবং উদ্বোধন করবেন তিনি। তার পরে সেখানেই পৃথক মঞ্চ থেকে রাজনৈতিক সভা করবেন। বিধানসভা ভোটের আগে কলকাতা শহরে মোদীর ব্রিগেড সমাবেশ নিয়ে স্বভাবতই কৌতূহল তৈরি হয়েছে। প্রথমত, মোদীর সভায় ভিড় কেমন হবে। দ্বিতীয়ত, কোন পথে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল সরকারকে আক্রমণ করেন। তৃতীয়ত, সম্প্রতি অমিত শাহ যখন রায়দিঘির সভা থেকে স্পষ্ট তিনটি প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছিলেন, তেমন কোনও প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রীর তরফে দেওয়া হয় কি না।

তবে ব্রিগেডের মঞ্চ দেখে মনে হচ্ছে, সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি ‘বাঙালিয়ানা’। মঞ্চের সর্বত্রই বাঙালিয়ানার ছোঁয়া। বাঙালি গরিমায় শান দিতে মঞ্চের পটভূমিতে যেমন দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের প্রতিকৃতি আছে, তেমনই মঞ্চের প্রতিটি কোণায় থাকছে বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা উপাদান। বিষ্ণপুরের ‘ঐতিহ্যবাহী’ টেরাকোটা থেকে পট, কীর্তন, বাউল-সহ নানা শিল্পকর্ম থিমের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে মঞ্চের দু’ধারে। ঘটনাচক্রে, সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সফরে আগত বিজেপির বিভিন্ন কেন্দ্রীয় নেতার গলায় ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানের চেয়ে বেশি ধ্বনিত হচ্ছে ‘জয় মা কালী’। সমাজমাধ্যমে বিভিন্ন পোস্টে ‘মা দুর্গা’কেও স্মরণ করছেন তাঁরা। খোদ প্রধানমন্ত্রী মোদী পশ্চিমবঙ্গবাসীর উদ্দেশে লেখা খোলা চিঠি শুরুই করেছিলেন ‘জয় মা কালী’ দিয়ে।

বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীকের দাবি, ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটের আগে প্রথম কোনও রাজনৈতিক দল হিসাবে ব্রিগেডে সভা করছে বিজেপি। বস্তুত, শনিবার বিজেপির ব্রিগেডের সভা একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচির পরিসমাপ্তি। সম্প্রতি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মোট ন’টি ‘পরিবর্তন যাত্রা’ বের করেছিল পদ্মশিবির। প্রায় ৫,০০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে সেই যাত্রাগুলি গত মঙ্গলবার শেষ হয়েছে। তার পরে শনিবার প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ব্রিগেড সমাবেশের মাধ্যমে ওই কর্মসূচিরই আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি। শুক্রবার ব্রিগেডের প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে দফায় দফায় সভাস্থল পরিদর্শন করেছেন শমীক, শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদারেরা। স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন দলের নেতা ভূপেন্দ্র যাদব এবং সুনীল বনসলরা।

মোদীর ব্রিগেডের মঞ্চে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আদল। —নিজস্ব ছবি।

এর আগে আলিপুরদুয়ার, দুর্গাপুর, মালদহে সভা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। জানুয়ারি মাসে সভা করেছেন সিঙ্গুরে। তবে খারাপ আবহাওয়ার কারণে ডিসেম্বরে নদিয়ার তাহেরপুরে যেতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী। কলাকাতা বিমানবন্দর থেকে তাঁকে ‘ভার্চুয়ালি’ ভাষণ দিতে হয়েছিল। প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের ৭ মার্চ বিধানসভা নির্বাচনের আগে ব্রিগেডে শেষ বার জনসভা করেছিলেন মোদী। পাঁচ বছর পরে আবার ব্রিগেডে সভা তাঁর। ঘটনাচক্রে, তাঁর সভার তারিখটি পশ্চিমঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে আর একটি ‘মোড় ঘোরানো’ দিন। ২০০৭ সালে জমি আন্দোলনের ভূমি নন্দীগ্রামে পুলিশের গুলিতে এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হয়েছিলেন।

২০২১ সালের বিধানসভা ভোট থেকেই বিজেপির বিরুদ্ধে ‘বাঙালি-বিরোধী’ স্লোগান জোরদার করেছে তৃণমূল। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটেও ‘বহিরাগত’ বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সুর বেঁধেছিল পশ্চিমবঙ্গের শাসক শিবির। ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটের মুখে কি তার ‘জবাব দিতে’ হিন্দুত্বের পাশাপাশি বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের উপর বেশি জোর দিচ্ছে বিজেপি? শমীক অবশ্য সেই প্রশ্ন উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘‘বাঙালি তো আকাশ থেকে পেড়ে আনা কোনও জিনিস নয়। আমাদের প্রথম পরিচয় আমরা ভারতীয়, তার পরে বাঙালি।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement