West Bengal Assembly Election 2026

ধুলোর ঝড় কোথায় ওঠে, তাকিয়ে আছে কোচবিহার

শিয়রে ভোট। কী পরিস্থিতি জেলায় জেলায়? খোঁজ নিল আনন্দবাজার।

নমিতেশ ঘোষ

শেষ আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:২৫
Share:

কিছু দিন আগেও ছিল চলাচলের অযোগ্য। কোচবিহারের নাটাবাড়ির রেলগেট এলাকায় তৈরি হয়েছে নতুন রাস্তা। ছবি: সুবীর হোড়।

চৈত্রের দুপুরে তোর্সা নদীর চরে মাঝেমধ্যেই দেখা যায় ধুলোর ঘূর্ণি। চর জেগে সেখানে গড়ে উঠেছে জনবসতি। রেললাইন টপকে কংক্রিটের রাস্তা ধরে কিছুটা এগোলে গ্রাম। সেখানে ছোট্ট বসতভিটে শেফালি বর্মণের। পেশায় পরিচারিকা, প্রৌঢ়া শেফালি বলছিলেন, ‘‘ধুলোর এই ঘূর্ণি যখন ঝড়ের মতো ঘরের কাছে চলে আসে, খুব বিপদে পড়তে হয়। টিনের ছাউনির ঘর নড়বড় করে। সরকারি টাকায় ঘর তৈরি করতে পারলে ভাল হত। প্রথম কিস্তির টাকা পেয়েওছিল ছেলে। পরের কিস্তির টাকা নেশা করে উড়িয়ে দিয়েছে।’’

গ্রামের চার দিকে শুধু তৃণমূলের পতাকা। রাস্তার ধারে শাসকদলের ‘বুথ ক্যাম্প’। কোথাও বিজেপির পতাকা চোখে পড়ে না। অথচ, এই গ্রামেই গত লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে ৮০ শতাংশ ভোট পেয়েছিল বিজেপি। গ্রামের বাসিন্দা নন্দ বর্মণ বললেন, ‘‘রাজ্য সরকার এ বার শুধু আমাদের গ্রামেই ২২৭টি ঘর করে দিয়েছে। কংক্রিটের রাস্তাও করেছে। তাই এ বার সকলেই শাসকের পক্ষে।’’ দূর থেকে ইশারা করছিলেন এক প্রবীণ। কাছে যেতেই ফিসফিস করে বললেন, ‘‘বিজেপির পতাকা লাগাবে কী করে! তৃণমূল বাহিনী যে ঘিরে ফেলবে! ধুলোর ঝড় উঠবে!’’

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কোচবিহারের ন’টি আসনের মধ্যে সাতটিই পেয়েছিল বিজেপি। সিতাই ও মেখলিগঞ্জ আসন পেয়েছিল শাসকদল। পরে অবশ্য উপনির্বাচনে দিনহাটা আসনটিও পুনরুদ্ধার করে তৃণমূল। এমন আবহে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই শুরু করে তৃণমূল। টানা জনসংযোগ ও সাংগঠনিক শক্তি বাড়িয়ে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কোচবিহার আসনটি ফের নিজেদের দখলে আনতে সমর্থ হয় তারা। পরিসংখ্যান বলছে, লোকসভা ভোটের নিরিখে জেলার পাঁচটি বিধানসভা আসনে এগিয়ে রয়েছে তৃণমূল।

তা হলে অঙ্কটা কি এতই সহজ? ৭৫ ছুঁইছুঁই, দীর্ঘদেহী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ বসে রয়েছেন কোচবিহার সদরের আট নম্বর ওয়ার্ডে নিজের বাড়ির অফিসে। দীর্ঘ প্রায় ২২ বছর তৃণমূলের কোচবিহার জেলা সভাপতি ছিলেন তিনি। দু’বারের বিধায়ক, এক বারের মন্ত্রী। দল এ বারে টিকিট দেয়নি তাঁকে। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘‘দল আমাকে ছুটি দিয়ে দিয়েছে। আর প্ৰচারে যাব না।’’ সূত্রের খবর, এই অভিমানের রেশ পড়তে পারে কোচবিহার পুরসভা এলাকার কিছু ওয়ার্ডে, নাটাবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের গ্রামে। শুধু রবীন্দ্রনাথ নয়, বিনয়কৃষ্ণ বর্মণের মতো দলের আদি নেতাদের অনেককেই ব্রাত্য করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ শোনা যায় কান পাতলেই।

দল ছেড়ে কংগ্রেসের প্রার্থী হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ-ঘনিষ্ঠ, তৃণমূল কৃষক সংগঠনের প্রাক্তন জেলা সভাপতি খোকন মিয়াঁ। মেখলিগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক ও মন্ত্রী পরেশ অধিকারীর বিরুদ্ধে তোপ দেগে দল ছেড়েছেন দু’বারের বিধায়ক অর্ঘ্য রায় প্রধান। রাজ্যের শিক্ষা ক্ষেত্রে নিয়োগ-দুর্নীতিতে আদালতের নির্দেশে প্রথম চাকরি যায় পরেশ-কন্যা অঙ্কিতা অধিকারীর। পরে মন্ত্রিত্ব যায় পরেশের। তবে, তৃণমূল এ বারেও পরেশকে মেখলিগঞ্জেই প্রার্থী করায় অর্ঘ্য বলছেন, ‘‘অনেক হয়েছে, দুর্নীতির সঙ্গে আর নয়।’’ পরেশ বলেন, ‘‘দুর্নীতি নিয়ে আগেও প্রচার হয়েছে। তাতে লাভ হয়নি। আমি কী করেছি, না করেছি, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব জানেন।’’

২০১১ সালে পালাবদলের সময় থেকে ‘গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশন’-এর যে নেতা বংশীবদন বর্মণ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরেছিলেন, তিনি এখন গেরুয়া শিবিরে। গ্রেটার-এর আর এক শিবিরের নেতা, বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ নগেন্দ্র রায় তথা অনন্ত মহারাজকে দিনকয়েক আগে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মান দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। অনন্ত-ঘনিষ্ঠ হরিহর দাসকে শীতলখুচিতে প্রার্থীও করেছেন মমতা। সেই অনন্তকে রবিবার কোচবিহারের রাসমেলার মাঠে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জনসভার মঞ্চে দেখা গিয়েছে। রাজবংশী সমাজের ভোটে এই দুই নেতারই বড় প্রভাব রয়েছে বলে অনুমান পর্যবেক্ষকদের। তৃণমূলের কোচবিহার জেলা সভাপতি অভিজিৎ দে ভৌমিক ওরফে হিপ্পি সে সব শুনে স্মিত হাসেন। তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় রয়েছে শৈলেন বর্মা, সাবলু বর্মণ, হরিহর দাস এবং প্রাক্তন ক্রিকেটার শিবশঙ্কর পালের মতো একাধিক নতুন নাম। সে কথা মনে করিয়ে অভিজিৎ বলেন, ‘‘এসআইআর (‌ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন) নিয়ে মানুষের হয়রানির জবাব এ বার বিজেপি পাবে। যা সব অঙ্কের হিসাব পাল্টে দেবে।’’

বিজেপি শিবিরের অন্দরেও যে ঝড় ওঠেনি, তা নয়। এ বারে পুরনো চার বিধায়ককে টিকিট দেয়নি দল। ওই বিধায়কদের কাউকেই কার্যত প্ৰচারে সে ভাবে দেখা যাচ্ছে না। মাথাভাঙায় বিজেপির আদি নেতা, আরএসএস-ঘনিষ্ঠ সুশীল বর্মণকে সরিয়ে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিককে টিকিট দিয়েছে দল। গত লোকসভা নির্বাচনে হারের পরে নিশীথকে পুনর্বাসন দিতেই কি সরানো হল তাঁকে? সুশীল বলেন, ‘‘দলের হয়তো আমাকে আর প্রয়োজন নেই।’’ তার উপরে নাটাবাড়ি ও সিতাইয়ের মতো দু’টি আসনে বিজেপি বংশীবদন বর্মণের অনুগামী দুই গ্রেটার নেতাকে প্রার্থী করেছে। যা নিয়ে বিজেপির পুরনো কর্মীদের ক্ষোভ প্রকাশ্যে চলে এসেছে। তবে, বিজেপির জেলা নেতৃত্বের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর রাসমেলার মাঠের সভার পর থেকে সে সব পুঞ্জীভূত ক্ষোভ নাকি উধাও হয়ে গিয়েছে। বিজেপির কোচবিহার জেলার সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় চক্রবর্তীর আশা, ‘‘লোকসভা ভোটের পরে জেলায় অনেক রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে। যার প্রভাবেই আসবে ঝড়। পাল্টাবে চিত্র।’’

‘‘ঝড় এসেছিল’’, বলছেন কোচবিহারের ঘুঘুমারির নন্দ বর্মণ। জমিতে ভুট্টা আর পাট চাষ করা মানুষটি আগাছা পরিষ্কার করতে করতে বললেন, ‘‘স্বামী-স্ত্রী মিলে জমিতে কাজ করি। স্ত্রী রমার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে। ট্রাইবুনালে আবেদন করেছি। নথি জোগাড় করব, না খেতের কাজ করব? এসআইআর আমাদের কাছে ঝড়ের চেয়ে কম কী!’’ একই সুর ওকরাবাড়ির বড় ফলিমারিতেও।এসআইআর-আতঙ্কে সুভাষচন্দ্র বর্মণের আত্মহত্যার অভিযোগ রয়েছে সেই গ্রামে। সুভাষের বৃদ্ধ বাবা শচীন বর্মণ বললেন, ‘‘ছেলের আয়েই সংসার চলত। ঝড়ের মতো একটা আতঙ্ক এসে নিয়ে গেল ওকে!’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন