পশ্চিম বর্ধমানের কুলটিতে চলছে অবৈধ খনি ভরাট। —ফাইল চিত্র।
রানিগঞ্জের বক্তারনগরে বড় বাড়ি। চওড়া দরজা। ‘‘আমার কাছে হাজার দেড়েক মানুষ কাজ করেন’’, বলছেন গৃহকর্তা। তিনি ‘বক্তারনগর বাঁচাও সমিতি’রও কর্তা, খাতায়-কলমে যে সংগঠনের কাজ— এলাকায় স্পঞ্জ আয়রন কারখানার দূষণের প্রতিবাদ-সহ নানা সামাজিক দাবিতে আন্দোলন করা। তবে, ভোটের পশ্চিম বর্ধমান তথা রাজ্যের মানুষ জয়দেব খাঁ-কে চেনেন অন্য পরিচয়ে। বিজেপি নেতা। ‘কয়লা মাফিয়া’।
মধ্য চল্লিশের জয়দেবের ‘মাফিয়া’ শব্দে আপত্তি। বললেন, ‘‘জীবনে অবৈধ ভাবে কয়লা কাটিনি। বৈধ ভাবে গাড়ি (ট্রাক, ডাম্পার, আর্থমুভার) ভাড়া দিই। আমার বিরুদ্ধে এক সময়ে খুন-সহ গোটা কুড়ি-বাইশ মামলা ছিল। সব মামলাতেই আদালত থেকে অব্যাহতি পেয়েছি।’’
‘‘আদালতে যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হয়নি, তাঁকে অপরাধী বলা যায় কী করে’’, প্রশ্ন আসানসোল দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পালের। অগ্নিমিত্রার প্রচারে গিয়েছেন জয়দেব। তৃণমূল শিবিরের কটাক্ষ, পেশিশক্তি ব্যবহারের জন্য জয়দেবকে মাঠে নামিয়েছে বিজেপি।
‘‘এটা পেশিশক্তির ব্যাপার নয়। সবাই জানে, ভোটের প্রচারে লোক-গাড়ি-টাকা কারা দিতে পারবে,’’— দাবি আর এক যুবকের, যিনি কয়লার চোরা কারবারের সূত্রে কেন্দ্রীয় এজেন্সির ডাক পেয়েছিলেন। তাঁর সংযোজন, ‘‘এক দিনে পাশাপাশি দুটো বিধানসভা কেন্দ্রে দুটো দলের সভা থাকলে, একই লোক এক বার সবুজ পাঞ্জাবি পরে যায়, এক বার গেরুয়া।’’
কেন্দ্রীয় এজেন্সির হাত এড়াতে বিজেপির সঙ্গে ‘বোঝাপড়া’র খবর দলের শীর্ষ নেত্রীর কানে যাওয়াতেই নাকি জেলা তৃণমূলের অন্যতম শীর্ষ নেতা তথা রাজ্যের মন্ত্রী মলয় ঘটকের হাত থেকে আইন দফতরটি নিয়ে নেওয়া হয়েছে, রটেছিল এক সময়ে। যদিও মলয়-শিবিরের দাবি, এ বার মন্ত্রী-ঘনিষ্ঠ চার জন জেলায় দলের টিকিট পেয়েছেন। তৃণমূলের শীর্ষ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুমোদনের ভিত্তিতে। মলয় বলেন, ‘‘আমার বিরুদ্ধে অনেকে অনেক কথা বলেন। তার বাস্তব ভিত্তি নেই।’’
কুলটি কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী মলয়-অনুজ অভিজিৎ ঘটক। তাঁকে টিকিট দিতে গিয়ে দীর্ঘদিনের নেতা ও ঘটকদের আত্মীয় উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়ের নাম বাদ পড়েছে। উজ্জ্বল বলেন, ‘‘দলের সঙ্গে বেইমানি করব না।’’ দলীয় প্রার্থী তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই আছেন বলে দাবি আসানসোল দক্ষিণের টিকিট-প্রত্যাশী সেই তৃণমূল নেতার, যিনি স্টিল অথরিটি অব ইন্ডিয়ার আধুনিকীকরণের সূত্রে ভূমিপুত্র-কন্যাদের চাকরির দাবিতে কিছু দিন ‘অরাজনৈতিক’ আন্দোলন চালাচ্ছেন।
ভালুকজোড় গ্রামের প্রচারে এক জায়গায় কর্মসংস্থানের কথা শোনা গেল অগ্নিমিত্রার মুখেও। ভালুকজোড়ের আগে বিজেপি প্রার্থী গিয়েছিলেন শহরের ৮০ নম্বর ওয়ার্ডে। রাস্তার এক পাশের এলাকার নাম করিমডাঙা, অন্য পাশের ধ্রুবডাঙা। সেখানে তৃণমূল কর্মীর হামলায় দলীয় কর্মী রক্তাক্ত হয়েছেন, এ খবর পেয়ে পৌঁছেই বিজেপি নেত্রী উচ্চগ্রামে বলেন, ‘‘এলাকাটা বাংলাদেশ আর পাকিস্তান হতে দেব না।’’ তবে অভিযুক্তের পদবি ঠাকুর আর আক্রান্তের সিংহ জানাজানি হতেই ভিড় পাতলা হয়। অগ্নিমিত্রা থানায় অভিযোগের রাস্তা বাতলান।
গোটা জেলাতেই নানা অভিযোগ তৃণমূল এবং বিজেপির পিছু ধাওয়া করছে। বারাবনিতে তৃণমূল প্রার্থী বিধান উপাধ্যায়ের টক্কর নেওয়ার মতো প্রার্থী পাওয়া যায়নি বলে বিজেপি নেতাদের একাংশ মানছেন। কিন্তু, সেই এলাকায় জলাভাবের সমস্যা পুরোপুরি কাটেনি। জামুড়িয়ায় বিদায়ী বিধায়ক এবং এ বারের তৃণমূল প্রার্থী হরেরাম সিংহের ছেলে প্রেমপালের ‘দাপটের’ কথা কানে যাওয়ায় প্রকাশ্যে সতর্ক করেছেন খোদ মমতা। হরেরাম ‘‘দিদির দাবড়ানি থেকে কেউ ছাড় পায় না’’ বলে সামলানোর চেষ্টায় ব্যস্ত।
আসানসোল উত্তরের রেলপাড়ে সংখ্যালঘু মহল্লায় বিজেপির দিকে আঙুল উঠছে, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের সূত্রে নাম বাদ পড়ায়। সেখানে মোসদ্দি মোহল্লার প্রাক্তন পুরপিতা মহম্মদ নাসিম আনসারি ওরফে হাজি নাসো ভোটে নির্দল প্রার্থী। দাবি করছেন, ‘‘বাদ পড়া নাম যাঁদের, তাঁদের হয়ে তৃণমূল ছাপ্পা দিচ্ছিল।’’ এলাকার জলসঙ্কট মেটাতে তৃণমূল পরিচালিত আসানসোল পুরসভা ব্যর্থ বলতে বলতেই নাসোর সংযোজন: ‘‘জিতেন্দ্র তিওয়ারি যখন মেয়র ছিলেন, খুব চেষ্টা করতেন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর।’’
পাণ্ডবেশ্বর বিধানসভা কেন্দ্রের দলীয় প্রার্থী জিতেন্দ্রের নাম শুনে বাঁ হাতের উপরে চোখ চলে যায় বিজেপির প্রাক্তন জেলা সভাপতি তথা দুর্গাপুর পশ্চিমের প্রার্থী লক্ষ্মণ ঘোড়ুইয়ের। সেখানে ইঞ্চি ছয়েক মাপের সরু কাটা দাগ। ‘‘ক্ষুর মারা হয়েছিল আমাকে। তবে রাজনীতিতে কিছুই চিরস্থায়ী নয়। পাণ্ডবেশ্বরে জেলা তৃণমূল সভাপতি নরেন চক্রবর্তীর মহড়া নিতে ওঁর চেয়ে যোগ্য লোক নেই’’, বলছেন লক্ষ্মণ। নিজে জিতলেন, অথচ তৃণমূল সরকার গড়ল— এমন পরিস্থিতিতে জিতেন্দ্র দল বদলাবেন, সেই সম্ভাবনাও ভাসাচ্ছে বিজেপি সূত্র। তবে জিতেন্দ্র বলছেন, ‘‘তৃণমূল আমাকে ২২ দিন জেল খাটিয়েছে। ভোলার নয়।’’
মাটির নীচে কয়লার শিরা-উপশিরার মতো অভিযোগ-অবিশ্বাসের এই বিস্তৃতির বিপ্রতীপে আছেন বামেরা, আছে কংগ্রেস। রানিগঞ্জ, পাণ্ডবেশ্বরের সিপিএম প্রার্থীরা ব্যক্তি-স্বচ্ছতায় কত ভোট টানেন, সে দিকে তাকিয়ে দুই ফুল। ঘাস এবং পদ্ম। সিপিএমের জেলা সম্পাদক তথা জেলা বামফ্রন্টের নেতা গৌরাঙ্গ চট্টোপাধ্যায় রামে যাওয়া ভোট ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। জেলা কংগ্রেস সভাপতি এবং দুর্গাপুর পূর্ব আসনের প্রার্থী দেবেশ চক্রবর্তী জোর দিয়ে বলছেন, ‘‘দুই ফুল আসলে একই মুদ্রার এ পিঠ-ও পিঠ।’’ দুর্গাপুর পূর্বের তৃণমূল প্রার্থী, মন্ত্রী প্রদীপ মজুমদারের ব্যক্তি-স্বচ্ছতা নিয়ে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছেন না। তবে মন্ত্রী মানছেন, কোথাও একটা বিরোধী-স্রোত বইছে।
গত বার তৃণমূলের দখলে ছিল ছয় বিধানসভা কেন্দ্র, বিজেপির তিন। জেলায় ক্ষোভের ফল্গুর দেখা মেলে বারাবনির বন্ধ কারখানা হিন্দুস্তান কেব্লস এলাকার যুবক এস নাইডুর গলায়। যিনি ‘যুব সাথী’র টাকায় কেন্দ্রীয় চাকরির পরীক্ষার ফর্ম কিনছেন বলে দাবি। বলছেন, ‘‘এরা কেউ কারখানা খুলল না!’’ দুর্গাপুরের বন্ধ কারখানা এমএএমসি এলাকার বাসিন্দা, যুবতী হোটেলকর্মীর বক্তব্য, ‘‘নাগরিক পরিষেবা কহতব্য নয়। তৃণমূলকে দেখলাম। বিজেপি কত খারাপ হবে?’’
দুর্গাপুর পূর্বেই বন্ধ ‘হিন্দুস্তান ফার্টিলাইজ়ার কোম্পানি লিমিটেড’-এর জীর্ণ আবাসনে দেখা মেলে বৃদ্ধের, যাঁর ছেলে বি টেক পাশ করেও চাকরি পাননি। বৃদ্ধ বলেন, ‘‘যখন কেন্দ্র ও রাজ্যে কংগ্রেসের সরকার ছিল, তখন সব ঠিক ছিল। যুব সাথীর টাকা নেবে না বলায় ছেলেকে বোঝালাম, চোরের উপরে রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়া অর্থহীন। ভাবছি, ডবল ইঞ্জিনই হয় তো...!’’‘‘মানুষকে বলছি, ইঞ্জিন বদলেই দেখুন না। আমরা তো বদলে যাচ্ছি না’’, বলছেন জয়দেবও।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে