West Bengal Elections 2026

ধুঁকছে গর্বের শিল্পাঞ্চল, চলছে দায় ঠেলাঠেলিও

হুগলি নদীর পূর্ব পাড় ঘেঁষা একের পর এক কারখানা। সেখানেই দোকান মালিকের উত্তর অবাক করার মতোই। তিনি বলেন, ‘‘বেশিরভাগ কারখানা বন্ধ। ধুঁকতে ধুঁকতে চলছে কয়েকটি। মানুষের হাতে টাকা নেই। তাই চাহিদা নেই দামী জিনিসের!’’

চন্দ্রপ্রভ ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:২৯
Share:

—প্রতীকী চিত্র।

এক বহুজাতিক সংস্থার প্রতিনিধির প্রশ্নের উত্তরে রকমারি জিনিসের দোকানের মালিক বললেন, ‘‘বেশি দামের কিছু দেবেন না, বিক্রি নেই। ৫-১০ টাকার মধ্যে থাকলে দিয়ে যান।’’

হুগলি নদীর পূর্ব পাড় ঘেঁষা একের পর এক কারখানা। সেখানেই দোকান মালিকের উত্তর অবাক করার মতোই। তিনি বলেন, ‘‘বেশিরভাগ কারখানা বন্ধ। ধুঁকতে ধুঁকতে চলছে কয়েকটি। মানুষের হাতে টাকা নেই। তাই চাহিদা নেই দামী জিনিসের!’’

এলাকাটি ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের মধ্যেই, যার ইতিহাস বিশ্বপ্রসিদ্ধ। শিল্পের জৌলুস হারিয়ে এখন জীর্ণ। ভোট আসে যায়, বন্যা বয়ে যায় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির। কিন্তু দশকের পর দশক পেরোলেও হাল ফেরেনি ‘গর্বের শিল্পাঞ্চলের’। বরং বেড়েছে কর্মহীনের সংখ্যা, রুগ্ন হয়েছে ব্যবসা। কারখানা লাগোয়া এলাকাগুলির ছবিও মলিন। তাই বহুজাতিক সংস্থার দামী জিনিসের তুলনায় জোর পড়েছে কম দামী জোগানের উপরে। তাৎপর্যপূর্ণ— সম্ভবত এই একটি বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলের নেতারা একমত। অবশ্য রয়েছে চিরাচরিত দায় ঠেলাঠেলিও।

ব্রিটিশ শাসনকালে কলকাতার কাছে, জল-পরিবহণের সুবিধাযুক্ত ব্যারাকপুর সেনা ক্যান্টনমেন্টের সমসাময়িক সময়ে গড়ে ওঠে এই শিল্পাঞ্চল। পাট, কাগজ এবং সুতো-নির্ভর কারখানা গড়ে ওঠে। তৈরি হয় ভারী শিল্প কারখানাও। ক্রমে ভিন্‌ রাজ্য থেকে শ্রমিকের কাজে আসেন বহু মানুষ। ফলে গোটা শিল্পাঞ্চলে রয়েছে মিশ্র সংস্কৃতি। নব্বইয়ের দশক থেকে বন্‌ধ, লকআউট রুগ্ন করতে থাকে কারখানাগুলিকে। প্লাস্টিক-আগ্রাসন পাট-পণ্যের চাহিদায় থাবা বসাতে থাকে। শুরু হয় বেকারত্ব। পাল্লা দিয়ে বাড়ে দুষ্কৃতী-দৌরাত্ম্য। এর প্রভাব পড়ে বরাহনগর, পানিহাটি, খড়দহ, কামারহাটি, ব্যারাকপুর, নোয়াপাড়া, জগদ্দল, ভাটপাড়া, নৈহাটি, কাঁচরাপাড়ার মতো বিধানসভা কেন্দ্রগুলির শিল্প পরিস্থিতিতে। বাম শাসনের পরে এই সব এলাকায় ক্ষমতাশালী হয় তৃণমূল। পরে বিজেপিও কিছুটা প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু ১৫ বছরে এই শিল্পাঞ্চলের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করতে সরকারি তরফে পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

রাজনৈতিক দলগুলি জানাচ্ছে, অন্নপূর্ণা কটন, পলতা মেকানিইজ়ড ব্রিক, এমকো, এম্পায়ার, লুমটেক্স, ইত্যাদি বন্ধ। বীজপুরে দু’টি চট কারখানা, নোয়াপাড়ায় গৌরীশঙ্কর, কেলভিন রুগ্ন। টিটাগড়ে পেপার-মিল, টাইল কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া বন্ধ, ধুঁকছে ইলেক্ট্রোস্টিল। ব্রিটানিয়া, সিইএসসি-সহ অন্যান্য শিল্পও বন্ধ। টিটাগড় ওয়াগন চলছে সঠিক ভাবেই। রয়েছে ইছাপুর রাইফেল কারখানা এবং মেটাল কারখানা। তবে সেগুলিতেও কর্মী-সঙ্কোচন, বেসরকারিকরণের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। বাম সরকারের আমলে অসীম দাশগুপ্ত অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন খড়দহের শিউলি পঞ্চায়েত এলাকায় শিল্পতালুক তৈরির চেষ্টা হয়েছিল। চিহ্নিত হয়েছিল জমিও। কিন্তু সরকার বদলানোর পরে এ নিয়ে তেমন নড়াচড়া দেখা যায়নি। শিল্পাঞ্চল এলাকায় ঋষি বঙ্কিম শিল্পতালুক তৈরি হয়েছিল আগেই। বামেদের দাবি, রঞ্জিত কুণ্ডু বাম সরকারের পরিবহণমন্ত্রী থাকাকালীন সেই শিল্পতালুক পেয়েছিল এই শিল্পাঞ্চল।

শিল্পাঞ্চল-পরিস্থিতি এবং সেখানকার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বাম শ্রমিক সংগঠনের অন্যতম নেত্রী তথা নোয়াপাড়ার সিপিএম প্রার্থী গার্গী চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘‘রাইফেল ও মেটাল কারখানা বেসরকারিকরণের চেষ্টা হচ্ছে। বিজেপির অর্জুন সিংহ এবং তৃণমূলের দীনেশ ত্রিবেদী সাংসদ থাকাকালীনও পরিস্থিতি উন্নতির চেষ্টা হয়নি। শিল্পের জমিতে আবাসন হচ্ছে। ১৫ বছরে লক্ষাধিক মানুষের কাজ গিয়েছে। বেশির ভাগ কর্মীকে অস্থায়ী ভাবে কাজ করানো হচ্ছে রুগ্ন ও হাতে গোনা কারখানাগুলিতে। অনেকে পরিযায়ী হয়ে ভিন্‌ রাজ্যে চলে যাচ্ছেন।’’ বিজেপি-তৃণমূলকে একযোগে বিদ্ধ করে তাঁর মন্তব্য, ‘‘তৃণমূল উৎসব, মেলা-খেলা-ভাতায় ব্যস্ত। বিজেপি ডবল ইঞ্জিনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। কাজের কাজ কিছু নেই।’’

জগদ্দলে তৃণমূল প্রার্থী সোমনাথ শ্যামের বক্তব্য, ‘‘পাটশিল্প অনেকটাই কেন্দ্র-নির্ভর। কেন্দ্রীয় উদাসীনতায় এগুলি ধুঁকছে। তবে তৃণমূল সরকারের আমলে ছোট-মাঝারি শিল্প তৈরি হয়েছে অন্তত ১৫০টি। এক একটিতে গড়ে দেড়শো জন করে কাজ করছেন।’’ নোয়াপাড়ার বিজেপি প্রার্থী অর্জুন সিংহের প্রতিক্রিয়া, ‘‘অনেক চটকল পুরোপুরি বন্ধ। ব্রিটানিয়া, সিইএসসি-সহ কটন কারখানা এবং অন্যান্য শিল্পও বন্ধ। নতুন শিল্প হয়নি। কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে ধরে শুধু বার হয়েছে। এটাই এখানকার একমাত্র শিল্প। ডাবল ইঞ্জিন সরকার ছাড়া শিল্পের সম্ভাবনা নেই। বিজেপি সরকার শিল্পে বাড়তি নজর দেবে। যেমন দিচ্ছে অন্যান্য রাজ্যে।’’

স্থানীয়দের একাংশের মধ্যেও অপ্রাপ্তির বোধ। এলাকার শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা অনেকেই কাজের সন্ধানে ভিন্‌ রাজ্যে গিয়েছেন। প্রশিক্ষিত কারিগর-কর্মীদের অনেকে এখন ভিন্‌ রাজ্যে কর্মরত। যাঁরা রয়ে গিয়েছেন, তাঁদের একাংশ ছোটখাটো ব্যবসা, চুক্তিভিত্তিক কাজের উপরে নির্ভরশীল। এক স্থানীয় বাসিন্দার কথায়, ‘‘আমার মেয়ে কম্পিউটার নিয়ে পড়াশোনা করেছে। এখানে ৮-৯ হাজার টাকার বেশি চাকরি নেই। বেঙ্গালুরুতে গিয়েছে ৪০ হাজার টাকার চাকরি নিয়ে। এখানে শিল্প-কারখানা থাকলে এত সমস্যা হত না।’’ অপর একজনের বক্তব্য, ‘‘সরকারি চাকরিও তো নেই! পরিচিতদের অনেকেরই স্কুলের চাকরি গিয়েছে আদালতের নির্দেশে। টাকা না নিয়েই তো যোগ্যদের চাকরির ব্যবস্থা করা যেত।’’

প্রশাসনিক স্তরেও এই শিল্পাঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চর্চা রয়েছে। তাঁদের মতে, ব্রিটিশ শাসনে এই শিল্পাঞ্চল তৈরির সময়ে নদীপথই ছিল পরিবহণের মূল মাধ্যম। সময়ের সঙ্গে সেই পরিকাঠামো সংস্কারের প্রয়োজন ছিল। যেমন, এত দিনে গড়ে উঠেছে বিরাটি থেকে কল্যাণী পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে। তার একাংশ নির্মাণ করেছে জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ, অপর অংশ তৈরি হয়েছে রাজ্য সরকারের তত্ত্বাবধানে। কিন্তু জমি-জটের কারণে দীর্ঘ দিন ওই সড়ক প্রকল্প আটকে ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরে উপযুক্ত নিকাশি ব্যবস্থাও রাখতে হয়। কিন্তু গঙ্গা-পাড়ের বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জায়গায় জায়গায়। স্থানীয় সোনাই খালের সংস্কার না হওয়ায় নিকাশি পরিকাঠামো নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে।

সরকারি সূত্রের অবশ্য দাবি, এলাকায় ছোট শিল্পের (এসএসআই) অগ্রগতি হচ্ছে। ওষুধ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, প্যাকেজিং, কৃষিভিত্তিক পণ্য, টেক্সম্যাকো রেল, টিটাগড় ওয়াগন ইত্যাদি সংস্থা চলছে। ঋষি বঙ্কিম শিল্পতালুকের দ্বিতীয়ফেজ় চালু হয়েছে। তবে বিভিন্ন মহলের বক্তব্য, চালু কারখানাগুলিকে টিকিয়ে রাখা, নতুন শিল্পের উপযোগী পরিবেশ-পরিকাঠামো তৈরি, সুষ্ঠু আইনশৃঙ্খলায় যতটা গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন ছিল, কয়েক দশকে তাদেখা যায়নি।

এই আবহে ফের একটি ভোট এসেছে। ভোটারদের সামনে ফের রকমারি প্রাপ্তির হাতছানি। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সার্বিক উন্নয়ন হবে কি না, তার দিশা নেই এখনও।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন