—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
ভোটের দিন কোথাও আবাসন ঘিরে রাখার, কোথাও লিফ্টের তার কেটে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও আবার ভোট দিতে যাওয়া আটকাতে আবাসনের মূল ফটকে তালা ঝোলানো হয়েছে। ভোট দিতে গেলে আবাসনের জলের সংযোগ কেটে দেওয়ার হুমকির কথাও শোনা গিয়েছে বহু ক্ষেত্রে। আবাসনে চড়াও হয়ে বাইরে না বেরোনোর ‘হুইপ’ জারি করার অভিযোগ অতীতে শোনা গিয়েছে একাধিক জায়গায়। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে কি বদলাবে এই ছবি? নির্বাচন কমিশন আবাসনে বুথ তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। আবাসনেই বুথ হওয়ায় শহরে ভোটদানের হার বাড়বে বলে মনে করা হলেও আবাসনের বাসিন্দাদের একটা বড় অংশের প্রশ্ন, এতে আবাসনে হিংসার চরিত্রের বদল হবে কি?
কলকাতা পুরসভা সূত্রের খবর, শহরে অভিজাত আবাসন ও কমপ্লেক্সের সংখ্যা দু’হাজারের বেশি। রাজনৈতিক দলগুলির হিসাব, শহরের ভোটার তালিকায় আবাসনের বাসিন্দাদের অংশীদারিত্ব ৮-১০ শতাংশ। অশান্তি এড়াতে বহুতলবাসীদের অনেকেই ভোটের দিন বুথমুখো হন না। শহরে বহুতলের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাই ফি বছর কমেছে ভোটদানের হার। পর্যাপ্ত পুলিশি বন্দোবস্ত বা কেন্দ্রীয় বাহিনীর নজরদারির কথা বলে অভয় দেওয়া হলেও গত কয়েক বছরে আবাসনবাসীদের ভোটদানের হার সে ভাবে বাড়েনি। ২০২১ সালে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের মধ্যে হওয়া শেষ বিধানসভা ভোটেও আবাসনবাসীদের ভোটদানে এই অনীহা বিশেষ ভাবে আলোচিত হয়েছে। তাই বহুতল চত্বরেই ভোটকেন্দ্র হলে বহুতলবাসীদের সিংহভাগ ভোটাধিকার প্রয়োগে আগ্রহী হবেন বলে মনে করছে নির্বাচন কমিশন।
যদিও শুরু থেকেই এতে আপত্তি জানিয়েছে তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি লিখে প্রশ্ন তোলেন, বুথ সরকারি বা আধা-সরকারি জায়গায় হওয়াই দস্তুর, আবাসনে কী ভাবে ভোটকেন্দ্র হতে পারে? শহরের একাধিক আবাসনের বাসিন্দাদের তরফেও কমিশনে অভিযোগপত্র জমা পড়ে। বকলমে তৃণমূলই ওই অভিযোগের বয়ান লেখা চিঠির ব্যবস্থা করেছে বলে অভিযোগ ওঠে। সেই চিঠির বক্তব্য, কেন্দ্রীয় বাহিনীর থাকার ব্যবস্থা করতে হলে আবাসনের পরিবেশ বিঘ্নিত হতে পারে। ভোটের দিন বহিরাগতদের প্রবেশেও শান্তি বিঘ্নিত হতে পারে। ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে এমন একাধিক অভিযোগপত্র কমিশনে জমা পড়ে। রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা, আবাসনের ভোট প্রভাব ফেলতে পারে কলকাতার কয়েকটি বিধানসভা কেন্দ্রের ফলাফলে। ফলে এক দল বহুতল চত্বরেই ভোটকেন্দ্র তৈরি করাতে উদগ্রীব। অন্য দল আগ্রহী ‘স্থিতাবস্থা’ বহাল রাখতে।
নির্বাচন কমিশন অবশ্য এ বার কলকাতা ও লাগোয়া এলাকার ৪১টি আবাসনে বুথ তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যার মধ্যে বেহালায় সর্বোচ্চ ১১টি আবাসনে বুথ হচ্ছে। রাজারহাট-নিউ টাউনে সাতটি, যাদবপুরে ছ’টি, বিধাননগরে পাঁচটি, কসবায় চারটি, মহেশতলায় তিনটি, এন্টালিতে দু’টি এবং রাসবিহারী, মানিকতলা ও বেলেঘাটায় একটি করে আবাসনে বুথ তৈরি করা হচ্ছে। কমিশনের দাবি, যাঁরা ভোটার নন এবং যে আবাসনে বুথ তৈরি হচ্ছে সেখানকার বাসিন্দা নন, তাঁরা ভোটের দিন সেই আবাসনে থাকতে পারবেন না।
বুথ তৈরি হওয়া এমনই একটি আবাসন ‘উপহার’-এর বাসিন্দা নীলাঞ্জন দাস বলেন, ‘‘সব কিছুর ভাল-খারাপ থাকে। আবাসনে বুথ হওয়ার ভাল দিকই বেশি।’’ আর একটি আবাসন ‘অভিদীপ্তা ১’-এর বাসিন্দা সোমা ঘোষের দাবি, ‘‘প্রচুর ভোটার আমাদের আবাসনে। বয়স্কদের সুবিধা হবে। বাইরের লোক ঢুকে পড়ার ব্যাপার ঘটবে বলে মনে হচ্ছে না।’’ অভিষিক্তা আবাসনের বাসিন্দা রাহুল গুপ্তের আবার দাবি, ‘‘কমিউনিটি হল ঘিরে বুথ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সিঁড়ি বেয়ে উঠে ওই ছোট্ট পরিসরে ভোট দিতে ঠিক কতটা সুবিধা হবে, সংশয় আছে।’’ বালিগঞ্জের ম্যান্ডেভিলা আবাসনের বাসিন্দা রঙ্গন কোলে আবার বললেন, ‘‘বুথ হলে ভাল হত। অনেকের আপত্তিতেই আমাদের আবাসনে বুথ হয়নি।’’ মানিকতলার একটি আবাসনের বাসিন্দা রথীন দত্তের অভিযোগ, ‘‘বেছে বেছে কিছু দলের সুবিধা হবে, এমন জায়গায় আবাসনে বুথ হচ্ছে। তাই দু’হাজার আবাসনের মধ্যে মাত্র ৪১টিতে বুথ করা হচ্ছে।’’ কমিশনের যদিও দাবি, ৩০০ বা তার বেশি ভোটার রয়েছেন, এমন আবাসনকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। যে সব আবাসন কমিটির আপত্তি রয়েছে, তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে।কিন্তু এত কিছু করেও আবাসনের ভোট-চিত্র বদলাবে কি? উত্তর মিলবে কয়েক দিনেই।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে