West Bengal Elections 2026

‘উল্টোনো গামলা’ দখলে নানা অঙ্ক ঐতিহ্য-পীঠে

একদা জ‍্যোতি বসুর কেন্দ্র বলে পরিচিত বরাহনগর জুড়ে ভোট উপলক্ষে এখন তৃণমূল বনাম বিজেপির তরজার রাজনীতি। রামনবমী, হনুমান জয়ন্তীতে কে কাকে টেক্কা দিল, সেই নিয়ে চলে চর্চা।

ঋজু বসু

শেষ আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৫:৪৩
Share:

—প্রতীকী চিত্র।

কোনও প্রাচীন প্রত্নসামগ্রী নয়। রাস্তায় পোঁতা সিমেন্টের ‘শহিদ বেদি’। তার নোনাধরা গা, ফিকে হওয়া লিপিতে স্পষ্ট যুগাবসানের পলি। নকশাল আমলে সিপিএম বনাম কংগ্রেস বা নকশালদের সংঘাতের স্মারক। স্বাধীনতার পরে দু’দশক ধরে জ‍্যোতি বসুর কেন্দ্র, গঙ্গাতীরবর্তী বরাহনগর জুড়েই এমন ধূসর ইতিহাসের ছায়া।

বরাহনগর জুট মিল লাগোয়া তল্লাটে সিপিএমের ১৯৭১-এর জানুয়ারির ‘শহিদ’ দেবনাথ চক্রবর্তীর স্মারক বেদির উল্টো দিকেই আবিদ হোসেনের স্কুল ব‍্যাগের দোকান। বেদির বাঁ পাশে ধ্বজায় ধ্বজায় হনুমান মন্দিরের জেল্লা দিন দিন বাড়ছে। নিজের দোকানে সকালে ধূপ জ্বালতে জ্বালতে পঞ্চাশোর্ধ্ব আবিদ বিষণ্ণ, “বাজারের দাম বেড়েছে, সময় পাল্টেছে, কিন্তু মানুষ যে এমন পাল্টে যাবে, আগে বুঝিনি! আমার প‍্যান্ডেল সাজাতে বড় ভাল লাগে। আগে সরস্বতী পুজোয় রোজা রেখেও সাজানোর কাজ করতাম। এখনকার যা সব উৎসব, সাহস হয় না! লোকের চোখমুখ পাল্টে গিয়েছে।”

একদা জ‍্যোতি বসুর কেন্দ্র বলে পরিচিত বরাহনগর জুড়ে ভোট উপলক্ষে এখন তৃণমূল বনাম বিজেপির তরজার রাজনীতি। রামনবমী, হনুমান জয়ন্তীতে কে কাকে টেক্কা দিল, সেই নিয়ে চলে চর্চা। পাগড়িধারিণী নায়িকা প্রার্থী, তৃণমূলের সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি, ভিডিয়ো মুহূর্তে ভাইরাল। বিজেপি প্রার্থী সজল ঘোষের খোঁচা, “অস্ত্র নিয়ে মিছিল কিন্তু তৃণমূলই করেছে।” কিছু ছবি নিয়ে বিতর্ক হলেও স্থানীয় তৃণমূল নেতারা তা এআই বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন।

বাংলার প্রাচীন এই জনপদে মিশে কয়েকটি যুগের ইতিহাস। চৈতন‍্যদেবের স্মৃতিজড়িত পাঠবাড়ি, রামকৃষ্ণ পার্ষদদের প্রাক্-বেলুড় যুগের মঠ থেকে ইন্ডিয়ান স্ট‍্যাটিস্টিক‍্যাল ইনস্টিটিউট, বাঙালির অর্জনের নানা স্মারক। সে সব ঊহ‍্য রেখে সামান‍্য বৃষ্টিতে বি টি রোডের বাঁ দিকে নর্দমায় জলের ‘ব‍্যাক-ফ্লো’ বা উল্টো দিকে ঠেলে বেরোনো নিয়ে চর্চা চলছে। গত উপনির্বাচনে জয়ী বিধায়ক সায়ন্তিকা বরাহনগরের ভূগোল বোঝাতে উঁচু-নিচু রাস্তার ‘উল্টোনো গামলা’র আকৃতির কথা বলেছিলেন। যা লুফে নিয়েছেন সজল। ২০ নম্বর ওয়ার্ডে হরিসভার মোড়ে দেখি হাতমাইক পাকড়ে জনে জনে ‘‘আপনারা কিন্তু বরাহনগর নয়, গামলানগরের বাসিন্দা। আপনাদের নতুন দিদি বলে দিয়েছেন’’ বলে বেড়াচ্ছেন।

দেড় বছরের সুযোগে রাস্তার জন‍্য সাত কোটি টাকা বার করার কথা বলে চলেছেন টলি অভিনেত্রী সায়ন্তিকা। তবে, সে রাস্তার হিসাব পুরো পরিষ্কার নয়। সজল, সায়ন্তিকা দু’জনের প্রচারের নির্যাসই ‘একটি সুযোগ’! সায়ন্তিকা দেড় বছরে সব কাজ সারতে পারেননি বলে পকেট থেকে বরাহনগরের নিকাশি সমস‍্যার মাস্টার প্ল‍্যান বার করছেন। সজলও বিজেপিকে একটি বার সুযোগের আর্জি মেলে ধরছেন। চোখা চোখা নাটুকে সংলাপ-যুদ্ধে কখনও মনে হয়, ভোট প্রচার শুধু নেটে রিলে চলছে।

বনহুগলিতে সায়ন্তিকার রোড-শোয়ের পিছু নিতে গিয়েই সিপিএম প্রার্থী সায়নদীপ মিত্রের সঙ্গে দেখা। খানিকটা অন‍্য সুরেরও ছোঁয়াচ। জোড়হাতে বারান্দায় দাঁড়ানো এক মহিলাকে বললেন, ‘‘দিদি অভয়ার বিচার, তামান্নার বিচার, সবার নিরাপত্তার জন্য এ লড়াই!’’

পাশেই কামারহাটি কেন্দ্রের বাসিন্দা সায়নদীপ এসএফআই, ডিওয়াইএফের প্রাক্তন রাজ‍্য নেতা। বরাহনগরে নিকাশির সমস‍্যা মেটানো, চটকলের শ্রমিকদের বা বি টি রোডের পশ্চিম দিকে পরিস্রুত পানীয় জল পৌঁছনোর প্রকল্প নিয়ে ধারণা আছে। বরাহনগরের সৌন্দর্যায়ন বা পর্যটন, বন্ধ ওষুধের কারখানা বেঙ্গল ইমিউনিটি এবং আরআইসি-র জমিতে দক্ষতা বৃদ্ধির তালিম কেন্দ্রের মতো কিছু ভাবনাও রয়েছে। তবু প্রশ্ন, সায়ন্তিকা-সজলের দ্বৈরথে তিনি কি পারবেন দাঁত ফোটাতে? দু’বছর আগে উপনির্বাচনে ২০২১-এর জোটসঙ্গী, কংগ্রেসের থেকে হাজার ছয়েক ভোট বেশি পেলেও তন্ময় ভট্টাচার্যের ঝুলিতে আসে ১৭ শতাংশেরও কম। সায়নদীপের অবশ‍্য দাবি, “লড়াইয়ে প্রবল ভাবে আছি। বরাহনগর পুরসভায় কিন্তু আমাদের দখলে দুটো ওয়ার্ড। বিজেপির একটাও নেই।”

সায়নদীপের উপস্থিতি বিজেপি, তৃণমূলও উড়িয়ে দিচ্ছে না। সজল বলছেন, “যদি তৃণমূলকে হারাতে চান, ভোট ভাগ করবেন না। যেখানে যার ক্ষমতা, তাকে দিন!” গত উপনির্বাচনে সজলকে ৬-৭ হাজার ভোটে হারান সায়ন্তিকা। তাতে সিপিএম প্রার্থী তন্ময়েরও ভূমিকা ছিল। বরাহনগরের পুর এলাকা এবং কামারহাটির ১৭-২০ নম্বর ওয়ার্ডের কেন্দ্রে দুই পুরসভার নেতাদের সঙ্গে নিয়েই ঘুরছেন সায়ন্তিকা। বাঁকু ড়ার পরে বরাহনগরে এসে তরুণতর প্রার্থীর কাজ শেখার আগ্রহ নিয়ে খুশি বরাহনগরের পুর পারিষদ অঞ্জন পাল। এ কেন্দ্রে অঞ্জনেরও প্রার্থী হওয়ার কথা উঠেছিল। কিন্তু হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে টিম তৃণমূল যে সায়ন্তিকার সঙ্গে ১০০ ভাগ আছে, বুঝিয়ে দিচ্ছেন তিনি।

এ বার মহিলা কংগ্রেসের পুরনো নেত্রী কল‍্যাণী চক্রবর্তী আলাদা দাঁড়িয়েছেন। ৫৪ বছর বাদে জ‍্যোতিবাবুর কেন্দ্রে সিপিএমের নিজের প্রতীকে লড়াইয়ে ফেরার (উপনির্বাচন বাদে) আলাদা তাৎপর্য কারও কারও কাছে। সত্তরোর্ধ্ব কমরেডদের কেউ কেউ প্রার্থী জ‍্যোতিবাবুর সঙ্গে জিবি মিটিং করেছেন। ডানলপের কাছে জ‍্যোতিনগর কলোনিতে ১৯৭১-এর জুনে চোখের সামনে স্বামী নীহার ভট্টাচার্যকে খুন হতে দেখেন কিশোরী বধূ কনক ভট্টাচার্য। তখন তাঁর পেটে সাত মাসের সন্তান। সাধভক্ষণের আগের দিন ঘটনাটি ঘটে। সেই ক্ষত বয়েও দলের প্রতি আনুগত্য অটুট।

যতই দুরাশা হোক, শহিদ বেদির পাথর বা পাথর হওয়া নারী শাপমুক্তির স্বপ্ন দেখছেন।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন