— প্রতীকী চিত্র।
হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট গুটিয়ে প্রচারে নেমেছেন মহেশতলার তরুণ বাম প্রার্থী। প্রচার-মিছিলে থাকা লোকজনেরও প্যান্ট গোটানো। কাঁধে দলীয় পতাকা, শোলার তৈরি প্রতীক চিহ্ন নিয়ে মহেশতলা পুর এলাকার চন্দননগরের গলিপথ বেয়ে এগিয়ে চলেছে মিছিল। মিছিল দেখতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছেন লোকজন। তাঁদের কারও পোশাকই গোড়ালি ছোঁয়নি। কেউ পোশাক গুটিয়ে রেখেছেন হাঁটু পর্যন্ত। কেউ বা হাত দিয়ে উঁচু করে তুলে রেখেছেন পোশাকের নীচের অংশ।
এই দৃশ্যের পিছনেই লুকিয়ে আছে মহেশতলার ভোটারদের মূল যন্ত্রণা, আক্ষেপ— জমা জলের যন্ত্রণা। বাসিন্দারা বলছেন, ভোট আসে, ভোট যায়। প্রতি বারই নিকাশির সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি মেলে। কিন্তু ভোট ফুরোতেই যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যায় সে সব। ফিরে আসে সেই নোংরা জমা জল। শুধু রাস্তায় নয়, নর্দমা-বর্ষার জল ঢুকে পড়ে বাড়ির মধ্যেও।
দক্ষিণ শহরতলির এই এলাকায় ঝকঝকে বজবজ ট্রাঙ্ক রোড, সম্প্রীতি উড়ালপুল আছে। সেই রাস্তা বা উড়ালপুলে দাঁড়িয়ে অবশ্য যন্ত্রণার আভাস মিলবে না। তবে, রাজপথ থেকে এলাকার গলিতে ঢুকলেই বদলে যাবে চেহারা। সামান্য বৃষ্টিতেই নোংরা জল মাড়িয়ে যেতে হয় বাসিন্দাদের। জমা জলে স্কুটার, মোটরবাইক, সাইকেল উল্টোনোর ঘটনাও যেন নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। মহেশতলার এ বারের সিপিএম প্রার্থী, তরুণ আইনজীবী সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রচার-মিছিল দেখতে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েছিলেন মেহরুন্নিসা বিবি। জমা জলের কথা জিজ্ঞাসা করতেই বললেন, ‘‘জল দেখবেন? ভিতরে আসুন।’’
এক চিলতে টালির চালের বাড়ি মেহরুন্নিসার। একটিই ঘর, সামনের বারান্দার এক পাশে আড়াল করে রান্নার ব্যবস্থা। আর এক দিকে সেলাই মেশিন। তার পাশে থরে থরে সাজানো সব দলের পতাকা। এ সময়ে পতাকা সেলাই করেই আয় হয় মধ্য চল্লিশের এই মহিলার। কথা বলতে বলতে চৌকাঠ পেরিয়ে ভিতরে পা দিতেই থপ করে শব্দ। ঘরের ভিতরে জল থইথই করছে! মেহরুন্নিসা বললেন, ‘‘রাস্তার জল চুঁইয়ে ঘর ভেসে যায়। তার মধ্যেই স্বামী, শাশুড়ি, বাচ্চাদের নিয়ে থাকতে হয়। বছরের পর বছর এক অবস্থা।’’ মেহরুন্নিসারই প্রতিবেশী সাবির আলি মোল্লা বললেন, ‘‘এ তো গরমের বৃষ্টি। বর্ষায় এলে বুঝবেন, কী যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকি!’’ অভিযোগ, পুরসভাকে অনুরোধ-উপরোধেও কিছু হয়নি। বরং রাস্তা একটু উঁচু হয়েছে। তাতে আরও বিপত্তি বেড়েছে। উঁচু রাস্তা থেকে জল নামছে বাড়িতে। নিকাশির কোনও কাজই হয়নি।
নিকাশির এই বেহাল দশা নিয়ে সরব বাম প্রার্থী সায়ন। বলছেন, ‘‘বছরের পর বছর পুর বোর্ড, বিধায়ক তৃণমূলের। কিন্তু এই সমস্যার দিকে কেউ নজর দেয়নি!’’ নিকাশি যে সমস্যা, মানছেন তৃণমূল প্রার্থী শুভাশিস দাসও। তাঁর কথায়, ‘‘এলাকার সাংসদের (অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়) সঙ্গে কথা হয়েছে। মাস্টার প্ল্যান রেডি। ভোট পেরোলেই কাজ শুরু হয়ে যাবে। খাল সংস্কারের বিস্তারিত পরিকল্পনাও হয়েছে।’’ এলাকার অনেকেই অবশ্য মনে করিয়ে দিচ্ছেন, নিকাশির সমস্যা নিয়ে প্রথম বার ভোটে প্রার্থী হওয়া শুভাশিসের তিরবিদ্ধ হওয়া একেবারে অমূলক নয়। মহেশতলার দীর্ঘদিনের পুরপ্রধান তাঁর বাবা দুলাল দাস, বিধায়ক ছিলেন মা কস্তুরী দাস। কস্তুরীর মৃত্যুর পরে ২০১৮ সালের উপনির্বাচনে জয়ী হন দুলাল। ২০২১ সালে বিধায়ক হন। বাবার বদলে দল এ বার ছেলেকে প্রার্থী করেছে। শুভাশিস জোর দিচ্ছেন, আগামী দিনে মহেশতলার রাস্তার আলো, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে।
মহেশতলার ভোটে অবশ্য শুধু নিকাশির উন্নয়নই একমাত্র ‘ফ্যাক্টর’ নয়। আছে মেরুকরণ এবং এসআইআর-এর প্রভাবও। ১৯৭৭-২০০৬ পর্যন্ত মহেশতলা সিপিএমের দখলেই ছিল। ২০১১ সালে ২৪ হাজার ভোটে জিতেছিলেন তৃণমূলের কস্তুরী দাস। দ্বিতীয় স্থানে ছিল সিপিএম। ২০১৬ সালে সিপিএমের শমীক লাহিড়ি হারলেও ব্যবধান কমিয়ে এনেছিলেন প্রায় ১২ হাজারে। ২০১৮ সালের উপনির্বাচনে বিজেপি উঠে আসে দ্বিতীয় স্থানে। তৃণমূল অবশ্য ৬২ হাজার ভোটে জিতেছিল। বামেদের একাংশ বলছে, ২০১৮ সাল থেকে বিজেপি বাড়তে শুরু করেছিল, ভোটে মেরুকরণের প্রভাবও দেখা দিয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২১— তিন বছরে বিজেপির ভোট বেড়েছে ১৩ শতাংশ। বামেদের প্রায় ১ শতাংশ এবং তৃণমূলের পৌনে তিন শতাংশ ভোট কমেছে। প্রচারে বোঝা যাচ্ছে, মেরুকরণ ঠেকানোই লক্ষ্য সিপিএমের।
ভোটারদের হাত জোড় করে সায়ন বলছেন, ‘‘বিজেপি, তৃণমূল— একই দল। ওদের কথায় ভুলবেন না।’’ তুলছেন এসআইআর প্রসঙ্গও। এই কেন্দ্রের প্রায় ৪০ হাজার ভোটার কমেছে এসআইআর-এ। এলাকার রাজনীতির লোকেরা বলছেন, ভোটার হ্রাস তৃণমূলের ঝুলিতে প্রভাব ফেলবে। যদিও শুভাশিস তা মানতে নারাজ। বলছেন, ‘‘অনেকেই তো মৃত ভোটার বা এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছেন। উল্টে এসআইআর-এ বিরক্ত মানুষ জোড়াফুলে ভোট দেবেন।’’
যদিও এসআইআর এবং বিজেপির শক্তি বৃদ্ধি— এই দুই অস্ত্রেই প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চাইছেন বিজেপি প্রার্থী তমোনাথ ভৌমিক। একদা মহেশতলার তৃণমূলের চেয়ারম্যান পারিষদ তমোনাথ ২০২১ সালে বিজেপিতে যোগ দেন। তিনি বলেন, ‘‘দলের জন্মলগ্ন থেকে ছিলাম। ২০১৪ সালে সোমেনদার বদলে কাকে যেন সাংসদ করা হল। তার পরেই দল নষ্ট হল।’’ এ বারের ভোট নিয়ে তমোনাথ বলছেন, ‘‘মানুষ পরিবর্তন চাইছেন। হিন্দুরা জোটবদ্ধ হয়ে ভোট দেবে। সংখ্যালঘুরাও তৃণমূলকে ভোট দেবে না। মহেশতলায় এ বার বদল হবেই।’’ এলাকার বিজেপি কর্মীদের দাবি, সংখ্যালঘু ভোটের একাংশ বাম-কংগ্রেসে যেতে পারে। তৃণমূলের একাংশ তলে তলে তমোনাথের সঙ্গে যোগ রাখছে। এলাকার খবর, তৃণমূলের এক নেতা টিকিটের আশায় ছিলেন। কিন্তু শিকে না ছেঁড়ায় গোসা করেছেন। যদিও প্রকাশ্যে তৃণমূল নেতারা সে সব দ্বন্দ্বের কথা স্বীকার করছেন না।
এ সব সমীকরণের মধ্যে এ বার ঢুকে পড়েছে কংগ্রেসও। তাঁদের প্রার্থী হাজি আব্দুল হান্নান শেখ। ২০১১ সালে তৃণমূল এবং পরের দু’টি নির্বাচনে সিপিএমের সঙ্গে জোট থাকায় কংগ্রেস প্রার্থী দেয়নি। গত ১৫ বছরে তাদের ভোটের হিসাবও স্পষ্ট নয়। যদিও কংগ্রেস প্রার্থীর দাবি, মহেশতলায় ‘হাত’ চিহ্নের নির্দিষ্ট ভোট আছে। সেই ভোটই ঝুলিতে আসবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা অবশ্য বলছেন, কংগ্রেস জোট থেকে বেরোনোয় সরল সমীকরণে বামের ঝুলিতে প্রভাব পড়ার কথা। কিন্তু নিচুতলার কংগ্রেস ভোট আদৌ কি বামের ঝুলিতে গিয়েছিল?
রাজনীতির আঙিনায় এ সব সমীকরণের তরজা-তর্ক চলছে। মেহরুন্নিসাদের আক্ষেপ কি সেই আবর্তেই হারিয়ে যাবে?
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে