WB Elections 2026

অর্থবহ নীরবতার আবহে আশা-আশঙ্কায় দুই ফুল

শিয়রে ভোট। কী পরিস্থিতি জেলায় জেলায়? খোঁজ নিল আনন্দবাজার।

শুভ্রবিকাশ নন্দ

শেষ আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৮
Share:

— প্রতীকী চিত্র।

মেরুকরণের ভোটে ‘নীরবতা’ কার পক্ষে থাকবে! বড় ফুল ভাবছে, পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলেই চুপ করে রয়েছেন মানুষ। জোড়া ফুলের আশা, এই নিস্তব্ধতা এসআইআর হয়রানির জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি। বারাসত, আমডাঙা, মধ্যমগ্রাম। তিন বিধানসভা কেন্দ্রের ভোট-চিত্রে মিল বলতে এটুকুই।

বারাসত বড় বড় অনেক কিছুই আছে। বড় শপিং মল, পেল্লায় বহুতল, গাড়ির ঝাঁ চকচকে শোরুম। রবীন্দ্র ভবনের গা ঘেঁষে রয়েছে ‘নতুন রূপে মদের দোকান’। ডাস্টবিন, ফুটপাতের মতো ছোটখাটো জিনিসগুলো নেই। তবে আলো করে রয়েছে যানজট।

বারাসত থানার সামনে সকালে বসেছিল চায়ের আড্ডা। কাছাকাছি যেতেই কলতান মুহূর্তে মৌন। কী বুঝছেন ভোটের হাল? প্রশ্ন শুনেই কয়েক জন আড্ডাধারী উঠে গেলেন। যে কয়েক জন রয়ে গেলেন, তাঁদেরই এক জন বললেন, ‘‘পরিবর্তন কিছুই হয়নি। বাম আমলের মতোই রয়েছে দখলদারি। যানজট। সঙ্গে টোটোর সমস্যা।’’

পাশ দিয়ে গেল টোটো। নাম ‘পুষ্পক’। তৃণমূল প্রার্থী সব্যসাচী দত্ত বিকেলে প্রচার করছিলেন ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে। সুসজ্জিত টোটোয় প্রার্থী। প্রচারে সাড়াও মিলছিল। সব্যসাচী বললেন, ‘‘আগে ডাকবাংলো মোড় থেকে চাঁপাডালি মোড় যেতে এক ঘণ্টা লাগত। এখন হাতে গুনে তিন থেকে পাঁচ মিনিট লাগে।’’ কী ভাবে হল? প্রার্থীর জবাব, ‘‘প্রশাসনিকঅভিজ্ঞতা থাকলে সম্ভব।’’ সব্যসাচী যে টোটোয় চড়েছিলেন তাতে কিন্তু ‘পুষ্পক’ বা ‘পক্ষীরাজ’ কিছুই লেখা ছিল না।

এখানেও রয়েছে তৃণমূলের গোষ্ঠী কোন্দল। প্রার্থীর দাবি, তিনি সকলকে মিলিয়ে দিয়েছেন। তবে শহরের এক ওয়ার্ডে সব্যসাচীরই এক নির্বাচনী কার্যালয়ে বসে জনা কয়েক তৃণমূল কর্মী বলছিলেন,‘‘বিরোধীরা বহিরাগত প্রার্থী বলে প্রচার চালাচ্ছে। প্রার্থী প্রকাশ্যে যা মন্তব্য করছেন, তাতে সমস্যা বাড়ছে।’’ একদা বিজেপির ঘর করে আসা সব্যসাচীর দাবি, দলের দায়িত্বের নিরিখে এটা তাঁর কর্মভূমি। আর সমস্যা এড়িয়ে যাওয়ার চেয়ে মেনে নেওয়া ভাল।

সন্ধ্যায় বসেছে চায়ের ঠেক। সেখানে সব দলের কর্মীরাই হাজিরা দেন। পেশায় মৃৎশিল্পী এক জন বললেন, ‘‘আমার সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ভোট দেব।’’ এক প্রৌঢ় বললেন, ‘‘বিরোধীরা এখনও প্রস্তুত নয়।’’

বিজেপির প্রার্থী শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়। নির্বাচনী কার্যালয়ে বসে সঙ্কীর্ণ রাস্তা,ডাস্টবিন-সহ নানা দৈনন্দিন সমস্যার কথা উল্লেখ করে তিনি বললেন, ‘‘শাসকদলের প্রার্থী যা বলছেন, তাতে আমাদের বক্তব্যই মান্যতা পাচ্ছে।’’ সার্বিক ভাবে তৃণমূলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের অভিযোগ করে বললেন, ‘‘দল বদল মানুষভাল ভাবে নেয় না।’’ তবে দ্বন্দ্ব আছে গেরুয়া শিবিরেও। পুরনো নেতা তাপস মিত্র দাঁড়িয়েছিলেন নির্দল হয়ে। মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছেন। ময়দানে থাকবেন তো? সন্দিহান গেরুয়া শিবিরের একাংশও।

নবপল্লিতে প্রচার করছিলেন বাম প্রার্থী হেমন্ত দাস। আসতে দেরি হচ্ছিল। জটলায় প্রৌঢ়, বৃ্দ্ধইবেশি। হাতে গোনা কয়েক জন যুবক। তাঁদের এক জন বলছিলেন, ‘‘সব কিছু নেতাদের মতো হবে নাকি? আমাদের কাজ নেই? আগের দিন আসতে পারিনি বলে এত কথাশুনতে হল। এখন অপেক্ষা করতে হচ্ছে।’’ হেমন্ত অবশ্য বললেন, ‘‘যুব সম্প্রদায় ‘বাইনারি’ ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি।’’ বারাসত কে এন সি রোডের ডাব বিক্রেতা সইফুলআলম কিংবা গামছা বিক্রেতা শঙ্কর রায় এখনও প্রৌঢ় হয়ে যাননি। দু’জনেই বললেন, ‘‘প্রকল্পের সুবিধা পাই। তবে ব্যবসা করে খেতে হয়। কিছু বলতে পারব না।’’

আমডাঙার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে সন্ত্রাস। তৃণমূলের লড়াই তার সঙ্গেই। এখানে প্রার্থী বদল করেছে তৃণমূল। প্রাক্তন বিধায়ক রফিকুররহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল অনেক। তাঁর বদলে তৃণমূল বাজি ধরেছে পীরজাদা কাসেম সিদ্দিকীর উপরে। সন্ত্রাসের অভিযোগআড়ালে মেনেছেন তিনিও। মেরুকরণের আবহে লড়াই কঠিন হচ্ছে, তা মানতেও আপত্তি নেই তাঁর। কাসেম তাই প্রচারেবেশি জোর দিচ্ছেন মূলত সেই সব জায়গায়, যেখানে সংখ্যাগুরুর বাস। জয়পুর জগন্নাথ মন্দিরে আসবেন কাসেম। কর্মীরা জড়ো হয়ে বলাবলি করছিলেন, সেখানে আইএসএফের বদলে বামফ্রন্ট প্রার্থী দিলে ভাল হত। হঠাৎ ছন্দপতন। টোটোয়বেজে উঠল অমিত শাহের বক্তব্য। রে রে করে উঠলেন কর্মীরা। কাসেম এলেন। ঘরে ঘরে ঢুকলেন। আইএসএফের ভোট কাটার আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘‘সংখ্যালঘু ভোট কেউ কাটতে পারবে না। আমি পীরজাদার প্রতিনিধি।’’ এত উন্নয়ন সত্ত্বেও কী ভাবে হিন্দু ভোট বিজেপির ঘরে ঢুকছে, দলীয় কর্মীদের কাছে জানতে চাইলেন।

আমডাঙার মধ্যে রয়েছে নজরুল পল্লি। কলোনি এলাকা। তবে এখানে সে ভাবে এসআইআরেরপ্রভাব পড়েনি। ঘরামির কাজ করেন রবীন্দ্র মধু। ছোটবেলায় এসেছেন বাংলাদেশ থেকে। বাম আমলে জমি মিলেছে। সে জন্য রয়েছে কৃতজ্ঞতা। স্মরণ করলেন এখানকার প্রাক্তন বিধায়ক হাসিম আব্দুলহালিমের সাদামাঠা জীবনের কথা। বললেন, ‘‘তৃণমূলের সঙ্গে কংগ্রেস শব্দ রয়েছে। তাই ওদের কেউ ভোট দেবে না।’’ এক সময়ে এই পল্লি ছিল বাম ঘাঁটি। এখন তা ঝুঁকে রামের দিকে। বিজেপি প্রার্থী অরিন্দমদে জোর দিয়েছেন শিক্ষার উপরে। বলছেন, ‘‘শিক্ষা-দুর্নীতি মানুষ মেনে নেয়নি। এর প্রভাব দেখা যাবে ভোটে।’’

আমডাঙায় তৃণমূলের পতাকার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে আইএসএফের পতাকা। দেখে মনে হবে,লড়াই সমানে সমানে। আইএসএফ প্রার্থী বিশ্বজিৎ মাইতি তাঁদের আশার কথা সবে শোনাতে শুরু করেছিলেন। সঙ্গে থাকা বাম নেতা শম্ভু দাশগুপ্ত এগিয়ে এসে দাবি করলেন, মেরুকরণের রাজনীতির বিপদ ৬০ শতাংশ মিটিয়ে ফেলেছেনতাঁরা। তাই তাঁরা ৪৫ শতাংশ ভোট পাবেন।

মধ্যমগ্রাম কোনও ভাবেই গ্রাম নয়। এখানে তৃণমূল কার্যত এগিয়ে। সৌজন্যে রথীন ঘোষ। বাম আমলে লড়াই করে জেতা রথীনরাজনীতি করেন সনাতনী কায়দায়। তাঁর ফোন খোলা ২৪ ঘণ্টা। ফোন ধরতে না পারলে পরে ফোন করেন। সমস্যা সমাধানে রঙের বিচার করার পক্ষপাতী নন তিনি। সময় মেনে যোগ দিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনলাইন মিটিংয়ে। ৪২ বছরের রাজনৈতিক জীবনে অপরাজিত রথীন পুরসভায় বসে বললেন, ‘‘মানুষ যেন বিশ্বাস করে, তাদের সঙ্গে নেতা রয়েছেন।’’

কলকাতা লাগায়ো দুই জেলায় খাতা খুলতে পারে না বিরোধীরা। এ বারেও সেই প্রবণতা কি বজায় থাকবে?

নীরবতা সম্মতির লক্ষ্মণ। অসম্মতিরও।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন