বুথে রাজ্য পুলিশ নয়

অথচ নির্বিঘ্ন ভোটের আশ্বাস ছিল জৈদীর

আপনি যদি বিরোধী দলের ভোটার হন, তা হলে বুথে যাওয়ার আগেই আটকে দেওয়া হবে। বেশি সাহস দেখাতে গেলে গুন্ডাবাহিনীর মারধর খাওয়ারও সম্ভাবনা আছে! ভোটের দিন পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে এটাই নাকি দস্তুর। জোর যার, বুথ-মুলুক তার। গত ৩৯ বছর রাজ্যে এই ট্র্যাডিশনই চলছে।

Advertisement

জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০১৬ ০৪:৩৭
Share:

আপনি যদি বিরোধী দলের ভোটার হন, তা হলে বুথে যাওয়ার আগেই আটকে দেওয়া হবে। বেশি সাহস দেখাতে গেলে গুন্ডাবাহিনীর মারধর খাওয়ারও সম্ভাবনা আছে! ভোটের দিন পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে এটাই নাকি দস্তুর। জোর যার, বুথ-মুলুক তার। গত ৩৯ বছর রাজ্যে এই ট্র্যাডিশনই চলছে।

Advertisement

এই চেনা ছবি এ বার অবশ্য আর দেখা যাবে না বলে আশ্বাস দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। প্রত্যন্ত গ্রামের ভোটাররা যাতে নির্ভয়ে বুথে গিয়ে ভোট দিতে পারেন, সে জন্য একগুচ্ছ ব্যবস্থা নিয়েছে কেন্দ্রীয় ভোট পরিচালক সংস্থা। কমিশনের নির্দেশের অন্যথা হলে যে কাউকে রেয়াত করা হবে না— দিল্লির নির্বাচন সদনে বসে আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে তা-ও স্পষ্ট করে দিয়েছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নসীম জৈদী।

সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই কার্যত হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ‘‘কেন্দ্রীয় বাহিনী তো তিন দিন! তার পর তো আমাদেরই দেখতে হবে!’’ নির্বাচন কমিশনার কিন্তু জানাচ্ছেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী তিন দিনের অতিথি নয়। ১ মার্চ থেকে মে মাসের অনেকটা সময় ধরেই কেন্দ্রীয় বাহিনী রাজ্যে থাকবে। গোড়া থেকেই ফ্ল্যাগ মার্চ এবং প্রত্যন্ত এলাকায় টহলদারির চালাচ্ছে তারা। ভোটারদের আশ্বস্ত করতে স্থানীয়দের সঙ্গে কথাবার্তাও বলছে। রাজ্যের ১৬ হাজার জনপদ চিহ্নিত করা হয়েছে যেখানে সমাজের দুর্বলতর অংশের মানুষ বসবাস করেন। কেন্দ্রীয় বাহিনীকে এমন প্রতিটি জনপদে যেতে বলা হয়েছে।

Advertisement

কেন্দ্রীয় বাহিনী কোথায় যাচ্ছে, কী করছে তা প্রতিদিন জেলাশাসক, মুখ্য নির্বাচনী অফিসার এবং নির্বাচন কমিশন নজরদারি করছে। জৈদীর কথায়, ‘‘নির্ভয়ে ভোটের বাতাবরণ তৈরির জন্য এ বার অনেক আগে কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠানো হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ ভরসা পান। ভোটের দিন প্রতি বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনী রেখে এটাও নিশ্চিত করা হচ্ছে, যাতে বুথে কোনও গোলমাল না হয়। রাজ্য পুলিশকে বুথের বাইরে রাখা হচ্ছে। তারা শুধু টহল দেবে।’’

কিন্তু বাহিনীর উপস্থিতিই তো সব নয়। অতীতে এ রাজ্যে দেখা গিয়েছে, কেন্দ্রীয় বাহিনী এলেও তাদের ঠিক মতো কাজে লাগানো হয়নি। এ রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে বসিয়ে রাখা যে রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সে কথা এক প্রকার মেনেও নিয়েছেন জৈদী।

শুধু তাই নয়, শাসক দলের সুবিধে হয় এমন ভাবেই কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করা হয় বলেও বারবার অভিযোগ তোলেন বিরোধীরা। এ বার যাতে সেই অভিযোগ না ওঠে, তার জন্য সব রকম চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে জানান জৈদী। তাঁর দাবি, ‘‘কেন্দ্রীয় বাহিনীর এক জন জওয়ানও কোথাও বসে থাকবে না। বুথে কোনও ধরনের কারচুপি বরদাস্ত করা হবে না। প্রত্যেক জওয়ান সক্রিয় ভূমিকা নেবে। আমি জোর দিয়ে বলছি, এ বার এই ব্যাপারটি নিশ্চিত করা হচ্ছে।’’ কেন্দ্রীয় বাহিনী কোথায় যাবে, কী করবে তা কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকেরাই ঠিক করবেন।

কিন্তু শুধু বাহিনী পাঠালেই কি ভোটাররা ভরসা পাবেন? বিরোধীদের আক্ষেপ, কমিশনের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করেই শাসক দল ভোটে দাপাদাপি করে। তাতে যোগ্য সঙ্গত করে পুলিশ। পুলিশই কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ভুল পথে চালনা করে। ফলে প্রচুর সংখ্যায় কেন্দ্রীয় বাহিনী এলেও কাজের কাজ কিছু হয় না। জৈদী এর উত্তরে জানাচ্ছেন, এ বার প্রত্যেক ভোট-কেন্দ্রে কেন্দ্রীয় বাহিনীই থাকবে। এক জন মাত্র রাজ্য পুলিশের লোক থাকবে লাইন ঠিক করা বা অন্য কাজের জন্য। কৌশলগত এলাকায় ‘কুইক রেসপন্স টিম’-এর দায়িত্বেও রাখা হবে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে। যাতে গোলমালের খবর পেলেই বাহিনী ছুটে যেতে পারে। ভোটারদের কোথাও আটকানো হচ্ছে— এমন খবর পেলে সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় বাহিনী ছুটে যাবে।

বাহিনীর মূল কাজ হবে, অন্যের হয়ে ভোট দেওয়া, রিগিং বা অন্য যে কোনও ধরনের কারচুপি ঠেকানো। প্রতি বুথে যাতে সমস্ত পোলিং এজেন্ট থাকতে পারে তা নিশ্চিত করা হবে। জৈদীর কথায়, ‘‘রাজ্য সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীকে বুথের দায়িত্ব থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। বুথের বাইরে টহল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং বিভিন্ন পর্যায়ে নিরাপত্তার কাজ তারা করবে। রাজ্য সশস্ত্র পুলিশের সঙ্গে কেন্দ্রীয় বাহিনীও এলাকায় টহল দেবে। পুরো কাজে কেন্দ্রীয় বাহিনীই নেতৃত্ব দেবে।’’

ভয় দেখানোর পাশাপাশি ভোটের দিন ভূত সেজে ভোট দেওয়ার জন্য শাসক দল অনেক সময় ভোটকর্মী এবং জওয়ানদের নানা প্রলোভনের মাধ্যমে দুর্বল করে দেয়। ফলে শাসক দলের কারচুপি দেখেও বাহিনী চুপ করে থাকে। এই ব্যবস্থার কি বদল হবে? জৈদী বলেন, ‘‘ভোটকর্মীরা বুথে পৌঁছনোর পর স্থানীয় কারও আতিথেয়তা যাতে না নেন, সে জন্য ইতিমধ্যেই নির্দেশিকা জারি হয়েছে। ভোট কর্মীদের অর্থের বিনিময়ে খাবার সরবরাহের ব্যবস্থা জেলা প্রশাসনই করেছে। কেন্দ্রীয় বাহিনীরও খাওয়াদাওয়ার নিজস্ব ব্যবস্থা থাকবে। এ সব নিয়ে তাদের উপরও স্থানীয়রা প্রভাব খাটাতে পারবে না। কেউ যদি ভোটকর্মী বা কেন্দ্রীয় বাহিনীকে প্রভাবিত করার সাহস দেখান, সে ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপ করা হবে।’’

এর পরেও যদি কোনও ভোটকর্মী বা জওয়ান পক্ষপাতমূলক আচরণ করেন, তাঁদের জন্যও দাওয়াই ঠিক করে রেখেছেন জৈদী। তিনি জানান, কমিশন ভোট সংশ্লিষ্ট অপরাধ এবং আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত ঘটনাগুলোর উপর নজরদারি চালাচ্ছে। ভোটের কাজে যুক্ত সমস্ত সাধারণ কর্মী এবং পুলিশ অফিসারদের কমিশনের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। ভোটকর্মী-অফিসাররা যেন এটা স্মরণে রাখেন।

জৈদী দাবি করলেন, ‘‘কমিশনের এই পদক্ষেপের ফলে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। ১ লক্ষ ১৪ হাজার গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর হয়েছে। যে কোনও হুমকি উপেক্ষা করে ভোটাররা যাতে ভোট দিতে আসতে পারেন, সে ব্যাপারে উৎসাহব্যঞ্জক পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ ভোটের জন্য যা জরুরি।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement