মঙ্গলবার কালীঘাটের বাসভবন থেকে তৃণমূলের প্রার্থিতালিকা প্রকাশ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গে ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও। ছবি: পিটিআই।
রাজনীতির বয়ঃসীমা। বিগত কয়েক বছরে বিভিন্ন সময়ে এই ‘বয়ঃসীমা’র হয়ে সওয়াল করেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। আসন্ন বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের প্রার্থিতালিকায় সেই তত্ত্ব এবং ভাবনার প্রতিফলন দেখা গেল। প্রত্যাশিত ভাবেই নবীন-প্রবীণের মিশেল রয়েছে তালিকায়। তবে পাল্লা ভারী তরুণ এবং মধ্যবয়স্কদের দিকেই। প্রবীণেরা তালিকায় ‘সংখ্যালঘু’।
মঙ্গলবার কালীঘাটের দফতর থেকে বিধানসভা ভোটের যে প্রার্থিতালিকা প্রকাশ করেছেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সেখানে ২৯১ জনের নাম রয়েছে। পাহাড়ের তিনটি আসন তৃণমূল ছেড়ে রেখেছে অনীত থাপাদের জন্য। তৃণমূলের ঘোষিত ২৯১ জনের প্রার্থিতালিকায় ২১৯ জনেরই বয়স ৬০ বছরের নীচে। অর্থাৎ, মোট প্রার্থীসংখ্যার প্রায় ৭৬ শতাংশের বয়সই ৬০ বছরের মধ্যে। তাঁদের মধ্যে ৫০ বছর বা তার কম বয়সের প্রার্থীর সংখ্যা ১৩০ জন। অর্থাৎ, প্রায় ৪৫ শতাংশ। ষাটোর্ধ্ব প্রার্থী রয়েছেন ৭২ জন। যা মোট প্রার্থীর ২৪ শতাংশ। সত্তরোর্ধ্ব রয়েছেন ২৫ জন। অর্থাৎ, ৯ শতাংশ।
এ বারের প্রার্থিতালিকায় ৩১ বছরের কম বয়সি চার জনকে টিকিট দেওয়া হয়েছে। তালিকায় ৩৮ জন (১৩ শতাংশ) প্রার্থী রয়েছেন, যাঁদের বয়স ৩১-৪০ বছরের মধ্যে। তাঁদের মধ্যে তিন জন হলেন দেবাংশু ভট্টাচার্য (চুঁচুড়া), মধুপর্ণা ঠাকুর (বাগদা। তিনি অবশ্য উপনির্বাচনে জিতে ২০২৪ সালেই বিধায়ক হয়েছিলেন) এবং ঋতুপর্ণা আঢ্য (বনগাঁ দক্ষিণ)। ৪১-৫০ বছর বয়সি ৮৮ জন (৩০ শতাংশ) প্রার্থীর উপর ভরসা রেখেছে তৃণমূল। ৫১-৬০ বছর বয়সি প্রার্থী রয়েছেন ৮৯ জন (৩১ শতাংশ)। ‘প্রবীণ’ প্রার্থীদের তালিকায় ৬১-৭০ বছরের মধ্যে রয়েছেন ৪৭ জন (১৬ শতাংশ)। ২৩ জন (৮ শতাংশ) প্রার্থীর বয়স ৭১-৮০ বছরের মধ্যে। ৮০ বছরের বেশি বয়সি রয়েছেন মাত্র তিন জন। দু’জন রাজ্যের মন্ত্রী। শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় এবং প্রদীপ মজুমদার। অন্যজন হলেন মালদহের রতুয়ার প্রার্থী সমর মুখোপাধ্যায়।
তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বার বার রাজনীতির বয়ঃসীমা বা রাজনীতি থেকে অবসরের বয়সের কথা বলেছেন। তাঁর মতে, নরেন্দ্র মোদী বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো ‘ব্যতিক্রম’ বাদ দিলে সকলেরই উচিত ৬৫ বছর বয়সে রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়া। বস্তুত, অভিষেক নিজেও যে তার আগে রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চান, সে কথাও তিনি প্রকাশ্যেই বলেছিলেন। তাঁর মতে, অন্যান্য পেশার মতো রাজনীতিতেও বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কর্মক্ষমতা কমে আসে। যদিও রাজনীতিতে মমতা-মোদীর মতো বিনোদনে অমিতাভ বচ্চন বা ক্রিকেটে মহেন্দ্র সিংহ ধোনিকে ‘ব্যতিক্রম’ বলে অভিহিত করেছিলেন তিনি। বিধানসভার যে প্রার্থিতালিকা মমতা-অভিষেক মিলে প্রকাশ করেছেন, তাতে এই ভাবনা, এই তত্ত্ব এবং এই দর্শন স্পষ্ট।
এমনিতে তৃণমূলে রাজনীতিকদের জন্য বয়সের কোনও ঘোষিত ঊর্ধ্বসীমার নীতি নেই। প্রার্থিতালিকায় যেমন মধুপর্ণা ঠাকুর, দেবাংশু ভট্টাচার্য, শ্রেয়া পাণ্ডের মতো তরুণ নাম রয়েছে, তেমনই রয়েছেন শোভনদেব বা সমরের মতো অভিজ্ঞেরাও। তবে সার্বিক ভাবে প্রার্থিতালিকার তুল্যমূল্য হিসাব কষলে স্পষ্ট, প্রাধান্য পেয়েছেন তরুণ এবং মধ্যবয়স্করাই। ষাটোর্ধ্ব বেশ কয়েক জন বিদায়ী বিধায়ককে এ বারে আর টিকিট দেয়নি তৃণমূল। টিকিট না-পাওয়া সেই প্রবীণদের তালিকায় রয়েছেন আব্দুল করিম চৌধুরী। প্রার্থিতালিকায় জায়গা পাননি সাবিত্রী মিত্র, মনোরঞ্জন ব্যাপারী, গিয়াসউদ্দিন মোল্লার মতো ‘প্রবীণ’।
অভিষেক অবশ্য কোনওদিন ‘প্রবীণ’দের পুরোপুরি সরিয়ে রাখার কথা বলেননি। নবীন-প্রবীণ দুইয়ের মিশেলে দল চলবে, এমনই মনে করেন তিনি। প্রবীণদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা যে দলের প্রয়োজন, মানেন সে কথাও। তবে একই সঙ্গে এ-ও মানেন যে ‘কাজের জন্য’ তরুণদেরই দরকার। তৃণমূলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতার এই অভিমত অনেকাংশেই প্রতিফলিত হয়েছে প্রার্থিতালিকায়। নবীন-প্রবীণের মিশেল থাকলেও সেখানে ষাটোর্ধ্ব প্রার্থীদের সংখ্যা তুলনায় অনেকটাই কম।
রাজনীতিকদের অবসরের বয়ঃসীমা নিয়ে তৃণমূলের অন্দরে গত কয়েক বছরে অনেক কাটাছেঁড়া হয়েছে। সৌগত রায়ের মতো ‘প্রবীণ’ সাংসদের কাছে যেমন মনের বয়সটাই আসল। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে আবার বয়স নয়, যোগ্যতাই আসল। ফিরহাদ হাকিম আবার মনে করেন, নবীন হোন বা প্রবীণ, যাঁর ‘গ্রহণযোগ্যতা’ রয়েছে, তাঁকেই প্রার্থী করা উচিত। আবার অনেকে খোলাখুলি সমর্থন করেন অভিষেকের অভিমতকে। সেই তালিকায় রয়েছেন কুণাল ঘোষ। এক সময় তিনি বলেছিলেন, ‘‘কেউ যদি ভাবেন দেহত্যাগ না করলে পদত্যাগ করবেন না, তা হলে দলটা ক্রমশ সিপিএমের বৃদ্ধতন্ত্রের দিকে যাবে।’’ তবে অভিষেকের মতো কুণালও মমতাকে ‘ব্যতিক্রমী’ তালিকায় রাখেন। ঘটনাচক্রে, কুণালও জায়গা পেয়েছেন তৃণমূলের প্রার্থিতালিকায়। যেমন জায়গা পেয়েছেন ঈষৎ ভিন্ন মতাবলম্বী ফিরহাদও।
তবে শাসক শিবিরের প্রার্থিতালিকা প্রকাশের আগে দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতা-নেত্রীদের নিয়ে যে জল্পনা শুরু হয়েছিল, তা একেবারেই মেলেনি। তরুণ প্রজন্মের তৃণমূল হলেও টিকিট পাননি ফিরহাদের কন্যা প্রিয়দর্শিনী হাকিম। প্রার্থিতালিকায় স্থান হয়নি অতীন ঘোষের কন্যা প্রিয়দর্শিনী ঘোষ বাওয়া, সঞ্জয় বক্সির পুত্রবধূ সুদীপ্তা বক্সি, কাকলি ঘোষ দস্তিদারের পুত্র বৈদ্যনাথ ঘোষ দস্তিদারের। টিকিট পাননি সদ্যপ্রয়াত মুকুল রায়ের পুত্র তথা প্রাক্তন বিধায়ক শুভ্রাংশু (হাপুন) রায়ও। তবে মানিকতলা কেন্দ্রে টিকিট পেয়েছেন প্রয়াত সাধন পান্ডের কন্যা শ্রেয়া পান্ডে। সাধন প্রয়াত হওয়ার পরে ওই আসনটিতে মমতা টিকিট দিয়েছিলেন সাধনের স্ত্রী সুপ্তি পান্ডেকে। এ বার টিকিট পেলেন সাধন-সুপ্তির কন্যা শ্রেয়া।