ডায়মন্ড হারবারের পুলিশ পর্যবেক্ষক অজয়পাল শর্মা। —ফাইল চিত্র।
নির্বাচন কমিশন নিযুক্ত ডায়মন্ড হারবারের পুলিশ পর্যবেক্ষক অজয়পাল শর্মাকে ঘিরে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা পুলিশ পর্যবেক্ষকের ‘এক্তিয়ার’ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তৃণমূল। সোমবারই অজয়পালের একটি ভিডিয়ো প্রকাশ্যে এসেছে (যদিও ওই ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম)। সেখানে সামনে উপস্থিত মানুষদের উদ্দেশে ‘হুঁশিয়ারি’র সুরে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে অজয়পালকে। দাবি করা হচ্ছে, ভিডিয়োটি ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গীর খানের বাড়ির কাছেই। সেখানে তৃণমূল প্রার্থীর পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশেও বার্তা দিতে দেখা গিয়েছে। প্রকাশ্যে আসা ওই ভিডিয়োকে ঘিরেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে তৃণমূল। পুলিশ পর্যবেক্ষকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে তারা।
আসলে পুলিশ পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা ঠিক কী রকম? এ বিষয়ে উল্লেখ পাওয়া যায় কমিশনের ২০২৪ সালের অগস্টে প্রকাশিত ‘অবজ়ার্ভার হ্যান্ডবুক’-এর প্রথম খণ্ডে। সেখানে দ্বিতীয় পাতায় পর্যবেক্ষকদের কাজের সারসংক্ষেপ উল্লেখ রয়েছে। মোট সাতটি ভাগে তাঁদের কাজের কথা উল্লেখ রয়েছে ওই হ্যান্ডবুকে।
সেখানে বলা হয়েছে, প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ‘সিনিয়রিটি’ এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে সাধারণ এবং পুলিশ পর্যবেক্ষকদের। ফলে নির্বাচন অবাধ এবং সুষ্ঠু ভাবে পরিচালনার জন্য তাঁরা কমিশনকে সাহায্য করার মতো জায়গায় থাকবেন বলে আশা করে কমিশন। তৃণমূল স্তরে ভোট প্রক্রিয়া যাতে দক্ষতার সঙ্গে এবং কার্যকর ভাবে পরিচালনা হয়, তার উপর তদারকি করবেন তাঁরা। ‘কোনও ভোটার যেন বাদ না পড়েন’— এই নীতিতে চলতে হবে পর্যবেক্ষকদের। বলা হয়েছে, ভোটের সময়ে তাঁরা কমিশনের ‘চোখ এবং কান’ হয়ে কাজ করবেন, কমিশনের মুখপাত্র হিসাবে নয়। প্রার্থী, রাজনৈতিক দল এবং ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে তিনি তৃণমূল স্তরের তথ্য সরাসরি কমিশনকে জানাবেন। নির্বাচন সংক্রান্ত আইন, নিয়মবিধি, কার্যপদ্ধতি, নির্দেশ এবং নির্দেশিকা যাতে সকলে কঠোর ভাবে এবং নিরপেক্ষ ভাবে মেনে চলে, তা-ও নিশ্চিত করতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের ২০২৪ সালের অগস্টে প্রকাশিত ‘অবজ়ার্ভার হ্যান্ডবুক’-এর অংশ।
ওই হ্যান্ডবুকে আরও বলা হয়েছে, পর্যবেক্ষকদের দেওয়া তথ্য বা কোনও পর্যবেক্ষণ সম্পূর্ণ ভাবে গোপনীয়। এবং তা শুধুমাত্র কমিশনের ব্যবহারের জন্য। সংবাদমাধ্যম বা অন্য কোনও সংস্থা ওই তথ্য ব্যবহার করতে পারে না। তাই ভোট শেষ হওয়ার পরেও পর্যবেক্ষকেরা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কোনও আলোচনা করতে পারবেন না। সংবাদমাধ্যমের কোনও প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারবেন না তাঁরা।
হ্যান্ডবুক অনুযায়ী, পর্যবেক্ষকদের রিপোর্ট, তথ্য এবং পর্যবেক্ষণ শুধুমাত্র কমিশন ব্যবহার করবে— এর অর্থ এমন নয় যে তাঁরা মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক, রিটার্নিং অফিসার এবং জেলা নির্বাচনী আধিকারিকের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না। নির্বাচন চলাকালীন প্রয়োজনীয় সংশোধনের জন্য পর্যবেক্ষকেরা নিজেদের পর্যবেক্ষণ নিয়ে তাঁরা ওই আধিকারিকদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। তবে কমিশনের কাছে পাঠানো সরকারি রিপোর্টের কোনও প্রতিলিপি তাঁরা মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক, রিটার্নিং অফিসার বা জেলা নির্বাচনী আধিকারিক কিংবা অন্য কোনও ব্যক্তিকে পাঠাতে পারবেন না। সেখানে আরও বলা হয়েছে, পর্যবেক্ষকদের নিয়োগের মূল লক্ষ্য দোষত্রুটি খুঁজে বার করা নয়। অবাধ এবং সুষ্ঠু ভাবে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রশাসনকে সাহায্য করাই তাঁদের নিয়োগের মূল উদ্দেশ্য বলে জানানো হয়েছে কমিশনের ওই হ্যান্ডবুকে।
ডায়মন্ড হারবারে কমিশন নিযুক্ত ওই পুলিশ পর্যবেক্ষক সাধারণ মানুষকে ধমকাচ্ছেন, চমকাচ্ছেন বলে অভিযোগ তুলেছে তৃণমূল। রাজ্যের শাসকদলের আরও অভিযোগ, রাতের অন্ধকারে সাধারণ মানুষের বাড়িতে হানা দিচ্ছেন অজয়পাল। রাতের অন্ধকারে তল্লাশির নাম করে বাড়িতে ঢুকে মহিলাদের সঙ্গে ‘অশ্লীল’ ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তৃণমূলের। অজয়পালের ভূমিকা নিয়ে যখন তৃণমূল এমন অভিযোগ তুলছে, তখন অতীতে পুলিশ পর্যবেক্ষক হিসাবে দায়িত্ব সামলানো বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলে আনন্দবাজার ডট কম। অবজার্ভার হিসাবে কাজ করা একাধিক প্রাক্তন পুলিশ পর্যবেক্ষক বলছেন, কোনও পুলিশ অবজার্ভার এ রকম ভাবে জনসাধারণের সামনে এমন সব কথা বলতে পারেন না। এটা নিয়মবিরুদ্ধ। প্রাক্তন এক আইপিএসের কথায়, “আমরা যখন কাজ করেছি, তখন সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলার নিয়ম ছিল না। শুধু পর্যবেক্ষণ এবং রিপোর্ট দেওয়াই একমাত্র কাজ ছিল। কোনও ঘটনা ঘটলে ইসিআই-কে রিপোর্ট জমা দিতে হত। ইনি কী ভাবে এ ধরনের কথাবার্তা বলছেন হুমকি এবং হুঁশিয়ারির সুরে, তা বুঝতে পারছি না।” অন্য এক আইপিএস বলছেন, “পুলিশ পর্যবেক্ষকের কাজ শুধু পর্যবেক্ষণ করা। কোনও নির্দেশ দেওয়া নয়। প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসনকে তিনি চাইলে জানাতে পারেন। কিন্তু ব্যবস্থা নিতে পারেন না। কারণ তিনি তো জেলার পুলিশ সুপার নন, তিনি পর্যবেক্ষক। তাঁর কাজই পর্যবেক্ষণ করা এবং ইসিআইকে রিপোর্ট পাঠানো। এটাও মনে রাখতে হবে, পর্যবেক্ষকেরা সিইওর অধীনে নন। তাঁরা সরাসরি ইসিআই-কে রিপোর্ট পাঠাবেন। হুমকি-হুঁশিয়ারি তো অনেক দূরের ব্যাপার, তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথাও বলবেন না। নিয়ম তেমনটাই। এটা এক্তিয়ার বহির্ভূত বলেই জেনে এসেছি এত কাল।”
পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা প্রসঙ্গে কমিশনের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ মতোই পর্যবেক্ষকেরা কাজ করেন। পুলিশ পর্যবেক্ষক অজয়পালকে নিয়ে তৃণমূলের অভিযোগ প্রসঙ্গে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ অগ্রবাল বলেন, “যে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতেই পারে। আইন অনুযায়ী কাজ হবে। এর সঙ্গে নির্বাচনে কাজ করার সম্পর্ক নেই। তবুও ওই অফিসারের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ থাকলে, যে কেউ তা জানাতে পারেন। অভিযোগ এলে খতিয়ে দেখা হবে।”
অন্য দিকে, তৃণমূলের তরফে সাংবাদিক বৈঠক করে বলা হয়, “অজয়পাল শর্মা ডায়মন্ড হারবারের নিরীহ মানুষদের ধমকাচ্ছে, চমকাচ্ছে, রাতের অন্ধকারে মানুষের বাড়িতে হানা দিচ্ছে। রাতের অন্ধকারে তল্লাশির নাম করে বাড়িতে ঢুকে মহিলাদের সঙ্গে অশ্লীল ব্যবহার করছে। মহিলাদের গায়ে হাত দিচ্ছে। এই অজয়পাল শর্মা একটা রঙিন চরিত্র। ২০২০ সালের মার্চে দু’টি তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। যেখানে প্রথম তদন্তটি ছিল দুর্নীতির। দ্বিতীয় তদন্তটি ছিল বিশ্বাসভঙ্গের। একজন মহিলার বিশ্বাস অর্জন করে তাঁর সঙ্গে চিটিংবাজি, ফেরেববাজি করা।”
অন্য দিকে, পুলিশ পর্যবেক্ষকের হুঁশিয়ারির ভিডিয়ো প্রকাশ্যে আসতেই অজয়পালের বিরুদ্ধে পাল্টা সুর চড়িয়েছে তৃণমূল। তৃণমূলের দাবি, অজয়পাল উত্তরপ্রদেশের এক ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’। তিনি উত্তরপ্রদেশে ‘সিংহম’ নামেও পরিচিত। কিন্তু ওই পুলিশকর্তার বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গ, তথ্যপ্রমাণ লোপাট এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ তৃণমূলের। রাজ্যের শাসকদলের দাবি, এক মহিলা অভিযোগ করেছিলেন, অন্য মহিলাদের সঙ্গে সম্পর্কের কথা লুকিয়ে অজয়পাল তাঁকে বিয়ে করে প্রতারণা করেছিলেন। তৃণমূলের আরও দাবি, মহিলা যখন পুলিশের শীর্ষ কর্তাদের কাছে অভিযোগ জানান, তখন তাঁকেই মিথ্যে মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ ওই মহিলার। সাংবাদিক বৈঠক ডেকে অজয়পালের উদ্দেশে তৃণমূল হুঁশিয়ারি দেয়, “আপনি যদি মনে করেন ৪ মে-র পর আপনি আপনার রাজ্যে ফেরত চলে যাবেন এবং সেখানে বিজেপির মালিকেরা আপনাকে বাঁচিয়ে নেবে— তা হলে আপনি ভুল করছেন। আমাদের নজর আছে আপনার উপরে। আপনি পালিয়ে বাঁচতে পারবেন না। আপনি যে রাজ্যে চলে যান, যে বিজেপি নেতার হাত আপনার মাথার উপরে থাকুক না কেন, আপনার নামে এফআইআর হবে। আপনার নামে চার্জশিট হবে। আপনাকে ঘেঁটি ধরে এ রাজ্যের আদালতে নিয়ে আসা হবে। আইনের সামনে আপনাকে ফেলা হবে। আইনের কঠোর থেকে কঠোর ব্যবস্থা আপনার বিরুদ্ধে নেওয়া হবে।”