Satyajit Ray Birth Anniversary

আমার নিখুঁত অভিব্যক্তি পেতে ‘সীমাবদ্ধ’ ছবির শেষ দৃশ্যে সেট খালি করে দেন মানিকদা: বরুণ চন্দ

অভিনেতা নয়, নিজের ছবির জন্য সত্যজিৎ রায় চরিত্র খুঁজে নিতেন চেনা-অচেনা বৃত্তের মধ্যে থেকে। সে ভাবেই এই মহানগরে এক দিন শ্যামলেন্দুকে খুঁজে পেয়েছিলেন বরুণ চন্দের মধ্যে। ২ মে পরিচালকের ১০৬তম জন্মদিনে সেই সব স্মৃতি উজাড় করলেন অভিনেতা।

Advertisement

বরুণ চন্দ

শেষ আপডেট: ০২ মে ২০২৬ ০৮:৫৪
Share:

সত্যজিৎ রায়ের জন্মবার্ষিকীতে স্মৃতি উজাড় করলেন বরুণ চন্দ। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

সত্যজিৎ রায় বলে দূর থেকেই তখন চিনতাম তাঁকে। এক দিন ধর্মতলায় ঘুরতে ঘুরতে নিউ এম্পায়ার চত্বরে তাঁকে প্রথম দেখেছিলাম বইয়ের দোকানে। ছ’ফুট উচ্চতার একজন মানুষ, যাঁর সব বিষয়ে দখল আছে। একাধারে তিনি চিত্রশিল্পী, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার এবং সঙ্গীত পরিচালক, যাঁর ভাবনাচিন্তা সময়ের থেকে এগিয়ে তো থাকেই, বরং সুদূরপ্রসারী।

Advertisement

সবার কাছে তিনি সত্যজিৎ রায়। আমার কাছে মানিকদা। আমার সুপারহিরো। আমার যাঁকে দেখলেই শ্রদ্ধা আর সম্ভ্রম করতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু ওঁর সঙ্গে আলাপের আগে দেখেও কোনওদিন কথা বলতে যেতে পারিনি। মনে হয়েছিল যদি বিব্রত বোধ করেন। ‘তিনকন্যা’ ছবির মুক্তির পরে, অপর্ণা সেনের জন্মদিনের পার্টিতে আমি নিমন্ত্রিত ছিলাম। সেখানেই ওঁকে আরও সামনে থেকে দেখলাম। পরে শুনেছিলাম, এক জনের কাছে আমার গলার স্বরের প্রশংসা করেছিলেন।

একটা বিজ্ঞাপনী সংস্থায়, আগে আমি যেখানে চাকরি করতাম সেখানে তিনি ছিলেন ডিরেক্টর। সংস্থার মিটিংয়ে সেই ভাবে তিনি আসতেন না তিনি। এক দিন মিটিংয়ে কী হয়েছিল তার বিবরণ নিয়ে গিয়েছিলাম ওঁর কাছে, সই করাতে। সেই সময় বলেছিলেন, ‘ভুল কিছু লিখে আনোনি তো’! এর পর এক বার এক পত্রিকার হয়ে সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ হয়। আমিই মানিকদার সেই সাক্ষাৎকারটি নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলাম। এর পর এক দিন বাড়িতে ডাকলেন আমাকে। সে দিন মনে মনে খুবই খুশি হয়েছিলাম। সেই দেখা হওয়া, কথা বলা হয়েছে তার পরে বেশ কয়েক বার। আমাকে বেশ পরখ করেছিলেন সেই সময়। বলেছিলেন, ‘মাঝে মাঝে সুযোগ পেলে চলে এসো’। আমাকে তখন আর পায় কে!

Advertisement

‘সবার কাছে তিনি সত্যজিৎ রায়। আমার কাছে মানিকদা।’ ছবি: সংগৃহীত।

সেই বার পুজোর আগে এক দিন দেখা করলাম আমি। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাংলা পড়া হয়?’ কী জানি, আমাকে দেখে ভেবেছিলেন হয়তো ‘ট্যাঁশগরু’। মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের ‘সীমাবদ্ধ’ আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কালো রাস্তা সাদা বাড়ি’। এই দুটো বই পড়তে বলেন মানিকদা। আমিও পড়ে নিলাম। তখনও বলেননি আমাকে নিয়ে কিছু ভাবছেন কি না। হঠাৎ এক দিন আমাকে ফোন করে বললেন, ‘কিছু যদি না করো এক বার এসো তো।’ বাড়িতে গেলাম। তখন তিনি তাঁর লাল খেরোর খাতা বার করে পুরো চিত্রনাট্যটা পড়ে শোনালেন আর জানালেন, ‘সীমাবদ্ধ’-তে শ্যামলেন্দুর চরিত্রে আমাকে ভাবছেন। তিনি এও জানান, অডিশন দিতে হবে। অডিশন দিলাম। কিন্তু কেমন হয়েছে তিনি কখনও বলতেন না। অডিশনের পর আমিই একটু কৌশলে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তা হলে কি আমি গাড়ি চালানোটা শিখব মানিকদা?’ তখন একবাক্যে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই শিখবে।’ এই বলে উঠে চলে গেলেন। তখন আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমাকে শ্যামলেন্দু হিসেবে ওঁর পছন্দ হয়েছে।

অভিনেতাদের পরিচালনা করা মোটেও পছন্দ ছিল না ওঁর। ওয়ার্কশপে একেবারেই বিশ্বাস করতেন না তিনি। আজকাল তো চারদিকে ওয়ার্কশপের বহর। ওঁর কিন্তু জহুরির চোখ ছিল। তিনি জানতেন কাকে দিয়ে অভিনয় হবেই। কথা বলার ধরন, অভিব্যক্তি খুঁটিয়ে দেখেই আঁচ করে নিতেন। আনকোরা, সাধারণের মধ্যে দিয়ে তিনি অভিনয়সত্তা বার করে আনার ক্ষমতা রাখতেন। প্রতি ছবিতেই চ্যালেঞ্জ নিতে ভালবাসতেন। ভুল হতেই পারত, কিন্তু ঝুঁকি নিতেন। ওই যে বললাম, জহুরির চোখ ছিল।

কখনও কারওর উপর কিছু চাপিয়ে দেননি তিনি। কাউকে দেখেশুনে, তবেই তিনি অভিনেতা বেছে নিতেন। আর প্রত্যেকটি চরিত্র ছিল প্রত্যেকের থেকে আলাদা। কাজের সময়েও দেখেছি, দৃশ্যগ্রহণের মধ্যে কখনও ‘কেমন হচ্ছে’ কাউকে বলতে শুনিনি। একটি টেকেই শট নেওয়া পছন্দ করতেন মানিকদা। শুটিংয়ের সময় আমাকেও কখনও বলেননি কিছু। একটি দৃশ্যে খুব চিৎকার করে কথা বলার একটা জায়গা ছিল। আমি একটু আস্তে কথা বলেছিলাম। ওই সময় কিছু বলেননি। পরে সম্পাদনার সময় ওই দৃশ্যটি পছন্দ না হওয়ায় বলেছিলেন, ‘ওই দৃশ্যটা হয়নি।’ পরে প্যাচ হিসাবে ফের ওই দৃশ্যের শুটিং করেন। আলাদা করে ওয়াইড অ্যাঙ্গল লেন্সে শুট করেছিলেন। ডাবিং করলেও কিন্তু হত। কিন্তু ও সবে বিশ্বাস ছিল না ওঁর। ওইটুকু দৃশ্যও যাতে একেবারে নিখুঁত হয় তার জন্যই। ডাবিংয়ে হয়ে যাবে, এতে বিশ্বাসী ছিলেন না। চরিত্রের মুখের অভিব্যক্তিতে ছাপ পড়তে পারে যে! পরবর্তীকালে আমি সুন্দর (ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়) আর প্রদীপকেও (মুখোপাধ্যায়) জিজ্ঞাসা করে দেখেছি। ওঁদেরও কখনও বলেননি। সুন্দরের কাছে শুনেছি, তিন দিন শুটিংয়ের পরে এক বার কাঁচুমাচু মুখে ‘কেমন হচ্ছে’ জিজ্ঞাসা করায় ওঁর সটান জবাব ছিল, ‘ভুল হলে ঠিক বলতাম।’ অভিনেতা হিসাবে আমাদের আফসোস রয়ে গেল, ওঁর কাছ থেকে কখনও ভাল শুনতে পেলাম না। ব্যক্তিগত ভাবে আমার মনে হত, পরিচালক হিসাবে তিনি বেশ পজ়িসিভ ছিলেন। নিজের ছবির অভিনেতাদের অন্য পরিচালকের ছবিতে অভিনয় করাটা খুব একটা পছন্দ ছিল না।

‘একটি টেকেই শট নেওয়া পছন্দ করতেন মানিকদা।’ ছবি: সংগৃহীত।

‘সীমাবদ্ধ’ ছবির শেষ অংশে একটি দৃশ্যে, যেখানে কোনও সংলাপ নেই, সেই দৃশ্য সবচেয়ে স্মরণীয় আমার কাছে। কারণ, মানিকদা সম্পূর্ণ এলাকা খালি করে দিয়েছিলেন, যাতে কোনও ভাবেই আমার মনোযোগ বিঘ্নিত না হয়। সংলাপবিহীন ওই দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা ছিল বেশ কঠিন। ওই দৃশ্যের কথা আমার আজীবন মনে থাকবে। সেইদিনও ওই দৃশ্যের শেষে কিছুই বলেননি মানিকদা। তবে ওঁর চুপ করে থাকা অনেক কিছু বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছিল আমাকে সে দিন।

তাঁকে আমরা ভাবি দাম্ভিক, গর্বিত এক জন মানুষ। তবে শুনেছি, ছোটবেলায় পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানেও তিনি স্কুলে যেতেন না। যদি তিনি পুরস্কৃত হন, এই ভয়ে। কারণ, মঞ্চে ওঠাও পছন্দ ছিল না ওঁর। ব্যক্তি হিসেবে মানিকদা খুবই লাজুক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। আমি শুনেছিলাম, ‘পথের পাঁচালী’র শুটিংয়ের সময় অ্যাকশন বা কাট বলতেও খানিক লজ্জা পেতেন। অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারতেন না সেই ভাবে। কারওর সঙ্গে দেখা হলেও খুব বেশি খোশগল্প করে আলাপ জমাতেও পারতেন না। তবে আমাকে এক বার গল্প করেছিলেন, যে দিন তিনি ‘পথের পাঁচালী’র জন্য পুরস্কার পেলেন, সম্মানিত হলেন সে দিন মঞ্চে উঠে নাকি তাঁর লজ্জা ফুরিয়ে গিয়েছিল। সে দিন মনের কথা উজাড় করে বলেছিলেন মানিকদা। কী ভাবে হয়েছিল তা তিনি নিজেও জানতেন না।

বাবা হিসাবে দারুণ ছিলেন তিনি। গায়ে হাত বুলিয়ে বাবা বাছা করতেন না ঠিকই। তবে অপত্য স্নেহ ছিল বাবু মানে সন্দীপের প্রতি। আর স্বামী হিসাবে বিজয়া রায়ের একেবারে বন্ধু ছিলেন। তবে আমার ব্যক্তিগত মত, যতই বন্ধুত্ব থাকুক না কেন, আদপে তিনি ছিলেন একাকী। ওই যে কথায় আছে না, ‘লোনলি অ্যাট দ্য টপ’। ওই শীর্ষে থাকলে যে একাকীত্ব গ্রাস করে, ওঁকেও করেছিল বলেই মনে হয়েছে আমার।

‘বাবা হিসাবে দারুণ ছিলেন তিনি।’ ছবি: সংগৃহীত।

ওঁর শেষ বয়সটা একেবারেই মনে করতে চাই না আমি। আলোচনাও করতে চাই না। মধ্যগগনে থাকা সত্যজিৎ রায়কেই আমি বাঁচিয়ে রেখেছি আমার মনের মণিকোঠায়। শারীরিক ভাবে সঙ্কুচিত হয়ে গিয়েছিলেন। ওই ব্যক্তিত্ব থেকে নিজেকে গুটিয়ে ফেলেছিলেন। আত্মপ্রত্যয় কোথাও যেন হারিয়ে ফেলেছিলেন। আরও কত কিছু করার ছিল ওঁর। ইন্ডাস্ট্রিকে আরও কত কী দেওয়ার ছিল। ওঁকে ওই ভাবে দেখব স্বপ্নেও ভাবিনি। যে ছবিটা এখন সমাজমাধ্যমে ঘুরে বেড়ায়, হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন মানিকদা, পাশে রাখা রয়েছে তাঁর পুরস্কার। ওটা দেখতে পারি না। ওঁর মৃত্যুতে এত কষ্ট পেয়েছিলাম যে ওঁর বাড়ি আমি যাইনি। আমি চোখে দেখতে পারতাম না ওই দৃশ্য।

আজ ওঁর জন্মবার্ষিকীতে যদি ওঁকে সামনে পেতাম তা হলে বলতাম, ‘আপনিই আমার রিয়েল লাইফ হিরো, মানিকদা। সারাজীবন আপনি তা-ই থাকবেন।’ আর একটা কথাও বলতাম, ‘আবার এক বার আপনার সঙ্গে কাজ করতে চাই, আর একটা ছবিতে, আমায় নেবেন প্লিজ়?’

(সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement