গঙ্গা ধারাবাহিকে ‘অহনা’ কৌশাম্বী চক্রবর্তী। নিজস্ব চিত্র।
গনগনে রোদ। ছাতা ছাড়া হাঁটা দায়। মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে, যদি এক টুকরো মেঘের দেখা মেলে। বেলা বাড়লেই রাস্তায় লোক চলাচল কম। খবর, নিউ থিয়েটার্সের অন্দরে নাকি ডুব সাঁতারের প্রতিযোগিতা চলছে!
ধারাবাহিক ‘গঙ্গা’র সেট। নিজস্ব চিত্র।
গরমে অভিনেতাদের আরামে রাখতেই কি এই আয়োজন? জানতে পায়ে পায়ে সেখানে হাজির আনন্দবাজার ডট কম-এর প্রতিনিধি। স্টুডিয়োর একেবারে শেষ প্রান্তে বড় ব্যানার। তাতে লেখা ‘গঙ্গাবক্ষে ডুব সাঁতারের আয়োজন’। এখানেই শেষ নয়। নীল-কালো সাঁতারের পোশাকে উপস্থিত কৌশাম্বী চক্রবর্তী! ছোটপর্দা কি সাবালক হয়ে গেল? এ ভাবে খোলা আকাশের নীচে অভিনেত্রী সাঁতারের পোশাকে! কৌতূহল নিয়ে এগোতে গিয়েই ধরা পড়ল আরও কিছু। বড় বাগানছাতার নীচে আয়েশ করে বসলেন কৌশাম্বী। সামনে রাখা নরম পানীয়ের গ্লাস। অভিনেত্রী কারও সঙ্গে মুঠোফোনে ব্যস্ত।
শুটে ব্যস্ত কৌশাম্বী। নিজস্ব চিত্র।
‘আগামী তিন ঘণ্টা অর্জুন চ্যাটার্জি আমার কব্জায়’...
কৌশাম্বীকে কেউ চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন, কাউকে কব্জা করতে হবে তাঁকে! অভিনেত্রী সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণও করেছেন। কিন্তু ভরদুপুরে প্রকাশ্যে এ ভাবে সাঁতারের পোশাকে কেন? প্রশ্ন করতেই কৌশাম্বী বললেন, স্টার জলসার ‘গঙ্গা’ ধারাবাহিকের জন্য সাঁতার প্রতিযোগিতার দৃশ্যগ্রহণ চলছে। তারই শুটিংয়ে এই পোশাকে তিনি। কৌশাম্বী এর আগেও সাঁতারের পোশাকে ক্যামেরার সামনে ধরা দিয়েছেন। তাই অস্বস্তি নেই তাঁর। তবে ছোটপর্দায় এই দৃশ্য একটু হলেও ‘সাহসী’, সে কথা একেবারে উড়িয়ে দেননি।
চিত্রনাট্য বলছে, কৌশাম্বী ধারাবাহিকের খলনায়িকা অহনা। প্রতি মুহূর্তে নায়িকা গঙ্গার জীবন ছলেবলেকৌশলে অতিষ্ট করে তুলছেন। সাঁতার প্রতিযোগিতাতেও তিনি একই কাজ করবেন। তাঁকে গঙ্গার পুলিশ-স্বামী অর্জুন চ্যাটার্জিকে কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখতে হবে। এর আগে ‘গৃহপ্রবেশ’ ধারাবাহিকেও তিনি দাপুটে খলনায়িকা ছিলেন। পর্দায় এত দুষ্টুমি করতে ভাল লাগে? জবাব দিতে গিয়ে হেসে ফেললেন কৌশাম্বী। বললেন, “খলনায়িকার চরিত্রে অনেক স্তর। অভিনয় না করলে বোঝা সম্ভব নয়। তা ছাড়া, আমি নায়িকার চরিত্রেও অভিনয় করেছি। সব চরিত্রেই আছি।” বাড়তি দায়িত্ব, সাঁতার শিখতে হবে তাঁকে।
হঠাৎ ধারাবাহিকের সহকারী পরিচালক অভির হাঁক, কৌশাম্বীর শরীর ভেজাতে হবে! ওঁর শরীর শুকনো। সঙ্গে সঙ্গে রূপটানশিল্পী জল স্প্রে করে অভিনেত্রীকে ভিজিয়ে দিলেন আপাদমস্তক।
এর আগে সুইমিং পুলের দৃশ্যও শুট করেছেন কৌশাম্বী। “আউটডোর শুটিং হয়েছে আমাদের। গরমের দিনে জলের শুটিং কী যে আরামের!” তাঁর শুটিং শেষ। কথা বলতে বলতে কৌশাম্বী এগোলেন মেকআপ রুমের দিকে। সাঁতারের পোশাকে ক্যামেরার সামনে আসার আগে শরীরের মাপজোকের, ত্বকের বাড়তি যত্নের প্রয়োজন হয়। কৌশাম্বী কি সেটা মানেন? অভিনেত্রী নিজের ঘরে ঢোকার আগে জানালেন, ক্যামেরার সামনে থাকতে গেলে এমনিতেই নিজের যত্ন নিতে হয়। তাই সাঁতারের পোশাক পরবেন বলে আলাদা করে যত্ন নিতে হয়নি তাঁকে।
শুটের আগে মহড়ায় ‘গঙ্গা’ হিয়া মুখোপাধ্যায়। নিজস্ব চিত্র।
এখানেও আমার ‘সতীন’ আছে...
কৌশাম্বীর শট শেষ হতেই আউটডোর সেটে হাজির ধারাবাহিকের নায়িকা ‘গঙ্গা’ ওরফে হিয়া মুখোপাধ্যায়। ‘গীতা এলএলবি’ ধারাবাহিকের মারকুটে নায়িকা এখানে যেন অনেকটাই নরম? তিনি তখন সাঁতারের পোশাক ছেড়ে গেরুয়া সালোয়ার–কামিজে। ডুব সাঁতার প্রতিযোগিতায় নাম দেওয়ার লম্বা লাইন। সেখানেই বন্ধুদের নিয়ে ধীরে ধীরে এসে দাঁড়ালেন তিনি। ভিড় দেখে ‘গঙ্গা’র কণ্ঠে শঙ্কা! “এত জন নাম দিচ্ছে? আমি পারব তো!”
আগের ধারাবাহিকের ডানপিটে মেয়ে কি এই ধারাবাহিকে উধাও? প্রসঙ্গ তুলতেই হিয়া জানালেন, গ্রামের মেয়ে। গঙ্গার বুক থেকে পয়সা তুলে জীবনধারণ করেছে। শহরে, ধনী পরিবারে বিয়ে হলেও এখনও শহুরে আদবকায়দা পুরোপুরি শিখে উঠতে পারেনি। তাই একটু ভীতু বইকি। কথা বলতে বলতেই পায়ের দিকে চোখ গেল। নায়িকার পায়ে ক্রেপ ব্যান্ডেজ। অল্প খুঁড়িয়ে হাঁটছেন! দুর্ঘটনা? সঙ্গে সঙ্গে হাঁ-হাঁ করে উঠলেন তিনি। হিয়া বললেন, “যা দেখছেন, সবটাই পর্দার জন্য। পায়ের উপর দিয়ে দু’চাকা চলে গিয়েছে। এই পা নিয়ে সাঁতার কাটতে হবে বলেই গঙ্গা ভয় পাচ্ছে।”
শুটের ফাঁকে। নিজস্ব চিত্র।
পুরাণে, দেবী দুর্গার সতীন ছিলেন গঙ্গা। “ধারাবাহিকেও আমার সতীন আছে, অহনা। ওর জ্বালায় টিকতে পারছি না!”, ছদ্মকোপে বলে উঠলেন হিয়া। তত ক্ষণে পরের দৃশ্যের জন্য ডাক এসে গিয়েছে। হিয়া আবার ‘গঙ্গা’য় রূপান্তরিত। ক্যামেরা সাজিয়ে নতুন দৃশ্যের শুটিং শুরু। হঠাৎ বন্ধুদের মধ্যে বিলাপ, ডুব সাঁতার দিতে গিয়ে ‘গঙ্গা’ নাকি নিখোঁজ! ও কি তলিয়ে গেল? তারা বন্ধুর পুলিশ স্বামী অর্জুনকে ফোনে পাচ্ছে না! এ বার কী হবে?
পুলিশ অফিসারের ভূমিকায় সাহেব ভট্টাচার্য। নিজস্ব চিত্র।
গঙ্গা মরতে পারে না...
আনন্দবাজার ডট কম-কে আশ্বস্ত করলেন পুলিশ অফিসার ‘অর্জুন’ ওরফে সাহেব ভট্টাচার্য। বললেন, “অর্জুন একটুও বিশ্বাস করেনি, গঙ্গা তলিয়ে গিয়েছে। তার দৃঢ় বিশ্বাস, তার স্ত্রী বেঁচে আছে। ঠিক জল থেকে উঠে আসবে। ফিরে আসবে তার জীবনে, তাদের সংসারে।” মনের জোর ধরে রেখে তাই সে স্ত্রীকে খুঁজতে ব্যস্ত। তবে দুশ্চিন্তা যে তারও হচ্ছে না, এমন নয়। পুলিশ অফিসার তাই ভিতরে ভিতরে ভেঙে পড়েছে। সেটা অবশ্য বাইরে প্রকাশ করছে না। বরং, নিজের ক্ষমতার বাইরে গিয়ে সে তোলপাড় করে ফেলছে চারপাশ। আর প্রতি মুহূর্তে অপেক্ষা করে রয়েছে, এই বুঝি গঙ্গা ফিরে আসবে!
শুটিংয়ে সুদীপ সরকার। নিজস্ব চিত্র।
যত নষ্টের গোড়া কি সন্দীপ?
বেলা ক্রমশ গড়াচ্ছে। রোদের তাপ ঝিমিয়ে পড়ছে। চারপাশে বিকেলের নরম আলো। এমন সময় দেখা দিলেন ধারাবাহিকের খলনায়ক ‘সন্দীপ’ ওরফে সুদীপ সরকার। মাঝে তিনি খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এখন কেমন আছেন? হাতে সংলাপের পাতা। সুদীপ মৃদু হেসে বললেন, “ভালই ভুগে উঠলাম। এখন আগের তুলনায় ভাল আছি।” আপনিই কি গঙ্গাকে ডুবিয়ে দিয়েছেন? প্রশ্ন শুনে হো হো হাসি। সুদীপের কথায়, “এটা বলে দিলে আর চমক কী থাকল? দর্শক পর্দায় চোখ রাখুন।” তার পরেই তিনি পায়ে পায়ে পিছনে গিয়ে দাঁড়ালেন একটু দূরে। সাজিয়ে রাখা নকল দোকানঘরের পিছনে। ‘সন্দীপ’ ওরফে সুদীপের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি কেবল ‘গঙ্গা’র উপরে। সেই দৃষ্টিতে ক্রুরতা, শয়তানি একসঙ্গে খেলা করছে!
গন্ধটা সত্যিই কেমন যেন সন্দেহজনক... তাই না?