রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে সদ্য। বদল এসেছে টলিউডেও। দীর্ঘদিন ‘দিদি নম্বর ওয়ান’-এর সঞ্চালনার দায়িত্ব ছিল অভিনেত্রী রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাঁধে। সঞ্চালক থাকাকালীনই, ২০২৪ সালে তিনি লোকসভা ভোটে দাঁড়ান। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীকে জিতে সাংসদ হন। তার পর থেকেই বার বার একটি জল্পনা ফিরে ফিরে এসেছে, রচনা কি আদৌ আর সঞ্চালনার কাজ করবেন! যদিও অভিনেত্রী গত দু’বছর সমান তালে দুই দিকই সামলেছেন। কিন্তু আচমকাই সেই ‘কাহিনি’তে নাটকীয় মোচড়!
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গ ছেড়ে আপাতত রচনা তৃণমূল কংগ্রেসের ‘বিদ্রোহী’ সাংসদ দলের সঙ্গে। ইতিমধ্যেই জানা গিয়েছে, ‘দিদি নম্বর ওয়ান’-এ রচনার জায়গায় আসছেন স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়। তবে এই প্রথম নয়। গত ১৭ বছরে ‘দিদি নম্বর ওয়ান’-এর সঞ্চালিকার মুখ বদল হয়েছে একাধিক বার।
২০০৯ সাল থেকে শুরু হয় ‘দিদি নম্বর ওয়ান’। এই রিয়্যালিটি অনুষ্ঠানের শুরুতে সঞ্চালনার দায়িত্ব ছিলেন ছোটপর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী পুষ্পিতা মুখোপাধ্যায়। সেই সময় স্টুডিয়ো নয়, বরং পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে এই ‘গেম শো’ চলত।
‘দিদি নম্বর ওয়ান’–এর মাত্র একটি সিজ়ন সঞ্চালনা করেই ছেড়ে দেন। সেই সময় শোনা গিয়েছিল, অভিনেত্রীর মায়ের অসুস্থতার কারণেই অনুষ্ঠানটি ছাড়তে হয়। যদিও তার পরে একধিক বার প্রতিযোগী হয়ে ‘দিদি নম্বর ওয়ান’–এর মঞ্চে দেখা গিয়েছিল পুষ্পিতাকে।
২০১০ সালে থেকে ‘দিদি নম্বর ওয়ান’-এর সঙ্গে যুক্ত হন অভিনেত্রী রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সময় টেলিভিশনে সঞ্চালনার কাজ করা নিয়ে খানিক দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন বলেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানান অভিনেত্রী। রচনা জানান, অনুষ্ঠানের নির্মাতারা তাঁকে নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। রচনা আরও জানান, সেই সময় যেহেতু নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করছিলেন, তাই টিভির পর্দায় মুখ দেখানো নিয়ে বেশ দ্বিধায় ছিলেন।
রচনা ‘দিদি নম্বর ওয়ান’-এর দায়িত্ব নেওয়ার বছর দুয়েকের মাথায় ফের মুখ বদল হয় অনুষ্ঠানের সঞ্চালিকার। অনুষ্ঠানের তিন নম্বর সিজ়নে সঞ্চালিকার ভূমিকায় দেখা যায় অভিনেত্রী জুন মালিয়াকে। শোনা যায়, সৃজনশীল প্রয়োজনীয়তার কারণে সেই সময় রচনার বদলে নিয়ে আসা হয়েছিল জুনকে।
তার পরের বছর আবার রচনাকে ফিরিয়ে আনা হয় সঞ্চালিকার ভূমিকায়। কিন্তু তার পরের সিজ়নে অর্থাৎ পঞ্চম সি়জ়নে ফের মুখ বদল হয় এই অনুষ্ঠানের। ২০১৩ সালে এই অনুষ্ঠানের সঞ্চালিকা দায়িত্ব নেন অভিনেত্রী দেবশ্রী রায়।
শোনা যায়, সেই সময় নাকি পারিশ্রমিক নিয়ে মতবিরোধের জেরেই নাকি সরে দাঁড়ান রচনা। যদিও এই প্রসঙ্গে রচনা কিংবা প্রযোজনা সংস্থা অথবা চ্যানেল কর্তৃপক্ষ কখনও কোনও মন্তব্য করেননি। তবে একটা সিজ়ন দেবশ্রীর সঞ্চালনার পরে, আবার ষষ্ঠ সিজ়নে ফের ফিরে আসেন রচনা।
তার পর থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাননি রচনা। একটানা এতগুলো সিজ়নের সঞ্চালনা করেন রচনা। মাঝে অবশ্য বেশ কয়েক বার তাঁর অনুমতি নিয়ে অন্য কয়েকজন সঞ্চালককে দেখা গিয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হলেন মীর।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে ‘দিদি নম্বর ওয়ান’ অতিথি হয়ে আসেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই মঞ্চে এসে রুটি বেলতে দেখা যায় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে। রচনার এই অনুষ্ঠানের প্রধান দর্শক মূলত মহিলারাই। বলা হয়, এই অনুষ্ঠান বরাবর অনুপ্রাণিত করেছে মহিলাদেরই। সিনেমা, টেলিভিশন থেকে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের মহিলারা এই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন ‘দিদি’র লড়াইয়ের গল্প শুনে একাধিক বার অনুপ্রাণিত হয়েছেন রচনা নিজেও।
২০২৫ সালের নভেম্বরে এই অনুষ্ঠানের একটি প্রোমো হইচই ফেলে দেয়। সেখানে সঞ্চালকের ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল মীরকে। তিন পর্ব তিনি সঞ্চালনা করেন। অনেকেই ভেবেছিলেন, রচনাকে আবার বাদ দিয়ে বুঝি মীরকে আনা হয়েছিল। শোনা যায়, সেই সময় অভিনেত্রী বিদেশে গিয়েছিলেন। সেই কারণেই দিন কয়েকের জন্য এই পরিবর্তন হয়। অবশ্য মীর আসার জন্য অনুষ্ঠানের নাম বদলে ‘দাদা নাম্বার ওয়ান’ হয়নি!
এর পরে, বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই রচনার এই অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করার ক্ষেত্রে একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সেই সময় ক’টি পর্বের জন্য সঞ্চালনা করেন টেলিভিশনের জনপ্রিয় জুটি শ্বেতা ভট্টাচার্য ও রুবেল দাস।
নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির পরেই অনুষ্ঠানের কয়েকটি পর্বের সঞ্চালনার দায়িত্ব সামলান শ্বেতা-রুবেল জুটি। অনেকেই সেই সময় দাবি করেন, এ বার হয়তো মুখ বদল হবে এই অনুষ্ঠানের সঞ্চালিকার। যদিও শ্বেতা সেই সময় বলেছিলেন, ‘‘রচনাদি থাকবেন না, এটা হতে পারে না। কারণ, দিদির হাত ধরেই এই শোয়ের জনপ্রিয়তা।” সেই সময় ব্যক্তিগত কারণে ক’টা দিন ছুটি নিয়েছিলেন বলেই সেই সময় শ্বেতা-রুবেলকে সেই দায়িত্ব নিতে হয়।
যদিও ‘দিদি নম্বর ওয়ান’-এ অনুপস্থিত রচনাকে তখন দিল্লিতে দেখা গিয়েছে। মমতা-সঙ্গ ত্যাগ করলেও রচনা পরে বলেন, ‘‘দিদির সঙ্গে আমার পুরনো সম্পর্ক। সেই সম্পর্ক অটুট থাকবে। সবাই বলেন, দিদি মানেই তৃণমূল। ঠিকই। তাঁকে দেখেই মানুষ ভোট দেন। কিন্তু আমাকে চিত্রতারকা বলে নয়, মানুষ আমাকে ভোট দিয়েছেন কাজ করার জন্য, যে কাজ গত ১৫ বছরে হয়নি। কাজ করার জন্য কেন্দ্রের সমর্থন দরকার। সেটা খুব জরুরি।’’
রচনার এ হেন রাজনৈতিক শিবির বদলের পাশাপাশি ‘দিদি নম্বর ওয়ান’-এর মুখবদলও খবরের শিরোনামে! রচনার ‘কুর্সি’তে বসছেন স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়। তবে এই বদলের খবর হতেই প্রতিপক্ষকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়লেন রচনা!
ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে স্বস্তিকার সঞ্চালিত ‘দিদি নম্বর ওয়ান’-এর প্রচার ঝলক। এই প্রসঙ্গে রচনা বলেন, “এটা ওদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। ওদের প্রমাণ করে দেখাতে হবে, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বদলি যে কেউ হতে পারে। সেটা করে দেখাক ওরা। আমি সেই দিনটাই দেখার অপেক্ষায় আছি। সঞ্চালিকা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত ওরা নিয়েছিল। আমি আমার সবটুকু দিয়ে এই অনুষ্ঠান করেছি।” তৃণমূল সাংসদের দাবি, ‘দিদি নম্বর ওয়ান’ অনুষ্ঠানটি এই মুহূর্তে যে জায়গায় রয়েছে, তার কৃতিত্ব অধিকাংশই তাঁর।
নতুন সঞ্চালিকা প্রসঙ্গে রচনা বলেন, “স্বস্তিকা আমার খুব ভাল সহকর্মী। বহু দিনের সম্পর্ক আমাদের। নিশ্চয়ই খুব ভাল কাজ করবে। অনেক শুভেচ্ছা। আশা করছি, মানুষও ওকে খুব ভাল ভাবে গ্রহণ করবে। আমি চাই, এই অনুষ্ঠান একই ভাবে জনপ্রিয়তা পাক, সফল হোক।”
অনুষ্ঠানটির ১৭ বছরের খতিয়ান বলছে, প্রতিবারই রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় সরতেই তা প্রভাব ফেলেছে অনুষ্ঠানের টিআরপিতে। তার পর ফের ফিরিয়ে আনা হয়েছে তাঁকে। এ বারও তেমন কিছু ঘটবে, নাকি এখানেও পালাবদল ঘটে গেল তা অবশ্য এখনই বোঝার উপায় নেই।