স্মার্টফোন, টিভি, ফ্রিজ থেকে শুরু করে ব্যাটারিচালিত গাড়ি। আগামী দিনে বৈদ্যুতিন পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করবে মধ্য আফ্রিকার একটি দেশ! কারণ, তাদের হাতে রয়েছে কোবাল্ট ও কোল্টনের মতো বিরল খনিজের বিশাল ভান্ডার। ইতিমধ্যেই সেগুলির কৌশলগত মজুতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। তাতে আগামী দিনে লাভবান হতে পারে নয়াদিল্লিও।
বিরল খনিজসমৃদ্ধ মধ্য আফ্রিকার ওই দেশটি হল ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো (ডিআরসি)। মোট তিনটি ধাতুর কৌশলগত মজুতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেখানকার সরকার। কোবাল্ট ও কোল্টনের পাশাপাশি সেই তালিকায় নাম আছে জার্মেনিয়ামের। সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনায় সাফল্য পেলে বিরল খনিজের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তারা যে অনেকটাই প্রভাব বিস্তার করতে পারবে, তা বলাই বাহুল্য।
গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সাল) কোবাল্ট রফতানির উপর কিছু দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করে ডিআরসি সরকার। তখনই আন্তর্জাতিক বাজারে হু-হু করে বাড়তে থাকে ওই বিরল ধাতুটির দাম। সূত্রের খবর, সেই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সংশ্লিষ্ট খনিজগুলির কৌশলগত মজুতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মধ্য আফ্রিকার দেশটির প্রশাসন। এই সিদ্ধান্ত তাদের অর্থনৈতিক ভাগ্যকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, বর্তমানে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় কোবাল্টের দাম বাড়িয়ে বাড়তি মুনাফা করতে চাইছে ডিআরসি সরকার। সেই চিন্তাভাবনা থেকেই এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। বিরল ধাতু রফতানির ক্ষেত্রে মধ্য আফ্রিকার দেশটিতে একটি কোটা ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে অবশ্য আপাতত কোনও বদল আনছে না তারা।
বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন ডিআরসির স্ট্র্যাটেজিক মিনারেল সাবস্ট্যান্সেস মার্কেট রেগুলেশন অ্যান্ড কন্ট্রোল অথরিটির প্রধান প্যাট্রিক লুয়াবেয়া। তিনি বলেছেন, ‘‘কোবাল্ট-সহ অন্য বিরল ধাতুগুলির দাম বাড়লে আমরা খুশিই হব। তবে এর সুবিধা কেবলমাত্র মধ্য আফ্রিকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না।’’ কৌশলগত মজুত পরিচালনার ভার তাঁর হাতে থাকবে বলেই সূত্র মারফত মিলেছে খবর।
চলতি বছরের জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিরল খনিজের ব্যাপারে একটি অধ্যাদেশ (অর্ডিন্যান্স) জারির সিদ্ধান্ত নেয় ডিআরসি সরকারের মন্ত্রী পরিষদ। তখনই কৌশলগত মজুত নির্মাণের খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। যদিও এ ব্যাপারে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেনি মধ্য আফ্রিকার ওই দেশ। ফলে কত পরিমাণে বিরল ধাতু মজুত করা হবে, তা স্পষ্ট নয়।
কৌশলগত মজুত ভান্ডারের দায়িত্ব পেতে চলা প্যাট্রিকের কথায়, ‘‘ভবিষ্যতে বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং ভারসাম্য বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’’ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, খনিজ পদার্থের ব্যাপারে আফ্রিকার অন্য দেশগুলিও নানা ধরনের পদক্ষেপ করছে। এর মধ্যে রয়েছে জ়িম্বাবোয়ে, মালি ও নাইজার। এদের মধ্যে কেউ কেউ নতুন আইনও পাশ করেছে বলে জানা গিয়েছে।
ডিআরসির মতো জ়িম্বাবোয়েতে পাওয়া যায় লিথিয়াম নামের একটি বিরল ধাতু। সেটি রফতানির ক্ষেত্রে কোটা নির্ধারণ করছে সেখানকার সরকার। অন্য দিকে সোনা ও ইউরেনিয়ামের মতো ধাতু রফতানিতে মুনাফার অঙ্ক বৃদ্ধি করতে নতুন খনি আইন পাশ করেছে মালি ও নাইজার। ফলে এই দেশগুলিরও ভাগ্য খোলার মিলেছে ইঙ্গিত।
ডিআরসি যে তিনটি বিরল ধাতুর কৌশলগত ভান্ডার তৈরি করছে, তার মধ্যে কোবাল্টের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। এর সাহায্যেই তৈরি হয় বৈদ্যুতিন গাড়ির ব্যাটারি। অন্য দিকে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ বানাতে লাগে কোল্টন। আর ফাইবার অপটিক এবং ইনফ্রারেড ব্যবস্থা গড়ে তুলতে লাগে জার্মেনিয়াম। বিরল ধাতুগুলির মধ্যে এটি খুব অল্প পরিমাণে ব্যবহৃত হয় বলে জানা গিয়েছে।
সূত্রের খবর, আপাতত বিরল ধাতু রফতানিতে রাশ টানতে চাইছে ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো। প্রস্তাবিত কৌশলগত ভান্ডারটি বিদেশি লগ্নিকারীদের আকৃষ্ট করবে বলে মনে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে সাহায্য পেতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালায় মধ্য আফ্রিকার ওই দেশ। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসাবেই ১২,০০ কোটি ডলারের খনিজের মজুত গড়ে তুলবে তারা।
লুয়াবেয়া জানিয়েছেন, মূলত বেসামরিক পণ্য উৎপাদনের জন্যই বিরল ধাতু রফতানি করবে ডিআরসি। তবে বর্তমানে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরিতেও বহুল পরিমাণে এই ধাতুগুলি ব্যবহার হয়ে থাকে। তাই এ ব্যাপারে ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলিকে বেছে নিয়ে কোবাল্ট, কোল্টন বা জার্মেনিয়াম সরবরাহ করবে তারা। সেই তালিকা অবশ্য এখনই প্রকাশ করছেন না প্যাট্রিক।
বর্তমানে বিশ্ব জুড়ে বিরল খনিজের সরবরাহ শৃঙ্খল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে চিন। আর তাই এ ব্যাপারে বেজিঙের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ান (ইইউ) বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পশ্চিমি দুনিয়ার শক্তিশালী দেশ। আর তাই মাঝেমধ্যেই এ ব্যাপারে তাদের ব্ল্যাকমেল করে থাকেন ড্রাগনভূমির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
বিশ্লেষকদের দাবি, ডিআরসির কৌশলগত মজুত চিনের একচেটিয়া ব্যবসায় আঘাত হানতে পারে যেটা পশ্চিমি দুনিয়ার কাছে স্বস্তির। সূত্রের খবর, তিনটি বিরল ধাতুর পাশাপাশি আগামী দিনে তামা ও লিথিয়াম মজুতের পরিকল্পনা করছে মধ্য আফ্রিকার ওই দেশ। সে ক্ষেত্রে এগুলির রফতানির উপর তারা যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে, তা বলাই বাহুল্য।
গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) জুনে আমেরিকার মধ্যস্থতায় প্রতিবেশী রোয়ান্ডার সঙ্গে ৩০ বছর ধরে চলা ‘যুদ্ধ’ থামাতে সম্মত হয় ডিআরসি। ডিসেম্বরে হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপস্থিতিতে শান্তিচুক্তিতে সই করেন যুযুধান দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান। সমঝোতা হওয়ার পর মধ্য আফ্রিকার ওই দুই দেশ থেকে বিরল খনিজ কেনার কথা ঘোষণা করে ওয়াশিংটন।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, ট্রাম্পের মূল নজর রয়েছে পূর্ব ও মধ্য আফ্রিকার বিখ্যাত ‘গ্রেট লেক্স’ এলাকার উপর। সেখানেই আছে বিরল খনিজের বিশাল ভান্ডার। ওই এলাকাটিকে আফ্রিকার ‘হৃৎপিণ্ড’ বলা যেতে পারে। সেখানে আছে মিষ্টি জলের একাধিক হ্রদ। এর মধ্যে সর্ববৃহৎটির নাম ভিক্টোরিয়া। দ্বিতীয়টি হল টাঙ্গানাইকা হ্রদ। গ্রেট লেক্স অঞ্চলকে ঘিরে রেখেছে আফ্রিকার ১০টি দেশ। এর মধ্যে ডিআরসি ও রোয়ান্ডা অন্যতম।
সরকারি তথ্য বলছে, রোয়ান্ডা সীমান্ত লাগোয়া ডিআরসি ভূখণ্ডে মজুত রয়েছে দুনিয়ার অর্ধেকের বেশি কোবাল্ট ও কোল্টন। এ ছাড়া সোনা, তামা এবং লিথিয়ামের মতো খনিজ সম্পদের বিরাট ভান্ডার রয়েছে সেখানে। অভিযোগ, স্থানীয় বিদ্রোহীদের কাজে লাগিয়ে সেগুলি কব্জা করার মতলব করছে চিন। আর তাই চুপ করে বসে না থেকে শান্তিচুক্তির অছিলায় আফ্রিকায় ‘দাবার চাল’ দেন ট্রাম্প, বলছেন কূটনীতিকেরা।
বর্তমানে বিশ্বের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কোবাল্ট সরবরাহ করে ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো (ডিআরসি)। কিন্তু মধ্য আফ্রিকার দেশটির ৮০ শতাংশ কোবাল্ট খনির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বেজিঙের সরকারি সংস্থার হাতে। তামা উত্তোলনের ছবিটাও একই রকম। ডিআরসির তাম্র এবং কোল্টন খনির ৮০ শতাংশ দখল করে রেখেছে ড্রাগন সরকার। পাশাপাশি সোনা, লিথিয়াম এবং অন্যান্য খনিজের উত্তোলন এবং ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে বিপুল লগ্নি রয়েছে চিনের।
পশ্চিমের সংবাদমাধ্যমগুলির দাবি, আফ্রিকার ওই এলাকার খনিজ সম্পদ হাতে পেতে ৪৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে বেজিং। মাটির গভীর থেকে উত্তোলনের পর কোবাল্টকে সরাসরি ব্যবহার করা যায় না। সেগুলিকে পাঠাতে হয় শোধনাগারে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ডিআরসির অধিকাংশ কোবাল্ট শোধনাগার চালায় চিন। সেখান থেকেই সারা বিশ্বের ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধ কোবাল্ট সরবরাহ করে ড্রাগনভূমির একাধিক সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থা।
এই পরিস্থিতিতে বিরল খনিজের ভান্ডার তৈরির সিদ্ধান্ত ডিআরসি সরকারের মাস্টারস্ট্রোক বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। এর জেরে আগামিদিনে সংশ্লিষ্ট ধাতুগুলি ইচ্ছামতো রফতানির সুযোগ পাবে মধ্য আফ্রিকার ওই দেশ। ফলে বেজিংকে বাদ দিতে কোবাল্ট বা কোল্টন আমদানির সুযোগ পাবে ভারত। সেটা নয়াদিল্লির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।