পেশাজীবন শুরু করেছিলেন সংবাদপাঠিকা হিসাবে। তার পর অভিনয়ে। মাত্র এক দশকের কেরিয়ারে দেশ-বিদেশের চলচ্চিত্রজগতে সুনাম অর্জন করে ফেলেছিলেন স্মিতা পাটিল। তাঁর অভিনয়ের ভূয়সী প্রশংসা ছড়িয়ে পড়েছিল চতুর্দিকে। কিন্তু এই নায়িকাকে চড় মেরেছিলেন বলিউডের ‘মোগ্যাম্বো’ অমরীশ পুরী। পরিচালকের সঙ্গে শলা করে ভিড়ে ঠাসা শুটিং ফ্লোরে নায়িকাকে সপাটে চড় মেরেছিলেন তিনি।
১৯৫৫ সালের অক্টোবরে পুণেয় জন্ম স্মিতার। বাবা রাজনীতিক এবং মা সমাজসেবী। পুণে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর মুম্বইয়ে সংবাদপাঠিকা হিসাবে কেরিয়ার শুরু করেছিলেন স্মিতা। পরে জনপ্রিয় পরিচালক শ্যাম বেনেগলের নজরে পড়েছিলেন তিনি।
১৯৭৫ সালে অভিনয়জগতে পা রেখেছিলেন স্মিতা। কম সময়ের মধ্যেই বড়পর্দায় মুখ্যচরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়োতে শুরু করেছিলেন তিনি। কেরিয়ার গড়ার এক বছরের মধ্যেই বলিউডের নামকরা খলনায়ক অমরীশ পুরীর সঙ্গে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন স্মিতা। হিন্দি এবং মরাঠি ভাষার ছবি মিলিয়ে মোট ৮০টি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন তিনি। তার মধ্যে ১৬টি ছবিতে অমরীশের সঙ্গে অভিনয় করতে দেখা গিয়েছিল স্মিতাকে। দু’জনের পেশাদারি সম্পর্ক বরাবর বেশ ভালই ছিল।
১৯৭৭ সালে শ্যাম বেনেগলের পরিচালনায় প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ‘ভূমিকা’। সেই ছবিতে স্মিতার পাশাপাশি অভিনয় করেছিলেন অমরীশও। বলিপাড়া সূত্রে খবর, ‘ভূমিকা’র শুটিং চলাকালীন পরিচালকের সঙ্গে শলা করে স্মিতাকে সকলের সামনে চড় মেরেছিলেন অমরীশ। অভিনেতার এই পদক্ষেপকে সমর্থনও করেছিলেন পরিচালক শ্যাম।
‘ভূমিকা’ ছবির একটি দৃশ্যে দেখা যায়, স্মিতা অবাধ্য হয়ে একটি ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন এবং অমরীশ তাঁকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এই দৃশ্যের শুটিং করছিলেন দুই তারকা। কিন্তু শুটিংয়ের ঠিক আগের মুহূর্তে শ্যামকে নিয়ে একটু আড়ালে চলে গিয়েছিলেন অমরীশ। সেখানেই নায়িকাকে চড় মারার পরিকল্পনা করেছিলেন দু’জনে।
এক জেদি মহিলা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন এবং এক পুরুষ তাঁকে যেতে দিচ্ছেন না। এমন মুহূর্তে সেই পুরুষ বাধা দেওয়ার জন্য রেগে গিয়ে চড় মারতে পারেন। অমরীশও সেই দৃশ্যটিকে বাস্তবসম্মত করার জন্য স্মিতাকে চড় মারার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু নায়িকাকে আগে থেকে জানিয়ে দিলে যদি ক্যামেরায় আসল অভিব্যক্তি ধরা না পড়ে, সে কারণেই নায়িকার কাছে বিষয়টি গোপন করেছিলেন অমরীশ।
অমরীশ তাঁর ভাবনা জানিয়েছিলেন পরিচালক শ্যামকে। অমরীশের এই পদক্ষেপকে সমর্থন করেছিলেন শ্যাম। তাই স্মিতাকে না জানিয়েই চড় মারার দৃশ্য শুট শুরু হয়েছিল। শুটিং চলার মাঝে স্মিতা যখন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন, তখন নায়িকার গালে সপাটে চড় মেরেছিলেন অমরীশ। চিত্রনাট্যের বাইরে গিয়ে সহ-অভিনেতা তাঁকে কেন সকলের সামনে চড় মারলেন, তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না স্মিতা।
ঘটনাটির জন্য স্মিতা একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না। চড় খাওয়ার পর স্মিতা এমন স্তম্ভিত এবং আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন যে, তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন। তাঁর চোখেমুখে অপমানবোধও ফুটে উঠেছিল। আসলে, এই চমক আর যন্ত্রণার অভিব্যক্তিই তুলে ধরতে চেয়েছিলেন পরিচালক।
শুটিং ফ্লোর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে চাইলে স্মিতাকে আটকেছিলেন শ্যাম এবং অমরীশ। ক্ষমা চেয়ে পুরো বিষয়টি স্মিতাকে জানিয়েছিলেন তাঁরা। সব জানার পর শান্ত হন স্মিতা। তার পর পেশাদারিত্বের সঙ্গেই পুরো শুটিং শেষ করেছিলেন।
১৯৭৭ সালে ‘ভূমিকা’ মুক্তি পেলে স্মিতার অভিনয় প্রশংসা পেয়েছিল। বিদেশের বহু চলচ্চিত্র উৎসবেও এই ছবিটি দেখানো হয়েছিল। দেশের মাটি পেরিয়ে স্মিতার অভিনয় আরও বৃহৎ পরিসরের দর্শকের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল।
‘ভূমিকা’ মুক্তি পাওয়ার পরেও অমরীশের সঙ্গে অভিনয় করতে দেখা গিয়েছিল স্মিতাকে। ১৯৮৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ওয়ারিশ’ ছবিতে শেষ বারের মতো স্মিতা এবং অমরীশকে একসঙ্গে অভিনয় করতে দেখা যায়।
‘ভূমিকা’ ছবির জন্য জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন স্মিতা। পরে ‘চক্র’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য দ্বিতীয় বার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। শোনা যায়, প্রথম জাতীয় পুরস্কারের অর্থ স্মিতা দান করেছিলেন সমাজসেবামূলক কাজে।
বিবাহিত বলি অভিনেতা রাজ বব্বরের সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন স্মিতা। ১৯৮৬ সালের নভেম্বরে পুত্রসন্তানের জন্ম দেওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থা জটিল হয়ে পড়েছিল। আর সুস্থ হতে পারেননি। দু’সপ্তাহের মাথায় সদ্যোজাত পুত্রকে রেখে চলে গিয়েছিলেন স্মিতা। মাত্র ৩১ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন জনপ্রিয় বলি অভিনেত্রী।