কখনও ছবি তোলাকে কেন্দ্র করে ইটালীয় প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে জনপ্রিয়তা নিয়ে খোঁচা। কখনও আবার শান্তি সমঝোতা সত্ত্বেও হরমুজ় নিয়ে ইরানকে হুমকি। এ-হেন খামখেয়ালি মেজাজের জন্য ধীরে ধীরে নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির সমর্থন খোয়াচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর জেরে আগামী দিনে নানা ইস্যুতে তাঁকে পস্তাতে হতে পারে বলেও মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
সম্প্রতি জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ফ্রান্স সফরে যান ট্রাম্প। সেখানে হঠাৎই মেলোনিকে নিয়ে রোমান গণমাধ্যমে বিস্ফোরক মন্তব্য করে বসেন তিনি। মার্কিন প্রেসি়ডেন্টের দাবি, তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার জন্য বায়না জোড়েন জর্জিয়া। কারণ, ইটালিতে নাকি কমছে মেলোনির জনপ্রিয়তা। শুধু তা-ই নয়, মেলোনির পীড়াপীড়িতেই ইচ্ছা না থাকলেও ছবি তুলতে রাজি হতে হয় তাঁকে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পরই দুনিয়া জুড়ে পড়ে যায় শোরগোল। ফুঁসে ওঠেন মেলোনিও। সমাজমাধ্যমে করা পোস্টে পাল্টা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে খোঁচা দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমার জনপ্রিয়তা নিয়ে আপনার না ভাবলেও চলবে। আপনি বরং নিজের জনপ্রিয়তার দিকে নজর দিন।’’ এর পাশাপাশি আমেরিকা সফর স্থগিত করেন ইটালীয় প্রধানমন্ত্রী।
মার্কিন গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমাজমাধ্যমের পোস্টে খুব একটা ভুল বলেননি জর্জিয়া। দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে গত দেড় বছরে হু-হু করে আমেরিকায় কমেছে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা। চলতি বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে মধ্যবর্তী (মিড টার্ম) নির্বাচন। পোটাসের (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস) জন্যই সেখানে বড় ধাক্কা খেতে পারে তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি।
গত বছরের (২০২৫) এপ্রিলে পারস্পরিক শুল্ক নীতি চালু করেন ট্রাম্প। বিশ্লেষকদের দাবি, ওই সময় থেকে নিম্নমুখী হতে থাকে তাঁর জনপ্রিয়তার সূচক। কারণ, এই সিদ্ধান্তের জেরে আচমকাই মোটা লোকসানের মুখে পড়েন যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পপতিরা। পাশাপাশি, ভারত ও পশ্চিম ইউরোপ-সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে থাকা পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে লাগে ধাক্কা।
পারস্পরিক শুল্ক নীতি চালু করার কিছু দিনের মধ্যেই চিনের সঙ্গে শুল্ক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন ট্রাম্প। এতে আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমেরিকার বৈদেশিক বাণিজ্য। ওই পর্বে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার সূচককেও লাফিয়ে লাফিয়ে নামতে দেখা যাচ্ছিল। শিল্পপতিরা যখন বিকল্প পথের সন্ধান করছেন, তখনই হঠাৎ বেজিঙের সঙ্গে শুল্কযুদ্ধে ইতি টানেন পোটাস।
ট্রাম্পের এই ধরনের খামখেয়ালিপনাকে একেবারেই ভাল চোখে দেখেনি যুক্তরাষ্ট্রের আমজনতা। কূটনীতিকদের দাবি, এর জেরে পুরনো ‘বন্ধু’দের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে আমেরিকার। মার্কিন বিদেশনীতিকে সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করে ভারতের মতো কৌশলগত অংশীদারেরাও। ফলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর আসতে আসতে অনেকটাই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে রিপাবলিকান পার্টি।
এ বছরের জানুয়ারির একেবারে শুরুতেই ভেনেজ়ুয়েলায় সামরিক অভিযান চালায় মার্কিন ফৌজ। রাজধানী কারাকাসে ঢুকে সস্ত্রীক সেখানকার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনে যুক্তরাষ্ট্রের ডেল্টা ফোর্স। ট্রাম্প জানিয়ে দেন, এ বার থেকে দক্ষিণ (লাটিন) আমেরিকার দেশটির খনিজ তেলের ভান্ডার নিয়ন্ত্রণ করবে ওয়াশিংটন। এতে কিছুটা উন্নত হয় তাঁর জনপ্রিয়তার সূচক।
এর পর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজ়রায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানে যৌথ সামরিক অভিযান চালায় আমেরিকা। প্রথম দিনই তাদের আক্রমণে প্রাণ হারান তেহরানের শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই-সহ একগুচ্ছ সেনা অফিসার। ফলে মার্কিন মুলুকে তাঁর জনপ্রিয়তা অনেকাংশে বাড়বে বলে একরকম নিশ্চিত ছিলেন ট্রাম্প।
কিন্তু, প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে ইরান প্রত্যাঘাতে নামলে বিপাকে পড়েন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যুদ্ধের গোড়াতেই হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে তেহরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি। পারস্য উপসাগরের এই সঙ্কীর্ণ সামুদ্রিক রাস্তা দিয়েই বিশ্ব জুড়ে খনিজ তেল সরবরাহ করে থাকে পশ্চিম এশিয়ার অধিকাংশ আরব রাষ্ট্র। হরমুজ় বন্ধ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে ঊর্ধ্বমুখী হয় জ্বালানির দাম।
খনিজ তেলের দাম বাড়তেই ধীরে ধীরে চড়তে থাকে মুদ্রাস্ফীতির সূচক। সেই আঁচ থেকে বাঁচতে পারেনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও। ট্রাম্প অবশ্য বিষয়টিকে একেবারেই পাত্তা দেননি। উল্টে ‘আমি মূল্যবৃদ্ধি ভালবাসি’ বলে বিতর্কিত বিবৃতি দিয়ে বসেন তিনি। এতে যুক্তরাষ্ট্রের আমজনতার ক্ষোভের আগুনে ঘি পড়ে বললে অত্যুক্তি হবে না।
অন্য দিকে, মার্কিন আগ্রাসন রুখতে হরমুজ় অবরুদ্ধ করেই যে ইরান চুপ করে ছিল, এমনটা নয়। পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলিতে লাগাতার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় তেহরান। তাদের প্রতি-আক্রমণে লড়াকু জেট ও ট্যাঙ্কার উড়ান মিলিয়ে ধ্বংস হয় আমেরিকার ৪০-এর বেশি যুদ্ধবিমান। উড়ে যায় কয়েক কোটি ডলার মূল্যের রেডারও।
যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রে আরও হ্রাস পায় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা। ইরান সংঘাতের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন দুঁদে কুটনীতিকদের একাংশ। ওঠে সাংবিধানিক প্রশ্নও। অনেকেই বলতে শুরু করেন, সংঘর্ষে নামার আগে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমতি নেননি পোটাস, যেটা সম্পূর্ণ ভাবে বেআইনি।
এ বছরের মার্চ-এপ্রিলে যুদ্ধ ভয়াবহ আকার নিলে তার খরচ সংক্রান্ত অনুমোদনে বাধা দেয় কংগ্রেস। ফলে সংঘাত পরিস্থিতিতে ১৮০ কোটি ডলার ব্যয় করতে পারেননি ট্রাম্প। পার্লামেন্টে এই প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন জানান রিপাবলিকান পার্টির তিন থেকে চার জন সদস্য। প্রকাশ্যে ট্রাম্পের কাজের সমালোচনাও করতে শোনা গিয়েছে তাঁদের।
মার্কিন পার্লামেন্টের নিম্ন ও উচ্চকক্ষের নাম যথাক্রমে হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভ ও সেনেট। দ্বিতীয়টিতে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে সেখানে যুদ্ধের খরচ সংক্রান্ত ব্যয়বরাদ্দের বিষয়টি অনুমোদন পাবে বলে মনে করা হচ্ছিল। যদিও বাস্তবে তা হয়নি। দলের নেতারা যে পোটাসের উপর কতটা বিরক্ত, তখনই তার প্রমাণ মিলেছিল।
গত ৮ জুন ট্রাম্পকে নিয়ে একটি জনমত সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করে সংবাদসংস্থা রয়টার্স। সেখানে দেখা গিয়েছে, গত মে মাসে তাঁর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন মাত্র ৩৪-৩৫ শতাংশ আমেরিকাবাসী। নভেম্বর আসতে আসতে সেটা ২৫ শতাংশের নীচে নামতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির জেরে সর্বাধিক সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে ট্রাম্পকে। রয়টার্সের সমীক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী, ৫৯ শতাংশ আমেরিকাবাসী মনে করেন আগামী দিনে আরও বাড়বে খনিজ তেলের দাম। অন্য দিকে মাত্র ১৭ শতাংশ বাসিন্দা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে বলে আশাপ্রকাশ করেছেন।
সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, সেই কারণেই তড়িঘড়ি পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধে ইতি টেনেছেন ট্রাম্প। তেহরানের সঙ্গে শান্তি সমঝোতায় সই করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। তবে দুই দেশের মধ্যে কোনও চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। এ ব্যাপারে আলোচনার জন্য সুইৎজ়ারল্যান্ড গিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স। সেখানে বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে পাঠিয়েছে ইরান।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় দু’টি বিষয় সামনে রাখছে ইরান। প্রথমত, ইজ়রায়েলকে অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে লেবাননে সামরিক অভিযান। কারণ, পশ্চিম এশিয়ার ওই দেশটি তেহরান মদতপুষ্ট বিদ্রোহী গোষ্ঠী হিজ়বুল্লার গড় হিসাবে পরিচিত। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ দিন ধরেই পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে সাবেক পারস্যের শিয়া মুলুক। সেই রাস্তা থেকে কোনও মতেই সরতে রাজি নয় তারা।
কিন্তু, তার মধ্যেই হরমুজ় নিয়ে ফের বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। তাঁর কথায়, শান্তিচুক্তি না হলে ওই সামুদ্রিক জলপথে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে শুল্ক আরোপ করবে আমেরিকা। এই ধরনের মন্তব্যের জেরে ইরান ফের সংঘাতের রাস্তায় ফিরলে তাঁর জনপ্রিয়তার সূচক যে খাদে নামবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই বিশেষ আদেশনামায় (এক্জ়িকিউটিভ অর্ডার) সই করে নির্দেশ দিচ্ছিলেন ট্রাম্প। নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের দুই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে তাঁর পক্ষে প্রশাসন চালানো কঠিন হবে। সে ক্ষেত্রে কোনও সাংবিধানিক সঙ্কট তৈরি হয় কি না, সেটাই এখন দেখার।