রাজ চক্রবর্তীও কি ‘হোক কলরব’-এ বিশ্বাসী? ছবি: ফেসবুক।
সাক্ষাৎকার দেওয়ার আগে কড়া শর্ত। রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন নয়। ‘দেশু ৭’ নিয়েও নয়! একই কথা শুনতে শুনতে ক্লান্ত তিনি। এ দিকে, বাঙালির প্রেমদিবসে ‘হোক কলরব’! ‘প্রেমিকসত্তা’ও কি অতীত ? আনন্দবাজার ডট কম-এর মুখোমুখি পরিচালক রাজ চক্রবর্তী।
প্রশ্ন: সরস্বতীপুজোয় বিপ্লবের বার্তা? রাজ চক্রবর্তী তো প্রেমের ছবির ‘স্পেশ্যালিস্ট’!
রাজ: (মাথা নাড়িয়ে প্রতিবাদ) পরিচালকের কোনও তকমা হতেই পারে না। ইনি প্রেমের ছবি বানাতে পারেন। উনি বিপ্লবের বার্তায় পারদর্শী। তা হলে তো সবটাই ভীষণ একঘেয়ে হয়ে যাবে। এই আপনিই কিন্তু তখন বলবেন, আমি তো একই রকম ছবি বানাই! শুভশ্রীকে নিয়ে পর পর ছবি বানালে যেমন বলেন, আমি অভিনেত্রী স্ত্রীকে নিয়েই ছবি বানাই। আসলে ঠিক কী বলতে চান? (একটু থেমে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে) পরিচালক হিসাবে আমি সব ধরনের ছবিই করতে চাই। এমন ছবি বানাতে চাই, যাতে আজ থেকে ২০ বছর পরে ছেলের সঙ্গে বসে ছবিটা নিয়ে আলোচনায় বসতে পারি।
প্রশ্ন: ‘হোক কলরব’ মুক্তির আগে কাকতালীয় ভাবে এসআইআর, স্ক্রিনিং কমিটি নিয়ে গোলযোগ, টলিউডের ‘লালবাজার অভিযান’! প্রেক্ষাপট তৈরিই
ছিল?
রাজ: প্রথমটি ছা়ড়া বাকিগুলো ইন্ডাস্ট্রির অভ্যন্তরীণ সমস্যা। এ রকম সমস্যা প্রত্যেক ইন্ডাস্ট্রিতেই কমবেশি থাকে।
প্রশ্ন: তা বলে লালবাজারে তারকারা!
রাজ: কেউ হেনস্থার শিকার হয়েছেন বলে মনে করেছেন। তাই লালবাজার গিয়েছেন। ঠিক জায়গাতেই তো গিয়েছেন! ওখানে প্রশাসনিক সহযোগিতা পাবেন। ঘরে বসে সমাজমাধ্যমে তো চাট্টি বাজে কথা লেখেননি!
প্রশ্ন: আপনি পর্দায় ‘কলরব’ তুললেন?
রাজ: অনেক দিন ধরেই ‘অ্যান্টি র্যাগিং’ নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে। ইদানীং মনে হয়, এখন যে ছবিগুলো করব, সেগুলো ইস্যুভিত্তিক ছবি হোক। ছবিতে বার্তা থাকুক। যে ছবি নিয়ে ১০ বা ২০ বছর পরেও কথা বলতে পারি। বিনোদনধর্মী বা ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ ছবিও বানাতে চাই। তার মাঝখানে না হয় একটু অন্য ধারার ছবিও বানালাম। ‘হোক কলরব’ এই ভাবনার ফসল। আর ‘র্যাগিং’-এর মধ্যে দিয়ে আমরা সবাই এসেছি। স্কুল-কলেজ, পাড়ার ক্লাব, পাড়ার রক, পেশাজীবন— কোথায় র্যাগিং নেই! কিন্তু গণ্ডি পেরোলেই ঘটে অঘটন। সেটা থামাতেই এই ছবির ভাবনা। এটা আরও একটি কারণ।
‘হোক কলরব’ ছবিতে রোহন ভট্টাচার্য, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, পার্থ ভৌমিক। ছবি: ফেসবুক।
প্রশ্ন: রাজ চক্রবর্তীর সঙ্গে শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, অভিনেতা-রাজনীতিবিদ পার্থ ভৌমিক ‘কমন ফ্যাক্টর’?
রাজ: কারণ, পরপর আমরা ‘আবার প্রলয়’, ‘হোক কলরব’ করলাম। এর পরে অন্যদের নিয়ে যখন কাজ করব, তখন তাঁরাও ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে উঠবেন। আসলে পুরোটাই নির্ভর করে, আমরা কার সঙ্গে কত দিন ‘ঘর’ করছি। এঁরা একই ভাবে আমার ‘লাকি জুটি’ও। বলতে পারেন, এঁদের নিয়ে পরীক্ষা-নীরিক্ষা করাটাও তাই আমার পক্ষে সহজ (বলেই হাসি)। লিখবেন, এঁরা আমার ‘সচিন-সহবাগ’।
প্রশ্ন: বাকি অভিনেতাদের যখন বাছলেন, তখন তারকা বাছলেন না...
রাজ: এই ছবিতে তারকাদের তো দরকার পড়েনি! ‘সন্তান’ ছবিতে তারকার দরকার ছিল। ছবিতে মিঠুন চক্রবর্তী, শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়, ঋত্বিক চক্রবর্তীরা ছিলেন। এই ছবি তারকা তৈরির ছবি।
প্রশ্ন: ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে শাসকদলের বিধায়ক আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটি ঘটনা পর্দায় দেখালেন। দর্শক কী বলছেন, ছবির গল্প দলের পক্ষে গেল না বিপক্ষে?
রাজ: আমি ছবির মাধ্যমে এটাই দর্শকদের বোঝাতে চেয়েছি, পরিচালক রাজ চক্রবর্তী আর বিধায়ক রাজ চক্রবর্তী এক নন। দুটো সত্তাকে আলাদা করতে জানি। এই ছবিতে কোনও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নেই। দর্শকেরাও ছবি দেখে নিশ্চয়ই বুঝেছেন। রাজনৈতিক এজেন্ডা থাকলে অবশ্যই নিজের দলের হলেই বার্তা দিতাম। একজন চিকিৎসক যেমন রোগী কোন দলের সমর্থক সেটা দেখেন না, আমিও ‘রংহীন’ হয়েই ছবি পরিচালনা করেছি। বরং বলতে পারেন, খুব সাবধানী হয়ে প্রতিটা দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেছি। যাতে যা বলতে চাই, সেটা নিরপেক্ষ ভাবে দেখাতে পারি।
প্রশ্ন: ছাত্রাবস্থায় রাজনীতি আদৌ কাম্য? দুই বাংলার পরিস্থিতি দেখে কী মনে হয়?
রাজ: অবশ্যই ছাত্র আন্দোলন, ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজন আছে। যাবতীয় বিপ্লব, প্রতিবাদ তো ওঁরাই করেন। ওঁরা সমাজ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। ছাত্রাবস্থা থেকে রাজনীতি শুরু করলে দেশ কিন্তু ভাল নেতা পায়। এই মুহূর্তে যাঁরা তাবড় রাজনীতিবিদ, আমার মনে হয়, তাঁরা কোনও না কোনও সময় ছাত্রাবস্থাতেও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
প্রশ্ন: রাজ চক্রবর্তীও তা-ই?
রাজ: না, আমি ছাত্রাবস্থায় রাজনীতি করিনি। অনেক পরে এসেছি। আমার মতো অনেকেই পরে রাজনীতিকে ভালবেসে যোগ দিয়েছেন। (একটু থেমে) দেখুন, আমরা বাঙালি। আমাদের ডিএনএ-তে রাজনীতি। সরাসরি এই পেশায় না থাকলেও প্রত্যেকে কমবেশি রাজনীতিসচেতন। যেমন, আমাদের রক্তে যেমন ফুটবল, ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসা, উন্মাদনা রয়েছে। আমাদের রক্তে একই ভাব শিল্প-সংস্কৃতি, ভাল খাবারের প্রতি ঝোঁক রয়েছে। এগুলো আমাদের থাকবে। চাইলেও, না-চাইলেও। রাজনীতিও তেমনই। যদিও এখনকার রাজনীতি সমাজমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ। এই প্রজন্ম এখানেই রাজনীতি করতে ভালবাসে। তাঁরা ভাবেন, আবার রাস্তায় নামবেন? জলে-ঝড়ে ঝান্ডা নিয়ে বেরোবেন? ব্যতিক্রমও আছেন। তাঁরা পথে নেমেই আন্দোলন করেন।
প্রশ্ন: পথে নামা সব আন্দোলন সফল? সাম্প্রতিক আরজি কর আন্দোলন কি তা-ই বলছে?
রাজ: কখনও হয়েছে, কখনও হয়নি। আরজি কর আন্দোলনকে আপনি এক ভাবে দেখছেন। আমি এক ভাবে দেখি। পার্থ ভৌমিক আর এক ভাবে দেখেন। প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গির ফারাক রয়েছে। আরজি কর নিয়ে ছবি বানাতে গেলেই এক এক জন পরিচালক এক এক ভাবে বানাবেন! কারণ, আসল গল্প কেউ জানেন না। সিবিআই তদন্তের পরেও কিন্তু প্রকৃত ঘটনা অজানাই। ফলে, আন্দোলন ব্যর্থ না সার্থক— এটা বলার জায়গা বোধহয় এখনও আসেনি। এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলি?
প্রশ্ন: বলুন না...
রাজ: আমি কিন্তু এমন লোকও দেখেছি, যাঁরা ঝান্ডা হাতে পথ হেঁটেছেন, তাঁরা পরের দিন বাড়ি ফিরে সুখে নিদ্রা গিয়েছেন! আবার আন্দোলন করতে এসে ‘বয়কট বাবলি’, ‘বয়কট বাংলা ছবি’ও করেছেন অনেকে। তাঁরাই কিন্তু মাল্টিপ্লেক্সে ‘স্ত্রী ২’ দেখে পার্টিতে মেতেছেন! এ রকম আন্দোলন কোনও দিনই ধোপে টিকবে না। এটাও সমাজমাধ্যমে দেখানো ইদানীং কালের আন্দোলন মতোই। আবারও বলছি, সবাই নন। সিংহভাগ এই দলে। ব্যতিক্রমীদের অবশ্যই সাধুবাদ প্রাপ্য। তাঁরা কিন্তু আজও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। আজ ‘হোক কলরব’ হচ্ছে। আগামী দিনে হয়তো ‘আরজি কর আন্দোলন’ হবে! সারা ক্ষণ রাজ্য সরকারকে খারাপ বললে হবে? সরকার খারাপ হলে বার বার মানুষ নির্বাচনে জিতিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আনত না।
প্রশ্ন: ‘রংহীন’ ছবি বানানোর পরেই রাজ চক্রবর্তীর পরিচালনায় ‘লক্ষ্মী এল ঘরে’...
রাজ: আপনাদের সকলের কাছে হয়তো খবর নেই, এই ছবির পরিচালক অরিজিৎ টোটন চক্রবর্তী। আমার হয়তো কিছু সহযোগিতা রয়েছে। এটা আমার পরিচালনা নয়। এটি একটি সরকারি তথ্যচিত্র। পুরোটাই তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবনা।
প্রশ্ন: ছবির প্রসঙ্গে ফিরি। নতুনদের নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন? এই ছবিতেও এক ঝাঁক মঞ্চাভিনেতা...
রাজ: সেটা তো ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ ছবি থেকেই। ‘লে ছক্কা’, ‘কানামাছি’— কোনও ছবিতেই বাদ যায়নি। নতুনদের নিয়ে কাজের অনেক মজা, অনেক সুবিধা। কাজ করতে করতে ওদের থেকে অনেক কিছু শিখেছি। এই প্রজন্মের অনেক কিছু জানি না। ওদের দেখে সেগুলো রপ্ত করেছি। আবার নতুনদের না নিয়ে এলে ইন্ডাস্ট্রি যে ক্রমশ ছোট হয়ে আসবে! আমিই তো আর আগামী দিনে কাজ করতে পারব না।
প্রশ্ন: নিন্দকেরা যেমন বলে, টলিউড যেমন নির্দিষ্ট কিছু মুখে আটকে গিয়েছে...
রাজ: আপনিও তো সেই চেনামুখদেরই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ফোন করেন! (দম নিয়ে) সেটা নয়। টলিউড নির্দিষ্ট কিছু মুখে আটকে যায়নি। ছবি অনুযায়ী অভিনেতা বাছা হয়। নতুনদের সঙ্গে কাজ করতে অনেকে সাহস পান না। ভয় পান। সে ক্ষেত্রে নতুন কোনও অভিনেতা পরীক্ষায় পাশ করে এগিয়ে গেলে তাঁকে নিয়ে আরও পাঁচটা কাজ হয়।
প্রশ্ন: আপনার ছবি নতুন তারকার জন্ম দেবে?
রাজ: একটা নাম বলতে পারব না। অনেকগুলো নাম আছে। যেমন, ভাস্কর, অর্ক, অর্ণব, অভিকা, সায়ন্তন। আর দেবযানী। পার্থদার সঙ্গে নিয়মিত নাটক করেন। এঁরা প্রত্যেকে ভীষণ প্রতিভাধর।