দেবপ্রসাদের নতুন সংস্থা, কী বলছেন অনিন্দ্য, ইন্দ্রাশিস ও তথাগত? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
বাংলা ছবিমুক্তির দিনক্ষণ বা সূচি নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে নানা তরজার সাক্ষী টলিউড। বিষয়টি নিয়ে গুটিকয়েক প্রযোজনা সংস্থার মধ্যে চাপানউতোরের জেরে পরিস্থিতি তিক্ততার পর্যায়ে পৌঁছেছিল। পাশাপাশি ছিল দীর্ঘ দিন ধরে জিইয়ে থাকা ফেডারেশন বনাম পরিচালকদের তরজাও, যার রেশ এখনও পুরো কাটিয়ে উঠতে পারেনি টলিউড। এ সবের মধ্যেই প্রযোজক-পরিচালক হিসাবে নতুন সফর শুরু করলেন অভিনেতা দেবপ্রসাদ হালদার। প্রশ্ন উঠেছে, টলিউডের এই পরিস্থিতিতে নতুন প্রযোজনা সংস্থা খোলার যৌক্তিকতা কতখানি বাস্তবসম্মত? যেখানে এই হাতেগোনা কয়েকটি প্রযোজনা সংস্থার মধ্যে এত দ্বন্দ্ব, এত বিরোধ, সেখানে এই উদ্যোগ কতটা বিবেচক সিদ্ধান্ত? এ ব্যাপারে কী বলছেন ইন্ডাস্ট্রির কয়েকজন পরিচালক? দেবপ্রসাদের নিজেরই বা কী বক্তব্য তাঁর এই উদ্যোগের সিদ্ধান্ত নিয়ে?
পরিচালক ইন্দ্রাশিস আচার্যের কথাই ধরা যাক। তাঁর বেশ কয়েকটি সফল ছবি রয়েছে ঝুলিতে। কিন্তু তাও গত বছর কর্পোরেট চাকরিতে ফিরেছেন ইন্দ্রাশিস। আর্থিক দিক থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখতেই এই পদক্ষেপ করেছিলেন তিনি। এই প্রসঙ্গে ইন্দ্রাশিস বলেন, “উদ্দেশ্য সৎ হলে যে কোনও উদ্যোগই আমার ইতিবাচক বলেই মনে হয়। এই সময়ে দাঁড়িয়ে নিজেরা নিজেদের মতো কাজ করতে পারাটা খুব দরকার। নতুনদের জন্য এই ধরনের উদ্যোগ বেশ কিছু সুযোগ করে দেয়, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আসলে কালের নিয়মে ভাল কাজটাই থেকে যায়। খারাপ কাজ মানুষ মনে রাখে না।”
ইন্দ্রাশিস মানেন, সময়টা খুব ভাল নয়। তাই তিনি বলেছেন, “সময় যে খুব ভাল, তা মোটেই নয়। সব ভাল কাজই যে ভাল ভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে, তা নয়। খারাপ কাজও গ্রহণ করা হচ্ছে।” ভাল কাজ করার জায়গা আদৌ রয়েছে? ‘গুডবাই মাউন্টেন’ ছবির পরিচালকের স্পষ্ট মত, “জায়গা তৈরি করা শক্ত। তবে খুব নিষ্ঠা থাকলে সম্ভব। আমার তো ছবির জগতের সঙ্গে কোনও যোগই ছিল না। একটা রোজের চাকরি করেও ছ’টা ছবি তৈরি করেছি। ভাল কাজ হলে এক দিন ঠিক গ্রহণযোগ্যতা মিলবে।”
প্রায় একই সুর দেবপ্রসাদের গলায়। তিনি ঝুঁকি নিতে আগ্রহী, সমস্যার মুখোমুখি হতেও রাজি। ‘বিলু রাক্ষস’, ‘বাইশে শ্রাবণ’, ‘হেমলক সোসাইটি’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘ঈগলের চোখ’-সহ বহু ছবিতে অভিনয় করে বাংলা বিনোদনজগতের অতিপরিচিত মুখ দেবপ্রসাদ। অমিতাভ ধরের সঙ্গে তিনি এই প্রযোজনা সংস্থা খুললেন। কতটা আত্মবিশ্বাসী? উত্তরে দেবপ্রসাদ বলেন, “ব্যবসা সব সময়ই ঝুঁকিবহুল। আমার সিনেমাঅন্ত প্রাণ! আমি গত ১৫ বছরে অভিনয় করতে করতে ছবি ছাড়া আর কিছু ভাবতেই পারি না। তাই ব্যবসা করলে ছবি নিয়েই করব, সেটাই ভাবনায় ছিল। আর আমি সব দিক বিবেচনা করে এই ব্যবসায় এগোতে চাই। তাতেও হয়তো সমস্যা হবে। কিন্তু সেটার মুখোমুখি হব।”
পরিচালক অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ও দেবপ্রসাদদের প্রযোজনা সংস্থার সূচনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি নতুন এই উদ্যোগ নিয়ে বলেন, “সমস্যা থাকবেই। কবে ছিল না? আজ হয়তো যেটাকে সমস্যা বলে মনে হচ্ছে, পরে তা মনে হবে না। কিন্তু সমস্যার জন্য কাজ হবে না, তা তো হতে পারে না! তা হলে তো একটা ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ হয়ে যাবে। রাজনৈতিক সমস্যার জন্য হয়তো ওঠানামা লেগে থাকবে। কিন্তু বিনোদনজগৎ এগিয়ে যাবে। কাজ তো চলতেই থাকবে।”
কথা প্রসঙ্গে দেবপ্রসাদ জানান, তাঁর প্রযোজনা সংস্থা ‘দ্য হাউস অফ ভিশন’ অন্য ধরনের ছবি করতে চায়। এমন ছবি, যেগুলি বিদেশে পাঠাতে পারবেন তাঁরা। তাঁর কথায়, “একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি বানিয়েছি আমরা। এর দর্শক ‘মাস’ নয়। নির্দিষ্ট দর্শকের কাছেই আমরা ছবিটি পৌঁছে দিতে চাই। আর এই ছবির প্রচার ও বিপণন কী ভাবে করতে হয়, তা আমি জানি। আর আমি মনে করি, সব ছবিই দিনের শেষে বাণিজ্যিক। সেই বাজার কী ভাবে ধরতে হবে সেটা জানতে হবে আসলে।”
অভিনেতা তথা পরিচালক তথাগত মুখোপাধ্যায়ও নতুন এই প্রযোজনা সংস্থা নিয়ে ইতিবাচক। তাঁর কথায়, “নতুন কাজের জায়গা তৈরি হয়েছে। এই ভাবেই ভাবতে চাই। দেবপ্রসাদ নানা ধরনের ছবিতে অভিনয় করেছেন, তাই উনি সবটা বুঝেই করবেন। সিস্টেম তো থাকবেই। ছবি বানানোর পথে সেই সিস্টেম বাধা হয়ে না দাঁড়ানো পর্যন্ত তো কোনও অসুবিধা নেই। আমার পরিচালনার সময়ে খেয়াল রেখেছি, প্রযোজককে ডোবানো যাবে না এবং চিত্রনাট্যেও আপস করা যাবে না। দুটো দিকে সমতা বজায় রাখতে হবে। ফেডারেশন ও পরিচালকেরা হাত ধরাধরি কাজ করলেই মঙ্গল।”
প্রাথমিক ভাবে বেশ কিছু ওটিটি-র কাজ নিয়ে এগোতে চায় এই প্রযোজনা সংস্থা। ভবিষ্যতে তাদের কাজে দেখা যেতে পারে ঋষভ বসুকেও। তিনি ইতিমধ্যেই নানা মাপের প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে কাজ করেছেন। ঋষভের কথায়, “নতুনেরা আরও কাজ পাবেন এবং অন্য ধরনের বেশ কিছু কাজ হবে বলে আমার বিশ্বাস। আসলে বাঙালি দর্শক একই ধরনের প্যালেট দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন। এই প্রযোজনা সংস্থাগুলি যখন অন্য ধারার কাজ করবে, তখন স্বাদও বদল হবে তাঁদের।”