সত্যিই কি স্ক্রিনিং কমিটির ভবিষ্যৎ বিশ বাঁও জলে? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
২০২৫-এর ১৫ অগস্ট। প্রেক্ষাগৃহ দখল করতে ময়দানে তিনটি বড় বাজেটের হিন্দি ছবি— ‘দিল্লি ফাইলস’, ‘ওয়ার ২’, ‘কুলি’। একই সময়ে বড়পর্দায় আছড়ে পড়বে বাংলা ছবি ‘ধূমকেতু’ও, যে ছবি নিয়ে বাংলা ও বাঙালির ১০ বছরের প্রতীক্ষা!
কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের এই ছবি দিয়ে ১০ বছর পরে বড়পর্দায় আবার দেব-শুভশ্রী। জুটির ম্যাজিক যাতে হিন্দি ছবির দাপটে ম্লান না হয়ে যায়, তার জন্য আসরে নেমেছিলেন ছবির সাংসদ-অভিনেতা। দেব সে দিন পাশে পেয়েছিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, শ্রীকান্ত মোহতা, নিসপাল সিংহ রানে, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নবীন চৌখানি, শতদীপ সাহা, স্বরূপ বিশ্বাসের মতো তাবড় টলিউড ব্যক্তিত্বকে। অভিনেতা-প্রযোজক-হলমালিক-পরিবেশক সে সময়ে এককাট্টা। নিজের রাজ্যে, নিজের শহরে হিন্দি ছবির দাপটে বাংলা ছবিকে কোণঠাসা হতে দেওয়া যাবে না, প্রতিজ্ঞা ছিল প্রত্যেকের।
কারণ, এত দিন বড় বাজেটের হিন্দি ছবি মানেই প্রাইম টাইম তাদের দখলে। বাংলা ছবি যেন ‘নিজভূমে পরবাসী’!
বাংলা ছবির স্বার্থরক্ষার্থে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে টলিউড তারকাদের স্বাক্ষর সংবলিত একটি চিঠি পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল সেই সময়ে। বস্তুত দেবের অনুরোধে, মুখ্যমন্ত্রী একটি ‘স্ক্রিনিং কমিটি’ গড়ে দিয়েছিলেন মন্ত্রী স্বরূপ বিশ্বাসের নেতৃত্বে। কমিটির সভাপতি পিয়া সেনগুপ্ত। কমিটির কাজ, বাংলা ছবিকে প্রাইম ডেটে প্রাইম টাইম শো দেওয়া। পাশাপাশি, উৎসবের দিনে বাংলা ছবির মুক্তির সংখ্যা নির্দিষ্ট করা।
টলিউডের অন্দরে গুঞ্জন, কয়েক মাস যেতে না যেতেই মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে তৈরি হওয়া সেই স্ক্রিনিং কমিটির ভবিষ্যৎ নাকি অনিশ্চিত!
কেন এমন রটনা? শোনা যাচ্ছে, কমিটিকে ঘিরে অসন্তোষের মেঘ ঘনীভূত। ইতিমধ্যেই কমিটি বন্ধ করে দেওয়ারও নাকি অনুরোধ গিয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে। যদিও মুখ্যমন্ত্রী সেই অনুরোধ রাখবেন কি না, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ টলিউডের অন্দরেই।
আরও আছে। বছরের শেষে কমিটির আস্থা ভোটে নিরপেক্ষ অবস্থান স্বয়ং দেবের। এ কথা দেব আনন্দবাজার ডট কম-কেও বলেছেন। একান্ত সাক্ষাৎকারে তাঁর বক্তব্য, “আমি কিছু বিষয়ে সহমত, কিছু বিষয়ে নয়। দেখুন, একটা কমিটি তৈরি হওয়া মানে আরও গুছিয়ে কাজ হবে। এখন তো দেখছি, কমিটি হওয়ার পর থেকে ঝগড়াই বেশি হচ্ছে! এর আগে আমার সঙ্গে তো শ্রীকান্ত মোহতা, নিসপাল সিংহ রানে, রানা সরকারের এত ঝগড়া হত না! এটা কাম্য নয়। এটা কেন হবে? আরও একটা কথা, দেব কিন্তু ভোট দিয়েছে। আমি নোটায় ভোট দিয়েছি। একবারও বলিনি, কমিটিকে সমর্থন করছি না। আমি নিরপেক্ষ সদস্য। হ্যাঁ-না— কিছুতেই নেই।”
দেবের আরও বক্তব্য, “এখন আমরা খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। সবাই একটু যেন বদলে গিয়েছেন। সেই সঙ্গে আবার একই কথা বলব, কমিটি তৈরির আগে কিন্তু এত সমস্যা হত না। ঝগড়া হত, মিটেও যেত। এখন সেটা হচ্ছে না। তার মানে কমিটির কাজের মধ্যে কোথাও ফাঁক থেকে যাচ্ছে। আর একটা ব্যাপার, কেউ কিন্তু সরাসরি ডেকে কিচ্ছু বলছেন না। অথচ কথা ছড়াচ্ছে। এটাই বেশি খারাপ লাগছে। এই জন্যই আমি চুপ। কাউকে কিচ্ছু বলছি না। জানি, সব ঠিক হয়ে যাবে।” পাশাপাশি তাঁর আশ্বাস, “নতুন কমিটি হলে পরস্পরকে চিনতে, জানতে একটু সময় লাগে। এটাও হয়ে যাবে। আমাদের বন্ধুবান্ধবের ব্যাপার। আজ অসন্তোষ, কালকেই মিটমাট। সব ঠিক হয়ে যাবে। সবাই একসঙ্গে কাজ করব আবার।”
টলিউডের অন্দরমহল কিন্তু অন্য কথা বলছে। বাংলা ছবির প্রাইম টাইম শো, উৎসবের দিনে ছবির সংখ্যা নির্দিষ্ট করার পাশাপাশি আরও কিছু দিক দেখার অনুরোধ এসেছে স্ক্রিনিং কমিটির কাছে। যেমন, বাংলা ছবির ভুয়ো বাণিজ্যিক পরিসংখ্যান পরিবেশিত হচ্ছে। সঠিক পরিসংখ্যান জানানোর অনুরোধ এসেছে কমিটির কাছে। এ ছাড়াও, সমাজমাধ্যমে টলিউডের খ্যাতনামীদের কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ, প্রযুক্তির সাহায্যে অন্য ছবির রেটিং কমিয়ে নিজের ছবির রেটিং বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করার আর্জিও জানানো হয়েছে।
বছরের শুরুতেই উপরের অভিযোগগুলি লিখিত আকারে লালবাজারে জমা দিয়েছেন টলিউডের খ্যাতনামীরা। প্রশাসনিক সহায়তাও চাওয়া হয়েছে। খবর, নাম না করে যাবতীয় অভিযোগের তির এক তারকা অভিনেতা-প্রযোজকের দিকেই!
টলিউডের অন্দরে তাই ফিসফাস, সেই কারণেই কি বাংলা ছবির স্বার্থরক্ষার্থে একদা তৈরি হওয়া ‘স্ক্রিনিং কমিটি’র ভবিষ্যৎ অস্তাচলে?