‘বৃন্দস্বর’-এর ‘উচ্ছ্বাস’। ছবি: সংগৃহীত।
বেঠোফেন, মোৎজ়ার্ট প্রমুখের সিম্ফনির সঙ্গে পরিচিত সঙ্গীতপ্রেমীরা। বহুস্তরীয় ভাবে তৈরি হারমোনি দিয়ে রচিত হয় বিশেষ কম্পোজ়িশন। বিশ্ব সঙ্গীত দিবসে নিজের মতো করে অন্য রকম কাজ করে থাকেন সঙ্গীতশিল্পীরা। শ্রোতাদের জন্য সুরে সুরেই সাজিয়ে দেন উপহারের ডালি। এ বারেও তার অন্যথা হয়নি। বেশ কিছুদিন পর অন্যধারার একটি কাজ করেছেন বিশিষ্ট সুরকার গৌতম ঘোষাল। তাঁর সৃষ্টিতে এল ‘বৃন্দস্বর’। দর্শককে অন্য ধারার কাজ উপহার দেওয়ার প্রয়াস থেকেই ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গী করে বানিয়ে ফেলেছেন ‘উচ্ছ্বাস’।
আনন্দবাজার ডট কম-এর তরফ থেকে এই ভাবনার কথা জানতে চাওয়া হলে, সুরকার গৌতম ঘোষাল বলেন, ‘‘ছোটবেলা থেকেই আমি গান তৈরি করি। যখন পেশাগত ভাবে গান তৈরি করা শুরু করলাম, তখন জ্যাজ়, ব্লুজ়, রক, মেটাল, এ সব ধরনের গানের সঙ্গে আমার পরিচয় হল। এর পর আমার গানের অ্যাকাডেমি ‘মেঘপাখি’ যখন তৈরি হল, তখন তার বার্ষিক অনুষ্ঠানের জন্য ধীরে ধীরে এই ধরনের ‘কম্পোজ়িশন’ তৈরি করা শুরু করলাম। কখনও এই কম্পোজ়িশন শুনে মনে হবে অনেক পাখি আকাশে উড়ে যাচ্ছে, আবার কখনও ভেসে আসবে দুরপাল্লার ট্রেন সফরের আওয়াজ। সেই শব্দ তৈরি করতে করতেই রেকর্ড করার ভাবনা মাথায় আসে। ‘সিম্ফনি’-র আদলে ভারতীয় শাস্ত্রীয়সঙ্গীত এবং তার গায়কি মেনে ‘বৃন্দস্বর’ তৈরি করেছি। ‘সিম্ফনি’ বলতে গেলে যে ব্যাকরণ মানতে হয়, সেটা সব ক্ষেত্রে মেনে করিনি। তাই নামকরণ ‘বৃন্দস্বর’। সকলকে শ্রদ্ধা জানিয়েই বলছি, এই ধরনের কাজ খুব একটা চোখে পড়েনি আমার। তাই তৈরি করলাম, যাতে এটি সংরক্ষণও করা যায়।’’
গৌতম ঘোষালের নতুন সৃষ্টি। ছবি: সংগৃহীত
এর আগে বাংলায় জয়ন্ত বসু একসময় তৈরি করেছিলেন ‘ভোকাল সিম্ফনি’। আর এ বার নতুন করে শ্রোতাদের জন্য গৌতম ঘোষাল নিয়ে এলেন ‘বৃন্দস্বর’। এই ‘বৃন্দস্বর’-এ বিভিন্ন কম্পোজ়িশন তৈরি করেছেন তিনি। সঙ্গীতশিল্পী বলেন, ‘‘বেঠোফেন, মোৎজ়ার্ট-এর স্টাইল থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েই এই কম্পোজিশনগুলো তৈরি করেছি। নাম দিয়েছি ‘উচ্ছ্বাস’, ‘প্রেম’, ‘বিষাদ’, ‘পাখি’। এই কম্পোজিশনে কোনও ভাষা নেই, বাণী নেই, তবে উচ্চারণ আছে। সেই উচ্চারণ থেকেই তৈরি হয়েছে উনিশ জনের মিলিত স্বর, যার নাম ‘উচ্ছ্বাস’, যার অর্থ পরম আনন্দ।’’
ছাত্রছাত্রীরাও আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে; গৌতম ঘোষাল ছবি: সংগৃহীত
এই সঙ্গীতায়োজন করেছেন শিল্পী পার্থ পাল। রেকর্ড করেছেন সঞ্জয় ঘোষ। সঙ্গীতশিল্পী গৌরব সরকারের পরিচালনায় সমুদ্রের ধারে তৈরি হয়েছে একটি মিউজ়িক ভিডিয়োও। সঙ্গীত নিয়ে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা হয়ে থাকে। এই স্বর শুনতে বাংলার শ্রোতা কতটা তৈরি? সঙ্গীত পরিচালকের মতে, ‘‘কতটা তৈরি শ্রোতারা, সেটা একটা প্রশ্ন তো বটেই। এই কাজটা হয়তো সমস্ত শ্রোতার জন্য নয়। যাঁরা সুরের গভীরে পৌঁছোতে পারেন বা চান, তাঁদের জন্যই এই কাজ। শুনতে সকলেরই ভাল লাগবে। কিন্তু সুরসাধক বা সুররসিক যাঁরা, তাঁরাই এর কদর করবেন বলে মনে হয়। আমাদের টার্গেট অডিয়েন্স সকলেই।’’
ভাইরাল কনটেন্ট তৈরির যুগে এই কাজ ইতিহাসে থাকবে, মনে করেন শিল্পী। বেঠোফেন, মোৎজ়ার্ট তাঁর পথপ্রদর্শক হলেও, সলিল চৌধুরী, আরডি বর্মনের থেকেও অনুপ্রাণিত হয়ে ‘সিম্ফনি’ তৈরি করেছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘বিশেষ করে আমার ছাত্রছাত্রীরাও আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে। তাই নিজের তাগিদেই কোনও অর্থসাহায্য ছাড়াই এই কাজ করেছি।’’ সুরকার যোগ করেন, ‘‘একেবারে নিজের মনের তাগিদ অনুভব করেই কাজটা করা। প্রায় এক বছরের মহড়া, ছাত্রছাত্রীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল এই ‘উচ্ছ্বাস’। ঠিক যেমন গাছ লাগানোর সময় আমরা ভাবি, গাছটা বড় হবে, ছায়া দেবে, খানিক সেরকমই ভাবনা ছিল। আজ থেকে কুড়ি বছর পরেও যদি কেউ এই কাজ শোনেন, সেটাই সার্থকতা। শুধু থেকে যাক, আর আমি কাজ করে যাই, এইটুকুই।’’