সীমান্তে খোলা হাওয়ার আশায় শঙ্খচিল

সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের মুখে হাসি ফুটবে কি না, বলা যাচ্ছে না এখনই। তবে আশা জাগাচ্ছে একটি বাংলা ছবি। ভারত-বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনা গৌতম ঘোষের ‘শঙ্খচিল’ দেখে ঢাকার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলছেন, ‘‘নাঃ, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভিসার বিধিনিষেধ এ বার তুলেই দেওয়া উচিত।

Advertisement

ঋজু বসু

শেষ আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০১৬ ০৩:৪২
Share:

সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের মুখে হাসি ফুটবে কি না, বলা যাচ্ছে না এখনই। তবে আশা জাগাচ্ছে একটি বাংলা ছবি। ভারত-বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনা গৌতম ঘোষের ‘শঙ্খচিল’ দেখে ঢাকার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলছেন, ‘‘নাঃ, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভিসার বিধিনিষেধ এ বার তুলেই দেওয়া উচিত। তাতে দু’দেশেই সীমান্ত এলাকার মানুষের জীবন ঢের মসৃণ হবে।’’ বিএসএফ-এর প্রাক্তন স্পেশাল ডিজি, সদ্য অবসরপ্রাপ্ত বংশীধর শর্মা ঠিক ততটা বলছেন না। তবে তাঁরও মত, ‘‘দু’দেশের সীমান্তটাকে আমাদের অন্য চোখে দেখা উচিত। ওই তল্লাটে মানুষের সমস্যা নিয়ে আরও মানবিক হওয়ার দরকার রয়েছে।’’

Advertisement

অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে বেআইনি ভাবে ‘ইন্ডিয়া’ অনুপ্রবেশের গল্প বলছে ‘শঙ্খচিল’। মেয়ের জটিল হার্টের রোগ ধরা পড়ার পরে বিপন্ন মা-বাবা ভাবছেন, কোথায় যাবেন! সাতক্ষীরা বা খুলনায় চিকিৎসা পরিকাঠামোয় খামতি
রয়েছে। আর ঢাকা তো বহু দূর! তার থেকে টাকি বা কলকাতা ঢের কাছে। ঠেকায় পড়ে নদীপথে এ দেশে ঢুকে জাল ভারতীয় পরিচয়পত্র জোগাড় করছে সেই পরিবার। মেয়ের চিকিৎসা করাতে আর কীই বা উপায় তাঁদের!

বাংলাদেশ থেকে আসা রোগীদের মধ্যে সুপরিচিত, কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালের মুখপাত্র বলছিলেন, ‘‘এমন ঘটনা নেহাতই সিনেমার গল্প নয়। বাংলাদেশের রোগীরা কখনও সখনও সত্যিই নাম-পরিচয় ভাঁড়িয়েও এ পারে আসতে বাধ্য হন।’’ রোগী সেরে উঠলেন, তাঁকে নিয়ে পরিজনেরা ফের চোরাপথেই দেশে ফিরে গেলেন তো ঠিক আছে! অন্যথা হলেই গেরো। বিপন্ন মানুষগুলোই তখন ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত হন। ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে চিহ্নিত, কয়েক হাজার বাংলাদেশি নাগরিক এখনও এ রাজ্যে জেল-বন্দি। শঙ্খচিল-এর পরিচালকের দাবি, ‘‘সীমান্ত পারের মানুষের কিছু বাস্তব ঘটনাই ছবিটির প্রেরণা!’’ তাঁর আশা, ‘‘মানুষের স্বচ্ছন্দ জীবনযাত্রার স্বার্থেই নেপাল বা ভুটানের মতো বাংলাদেশের সঙ্গেও এক দিন ভিসাবিহীন যাতায়াতের দরজা খুলবে।’’

Advertisement

হাসিনা সরকারের আমলে ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক অনেকটাই ঘনিষ্ঠ হয়েছে। সন্ত্রাস ও অপরাধ দমনে দু’দেশের মধ্যে সমন্বয়ও বেড়েছে। তবু বাংলাদেশে সামরিক অভ্যুত্থানের ইতিহাস বা জঙ্গি মৌলবাদের প্রভাব নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে এ দেশে। দিল্লির স্বরাষ্ট্র ও বিদেশ দফতরের কোনও কোনও কর্তা তাই ভিসা তুলে দেওয়ার পক্ষপাতী নন। তাঁদের মতে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তকে করিডর হিসেবে ব্যবহার করতে অপরাধী বা জঙ্গিদের একটা বড় অংশ সক্রিয়। ভিসা
ছাড়া তাদের ঢুকে পড়াটা সহজ হবে।

কিন্তু এই দুষ্কৃতীদের বাইরে বিপুল সংখ্যক মানুষ জীবনের নানা তাগিদে সীমান্ত পার হতে বাধ্য হন। পাহারাদারির কড়াকড়িতে টাল খায় তাঁদের জীবনের ছন্দ। জনৈক বিএসএফ-কর্তার মতে, ‘‘ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নিশ্ছিদ্র রক্ষণাবেক্ষণ কার্যত অসম্ভব।’’ বিস্তীর্ণ ৪০৯৬ কিলোমিটার জুড়ে একটি রেখা ধরে যেন খড়ির দাগ টানা হয়েছে। এর সিকি ভাগ নদীর মাঝখান দিয়ে গিয়েছে। কোথাও বা লোকের বাড়ির উঠোন, রান্নাঘর, গোয়ালঘরের মাঝখান দিয়ে দেশ ভাগ হয়ে গিয়েছে। বসিরহাটের পানিতর সীমান্তে দক্ষিণপাড়া যেমন। মুর্শিদাবাদের জলঙ্গি থেকে রানিনগর পর্যন্ত সীমান্তও কাঁটাতারবিহীন। রানিনগরের কাছে এ দেশের কুপিলা গ্রামের বাসিন্দা এক যুবককেই কিছু দিন আগে ঝুঁকি নিয়ে রাজশাহী যেতে হয়েছিল। বললেন, ‘‘আমার দাদা রাজশাহীতেই থাকতেন। তাঁর হঠাৎ মৃত্যুতে গার্ডদের ম্যানেজ করে ও-পারে ঢুকি।’’ ওই তল্লাটে উল্টো দিক থেকে কলকাতায় ডাক্তারি চেক-আপের জন্য অনুপ্রবেশও জল-ভাত। সীমান্ত এলাকায় দু’পারের বাসিন্দারা উৎসবে, মেলায় লুকিয়ে-চুরিয়ে পারাপার করেন। বিয়ে-শাদিও হয়। পাহারাদারি, রাজনীতি, কূটনীতির বাইরে সেই আত্মীয়তা থেকেও যায়।

‘‘একজন-দু’জন নয়। সীমান্তের দু’পারে জীবনের টানাপড়েনের শিকার বহু মানুষই মিশে রয়েছে এ ছবির মধ্যে,’’ বললেন, শঙ্খচিল-এর প্রধান অভিনেতা প্রসেনজিৎ। ছবিতে টাকির হাসপাতালে ভর্তি বাংলাদেশি বালিকাকে দেখে চুপচাপ চকোলেট রেখে আসেন বিএসএফের এক অফিসার। বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড অফিসারের মন্তব্য, ‘‘এমন তো হবেই! দু’দেশের রক্ষীরা মেরে-কেটে ৬৮ বছর ধরে পাহারাদারি চালাচ্ছে। তার আগে তো বছরের পর বছর ধরে এ ভাবেই যাতায়াত করত মানুষ।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement