মুখোমুখি নাট্যদলের ৩০তম নাট্যোৎসবের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। নিজস্ব চিত্র।
কেন্দ্রীয় সরকার অনুদান বন্ধ করে দিয়েছে। অভিযোগ, আরজি কর-কাণ্ডের প্রতিবাদ করায় রাজ্য সরকারের মঞ্চে তারা ‘নিষিদ্ধ’! এ সব লড়াই সঙ্গী করেই ‘মুখোমুখি’ নাট্যদলের ৩০তম নাট্যোৎসব শুরু হচ্ছে ১৩ মে থেকে। চলবে ১৭ মে পর্যন্ত। নাট্যদলের পক্ষ থেকে বিলু দত্ত জানালেন, তাঁদের এ বছরের উৎসব সদ্যপ্রয়াত অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মরণে। দলের অন্যতম কর্ণধার পৌলমী বসুর আফসোস, “রাহুলের মতো নাটকপাগলের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে!”
দিন এগিয়েছে। সময় বদলেছে। যুগ পাল্টে গিয়েছে। বদলেছে মানুষের মানসিকতা, বিনোদনদুনিয়ার হালচাল। নাটক যেন ‘ব্রাত্য’। বলা যেতে পারে, সিনেমা-সিরিজ়-সিরিয়ালের দাপটে কিছুটা যেন কোণঠাসাও। গত ৩০ বছর ফিরে দেখতে গিয়ে উপলব্ধি ‘মুখোমুখি’ নাট্যদলের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের। বিলু দত্তের দাবি, “কোনও সরকারি অনুদান না থাকায় নাটক মঞ্চস্থ করতে, অভিনেতাদের ন্যূনতম পারিশ্রমিক দিতে খুবই সমস্যা হয়। তার পরেও আমাদের উৎসাহ রাহুল অরুণোদয়ের মতো কিছু মানুষ। এঁরা পাগলের মতো ভালবেসেছেন মঞ্চকে। পর্দায় অভিনয়ের পাশাপাশি নাটক করেছেন। নাটক সংক্রান্ত যে কোনও সমস্যায় নিজেদের মতো করে সমর্থন জানানোর চেষ্টা করেছেন।” তাই তিনি পাঁচ দিনের উৎসব নিবেদন করেছেন রাহুলকে। উৎসবে মঞ্চস্থ হবে রাহুলের লেখা নাটক ‘যে জানলাগুলোর আকাশ ছিল’।
উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সম্মাননা জানানো হবে বিভিন্ন ক্ষেত্রের কৃতীকে। তালিকায় অরুণ মুখোপাধ্যায়, দেবশঙ্কর হালদার যেমন আছেন, তেমনই আছেন তনুশ্রীশঙ্কর, গৌতম ঘোষ, লিলি চক্রবর্তী, শ্রীকান্ত আচার্য, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। এ খবর জানালেন অন্যতম নাট্যব্যক্তিত্ব সৌমিত্র মিত্র। তিনি আরও জানালেন, প্রত্যেক দিন দুটো করে নাটক মঞ্চস্থ হবে। থাকছে ‘মুখোমুখি’র নতুন প্রযোজনা ‘প্রতারণা’। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা এই নাটক মঞ্চস্থ করবেন পদ্মনাভ দাশগুপ্ত, সুদীপ মুখোপাধ্যায়। পরিচালনায় পৌলমী বসু। এই প্রসঙ্গে নাট্য পরিচালকের সংযোজন, “আমরা যুগে যুগে প্রতারণার শিকার। সেই গল্পই উঠে আসবে এখানে।”
এ ছাড়াও, নাট্যতালিকায় থাকছে ‘প্রথম পার্থ’, ‘ব্রিটিশ বাবু’, ‘ফেরারি ফৌজ’, ‘আ-শক্তি’, ‘মারীচ সংবাদ’, ‘টিনের তলোয়ার’, ‘বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’। অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস পাঁচ দিন ধরে সাক্ষী থাকবে দেবশঙ্কর হালদার, সেঁজুতি মুখোপাধ্যায়, শুভাশিস মুখোপাধ্যায়, শঙ্কর চক্রবর্তী, রজতাভ দত্ত, সুজন মুখোপাধ্যায়, পার্থ ভৌমিক, অর্ণ মুখোপাধ্যায়, আনন্দরূপা চক্রবর্তী, সুপ্রিয় দত্ত, সৌমিত্র মিত্র, পৌলমী বসুর অভিনয়ের। দুটো নাটকের ফাঁকে থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রকাশিত হবে নাটকের বই ‘জল দাও শিকড়ে’। বিলু দত্তের সংকলনে এই বই নাট্য ব্যক্তিত্বদের লেখনীতে সমৃদ্ধ।
উৎসবে বিশিষ্টজনেদের সম্মাননা এবং বইপ্রকাশ অনুষ্ঠিত হবে। নিজস্ব চিত্র।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা পৌলমী আক্ষেপ করেছেন, “সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এই নাট্যদলের প্রতিষ্ঠাতা। অবশ্যই তিনি যখন ছিলেন, আমাদের অনেক সমস্যার সমাধান সহজেই হয়েছে। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরেও আমরা অনেক মঞ্চসফল নাটক উপহার দিয়েছি। এত কিছুর পরে আজও আমি শুধুই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে! আমার আলাদা পরিচয় গড়ে তুলতে পারলাম না!”
নাট্যজগতের এত সমস্যা, এত লড়াইয়ের মূল্য কি এই প্রজন্ম দিচ্ছে?
প্রশ্নের জবাবে সৌমিত্র-কন্যার যুক্তি, “এত দুঃখের মধ্যেও আশার আলো, এই প্রজন্ম নাটক করতে ভালবাসে। দেখতে ভালবাসে। ওদের ভালবাসাতেই হয়তো নাট্যদুনিয়া বিলুপ্ত হয়নি। আমরাই বরং গ্রান্টের অভাবে ওদের পাশে সে ভাবে দাঁড়াতে পারি না।”