জীবনের নানা পর্যায়ে রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম
সাতসকালে কলটাইম। স্টুডিয়োয় পৌঁছোল রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাড়ি। ছিমছাম পোশাক, চোখে রোদচশমা। এসেই মেকআপ রুমে রেডি হতে দৌড়োলেন। প্রতিযোগীরাও যে তারকা। ‘দিদি নম্বর ১’-এর ৯ নম্বর সিজ়নের দেড় হাজারতম এপিসোডের শুটিং। তারকা স্পেশ্যাল এপিসোড। রঙিন শাড়ি আর মেকআপ করে মাত্র আধঘণ্টারও কম সময়ে রেডি ‘দিদি নম্বর ১’! সেটে পৌঁছোলেন সবার আগে। হাতে কড়া কালো কফি। স্পেশ্যাল এপিসোডের পর্ব বুঝে নিয়েই ‘স্বমহিমায়’ তিনি, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়। কথার ফাঁকে হো হো করে হেসে ওঠা। মাঝে ফ্লোর ডিরেক্টরকে হাঁক, ‘কী রে! সব রেডি তো?’ একঝাঁক তারকা নিয়ে শুরু হল শুটিং। লাঞ্চ ব্রেকের সময় শেষ হওয়ার আগেই ফের ফ্লোরে দিদি। শুটিং শুরু হওয়ার আগে কথা বললেন আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে।
প্রশ্ন: রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় আর ‘দিদি নম্বর ১’ এখন সমার্থক শব্দের মতোই। নবম সিজ়নের দেড় হাজার পর্বে দাঁড়িয়ে আজ, কতটা নস্টালজিক লাগছে?
রচনা: প্রচুর অভিজ্ঞতা, প্রচুর ভালবাসার মুহূর্ত, নিজেকে মানুষ হিসাবে চিনতে পেরেছি, নিজের মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আমি যেমন মানুষকে আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, মানুষও আমাকে তারও দ্বিগুণ ফিরিয়ে দিয়েছে। ‘দিদি নম্বর ১’ আমার কাছে সারাজীবনের মাইলস্টোন হয়ে থাকবে।
প্রশ্ন: আজ ফিরে তাকালে কী মনে হয়, অভিজ্ঞতার ঘড়া তো পূর্ণ?
রচনা: নানা রঙের জীবন জানতে পারি। অনেকের কথা শুনে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়েছে, আবার হা হা করে হেসে উঠেছি। কত স্মৃতি, কত অভিজ্ঞতার ভান্ডার। যখন ফিরে তাকাই মনে হয়, আগের রচনা এবং আজকের রচনার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। তাঁদের কথা শুনে মনে হয়, আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। নিজের কোনও কষ্টের কথা মনে পড়ে না। কী পাইনি, কী আমার চাওয়া-পাওয়া সব ভুলে যাই। সবারই জীবনে তো ওঠা-পড়া আছে, না-পাওয়া আছে। অনেকেরই মনের দুঃখকষ্ট আছে। তাঁরা সবটা ভুলে ‘দিদি নম্বর ১’-এ আসেন, নিজেদের অনুপ্রেরণায় এগিয়ে যান।
প্রশ্ন: সবার ‘দিদি’ হয়ে এত বছর থাকা তো চ্যালেঞ্জিং?
রচনা: আট থেকে আশি, সকলেরই দিদি আমি। দিদি বলেই ডাকেন সবাই। বাচ্চা থেকে বয়স্ক মানুষ, সবাই ‘দিদি’ বলেই ডেকে ওঠেন। রচনা নামটাই এখন ভুলে গিয়েছি। ‘দিদি দিদি’ শুনে শুনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। আমি চিরকৃতজ্ঞ সব স্তরের মানুষের কাছে। বাচ্চারাও আসে ফুল দেয়, এই অনুভূতিটাই আলাদা।
প্রশ্ন: ছেলে ‘দিদি নম্বর ১’ দেখে?
রচনা: ছেলে খুব একটা দেখে না। বলা ভাল দেখা হয়ে ওঠে না। কিন্তু হ্যাঁ, ও তো জানে। ও বড়ই তো হল ‘দিদি নম্বর ১’-এর সঙ্গেই। ওর বয়স এখন ১৮, আর আমি করছি প্রায় ১৪ বছর। ও এখন বুঝেই গিয়েছে মাকে পাওয়া যাবে না, মা শুটিংয়েই আছে।
প্রশ্ন: ছবি বা নন ফিকশনের মধ্যে বাছতে হলে কোনটা বাছবেন?
রচনা: পরিচয় বলতে গেলে প্রথমত, আমি একজন অভিনেত্রী। ছবিতে অভিনয় করতাম বলেই এখানে আসা। তার জন্যই আমাকে বেছেছে। সেটা আমার সত্তা, সেটা আমার পরিচয়। কিন্তু এক জন মানুষ হিসাবে আমি যে জায়গাটা অর্জন করেছি, সেটা শুধু ‘দিদি নম্বর ১’-এর জন্য।
প্রশ্ন: অনুষ্ঠান কখনও একঘেয়ে লাগেনি?
রচনা: কখনও কখনও যে ‘বোরডম’ আসেনি, সেটা বললে মিথ্যা কথা বলা হবে। মানুষ হিসেবে তো একঘেয়ে লাগতে পারেই। এক এক সময় মনে হয়, ঘুম থেকে উঠে আসতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু এই যে এক বার সেটে ঢুকে যাই, প্রতিযোগীদের দেখি, ব্যস! একেবারে ভিটামিনের মত চার্জ্ড হয়ে যাই। এখনও পর্যন্ত তাই ‘দিদি নম্বর ১’ করব না, এটা মনে হয়নি।
প্রশ্ন: একঘেয়ে লাগলে কী করেন?
রচনা: ঘুরতে যেতে খুব ভালবাসি। প্ল্যান করে ঘুরতে যাই। ওটা আমার বিশাল বড় প্যাশনের জায়গা। বছরে তিন-চার বার ঘুরতে যাই। ওটা আমার ভিটামিন। ওটাই আমায় জাগিয়ে তোলে। আমার এনার্জি বুস্টার।
প্রশ্ন: ছেলেও সঙ্গে যায়?
রচনা: দেখো, ছেলে এখন বড় হয়ে গিয়েছে। ছেলে এখন আমার সঙ্গে থাকে না। সে মুম্বইয়ে থাকে। ওখানে কলেজে পড়ছে। ও আজকের প্রজন্মের ছেলে। ও মায়ের প্ল্যানের জন্য অপেক্ষা করে থাকে না, ও নিজেই প্ল্যান করে নিজের জীবনে এগিয়ে যাবে। সবাই সবার ভাগ্য নিয়ে আসে। সেই ভাগ্যের জোরেই ওরা এগিয়ে যাবে।
প্রশ্ন: এই প্রজন্মকে কী ভাবে দেখছেন? ইন্ডাস্ট্রিতেও নতুন প্রজন্ম এসেছে।
রচনা: ওরা খুবই স্মার্ট। আমাদের মত ক্যাবলা কেউ নয়। আমরা কিছু বুঝতাম না। যে যা পেরেছে বলেছে। আমাদের টুপি পরিয়েছে। এখনকার প্রজন্ম অনেক স্মার্ট। অনেক নিয়ম মেনে কাজ করে ওরা। আমরা দিনরাত কাজ করতাম। গাছের তলায় পোশাক বদলেছি, রাস্তাঘাটে বসে পড়তাম। এখন অনেক সুবিধা। সময়ে শুটিং শুরু হয়, সময়ে শেষ হয়। মেকআপ ভ্যান আছে। আমাদের সময় এত উন্নত ছিল না সবটা। ওরা খুব ভাগ্যবানও। আমি খুব সাপোর্ট করি নতুন প্রজন্মকে।
প্রশ্ন: সম্পর্কের ওপর এই প্রজন্ম আস্থা হারাচ্ছে?
রচনা: এখন অনেকেই বিয়ে করতে ভয় পায়। ঠিক আছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে পরিবর্তন করতে হবে। এখন যুগ যে রকম, এখন তার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। মিলে চলতে হবে। একটা সম্পর্কে থাকতে ভয় পায়, যদি সম্পর্কটা কাজ না করে তাই প্রতিশ্রুতিতে ভয় পায়। অনেকে বিয়ে করলেও আবার মা হতে চায় না। সেটা যার যার সিদ্ধান্ত। চিন্তাধারা সবার বদলেছে। জীবনকে অন্য ভাবে দেখতে শিখেছে। আমরা অনেক দুঃখ পাই, তারা হয়তো আনন্দ করে জীবন উপভোগ করতে চায়। দু’দিনের জীবন, কেন দুঃখ পাবে? আনন্দ করে জীবন কাটাবে। আমি মুহূর্তের সঙ্গে বাঁচি এবং আগামী দিনটা সাজিয়ে চলতে চাই।
প্রশ্ন: সিনেমা করতে ইচ্ছে করে?
রচনা: এখন সময় খুব কম। তবে হ্যাঁ, অবশ্যই যদি সে রকম কোনও ভাল চরিত্র আসে। এত চাপের মধ্যেও সময় বার করে নিজেকে নিংড়ে দেওয়ার মতো কোনও চরিত্র পেলে, তখন অবশ্যই করব।
প্রশ্ন: এত গরমে ভোটের প্রচার। অভিজ্ঞতা কেমন, কী কী সতর্কতা মেনে চলছেন?
রচনা: আমাদের রাজনৈতিক পেশায় এটা কাজের অঙ্গ। রাজনীতিকদের এটাই কাজ। সবাই সেটা করে, একা আমি নই। সবাই সবার পাশে গিয়ে দাঁড়াই। আমাদের সবাই দেখতেও চান মানুষ। তাই দিদি এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সকলেই চান, আমরা সব জায়গায় যাই। আমি তো প্রচার করছি। তবে হ্যাঁ, খুব গরম, জলটা বেশি করে খেতে হবে। খুব হালকা খাবার খেতে হবে।
প্রশ্ন: ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই রয়েছেন বিরোধী পক্ষে। টলিউডে তাঁরা আপনার সহকর্মী, তাঁদের কী বলতে চাইবেন?
রচনা: যে যার নিজের দলকে ভালবাসেন, শ্রদ্ধা করেন। কাউকে বিদ্রুপ করা বা কাউকে ছোট করে দেখানো বা কুৎসা করা, আমি কোনওদিন করিওনি, করবও না। যাঁকে তাঁরা গুরু মনে করেন তাঁদের পাশে থাকছেন। ঠিক আছে, তাঁরা তাঁদের কাজ করছেন। আমি আমার কাজ করি।
প্রশ্ন: ছেলের জন্য সময় বার করা, নিজের ব্যবসা সামলানো, এ দিকে শুটিং, আবার প্রচার— সব সামলাচ্ছেন কী ভাবে?
রচনা: খুব যে মসৃণ ভাবে সবটা সামলাই তা নয়। অসুবিধা তো হয়ই। জীবন তো এত সহজ নয়। প্রত্যেক মুহূর্তেই কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। পরিশ্রম তো করতেই হবে। আমি কাজের মানুষ। কাজের মধ্যে থাকতেই ভালবাসি। ছোটবেলা থেকে কাজ করি আমি। কাজের চাপ থাকলে খুব টেনশন করি না। মনে করি, ঠিক করে ফেলব। ফলে সবটাই হয়ে যায়। সমতা রেখে চলি। সেই ভাবেই জীবনটাই সহজ হয়েছে। সবদিকে ঢুকিনি। ‘দিদি নম্বর ১’ আমার প্রথম গুরুত্ব, তার পরেই আমার ছেলে। ছোটখাটো ব্যবসাও আছে, সেটাও চালাচ্ছি। এর মধ্যে সিনেমাও করতে গেলে মুশকিল হত। কিছু পেতে গেলে কিছু ছাড়তে হয়, তাই সিনেমা করা হয়ে উঠল না।