Asha Bhosle Demise

আশাজির মতো স্বরপ্রক্ষেপণের নিঃসীম তরবারি সঙ্গীতজগৎ আর পেয়েছে বলে মনে হয় না

তাঁর ব্যাপ্তিটা অনেক বড়। বিস্তার বর্ণনা করা দুঃসাধ্য। পরিবারে যখন এক বোন লতা মঙ্গেশকর হন, তখন অন্য বোনের আশা ভোসলে হয়ে ওঠার পথ কতটা কঠিন হতে পারে, তা যাঁরা সে পথ পেরিয়েছেন, তাঁরাই জানেন।

Advertisement

অজয় চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:৪৬
Share:

‘মাস চারেক আগেও ভিডিয়ো কলে কথা হয়েছে আমাদের’। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

মাস তিন-চার আগের কথা। ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনের পর্দায় নাম আশাজির। ফোন করে বললেন, কৌশিকী কত ভাল গায়! ওর ছেলেও কত সুন্দর গাইছে। কয়েকটি কথার পরেই ভিডিয়ো কল করলেন। বাকি কথা হল মুখোমুখি বসেই। এমনই ছিলেন আশাজি। বিশ্লেষণের ঊর্ধ্বে। তাঁর ব্যাপ্তিটা অনেক বড়। বিস্তার বর্ণনা করা দুঃসাধ্য। তাঁর কণ্ঠে এমন কিছু আছে যা সুর, তাল, লয় পেরিয়েও আরও কিছু— যা সচরাচর শিল্পীদের মধ্যে পাওয়া যায় না। এত সুন্দর কণ্ঠ, এত স্পষ্ট উচ্চারণ, এমন নির্ভুল সুরে গাওয়া— ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। ভারতীয় সিনেমা-সংস্কৃতির অঙ্গনটাকেই পুণ্যতোয়া সুরের স্রোতে ধুয়ে দিয়েছিলেন যেন।

Advertisement

বসে বসে ভাবছি সে সব দিনের কথা। প্রথম আলাপ পঞ্চমজির মাধ্যমে। বাড়িতে গানের আসর বসেছিল। তখনই আশাজির সঙ্গে প্রথম কথা হয় ফোনে। তার পর দিনের পর দিন, বছরের পর বছর কত কথা হয়েছে। কত শত ছবি রয়েছে তাঁর সঙ্গে। যত বলি কম বলা হবে। আমার স্ত্রী-পুত্রকে বাড়িতে নিজের হাতে রান্না করে মাছ খাইয়েছেন। এমনটা আশাজিই পারতেন।

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক।

এই তো এক বছর আগের কথা। দুবাই গিয়েছিলেন অনুষ্ঠান করতে। তাঁর গান শুনতে অডিটোরিয়ামে প্রায় হাজার দশেক দর্শকাসন কানায় কানায় ভর্তি। ভাবাই যায় না! এই বয়সেও বিশ্রাম নেওয়ার কথা ভাবেননি। শত অসুস্থতা, শরীর খারাপের মধ্যেও গেয়ে গিয়েছেন। সে কারণেই তো তাঁর এত অগণিত ভক্তকুল! এত ভালবাসা, এত সম্মান। আসলে এমন নিষ্ঠাতেই গানের সমাজের স্থিতাবস্থার বাতাস বয়, স্বর্গের শান্তির ছায়াটুকুকে দূর থেকে দেখেই তৃপ্ত হয় জনসাধারণ। সুরের বাঁধনে জনগণের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য ভাবে জুড়ে যেতে পারেন আশা ভোসলে। কণ্ঠলাবণ্যের বন্যায় ভাসিয়ে দিতে পারেন আসমুদ্র-হিমাচলকে। তাঁকে সর্বকালের, সর্বসময়ের, সঙ্গীতের সর্বধারার শ্রেষ্ঠতমা বললেও অত্যুক্তি হবে না।

Advertisement

অথচ, এই পথচলা কি ততটা মসৃণ ছিল? তাঁর গানভুবন, তাঁর উচ্চারণের জাদু দীর্ঘসময়ের এক অধ্যবসায়ের ফল। সঙ্গীতের পাঠ নেওয়া পারিবারিক সূত্রে শুরু হলেও সাধনার এই একাগ্রতা তাঁর স্বোপার্জিত। পরিবারে এক বোন যদি লতা মঙ্গেশকর হন, তা হলে অন্য বোনকে আশা ভোসলে হয়ে উঠতে গেলে, কতটা কঠিন পথ পেরোতে হয়, তা যিনি সে পথে হেঁটেছেন, তিনিই বলতে পারবেন। কতটা পরিবর্তিত হতে হয়েছে, কতটা ভাঙতে-গড়তে হয়েছে নিজেকে। তাঁর মতো স্বরপ্রক্ষেপণের নিঃসীম তরবারি— সঙ্গীতজগৎ আর কখনও পেয়েছে বলে মনে হয় না।

শুধু স্বরক্ষেপণই অবশ্য আশাজির পরশপাথর ছিল না। নানা ভাষায় গান, বিভিন্ন ধারার সঙ্গীতেও তাঁর অবাধ বিচরণ। এমন করে সুরকে কণ্ঠে ধারণ করতেন যা বর্ণনা করার নয়। এ দীর্ঘ সাধনেই আসে। অসামান্য মননশীলতাও কাজ করে সেখানে। এখন বলতে দ্বিধা নেই, একসময়ে আশাজি, লতাজিকে দেখেই সঙ্গীত শেখার ইচ্ছা জন্মেছিল আমার। না হলে হয়তো, ডাক্তারি-ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তাম।

Advertisement

সঙ্গীতের তো মৃত্যু নেই, তাই যুগাবসানও হয়নি। সঙ্গীতের নানা ধারায় বহমান এমন শিল্পী আর জন্মাবেন কি না জানা নেই। তবে স্মৃতিতে, মননে, সুরে তিনি থেকে যাবেন আজীবন।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement