Remembrance On Asha Bhosle

হেমন্তদাকে অন্ধের মতো ভক্তি করতেন আশাজি, তাই দাদার নামে নামকরণ করেছিলেন নিজের ছেলের

আমার আগামী ছবি ‘অগ্নিযুগ: দ্য ফায়ার’-এর আইটেম গানে কণ্ঠ দেওয়ার কথা ছিল ওঁর। এই প্রথম বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের ছবিতে আশা ভোসলে নেই।

Advertisement

বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৫১
Share:

বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের আগামী ছবিতে গাওয়ার কথা ছিল আশা ভোসলের। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

আশাজিকে নিয়ে কত স্মৃতি, কত কথা। কোথা থেকে শুরু করব? কোনটাই বা বাদ দেব!

Advertisement

আমার বম্বে (অধুনা মুম্বই) যাওয়ার প্রধান কারণ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ওঁর প্রযোজিত ছবি ‘বিশ সাল বাদ’ দিয়ে টিনসেল টাউনে প্রথম পা রাখা। হেমন্তদার সঙ্গে মঙ্গেশকর পরিবারের অদ্ভুত হৃদ্যতা। পরিবারের প্রত্যেকে ওই মানুষটির অন্ধভক্ত। হেমন্তদার গানের, ওঁর কণ্ঠস্বরের। এবং অবশ্যই ‘ব্যক্তি’ হেমন্তেরও। উদাহরণ শুনবেন? আশাজি তাঁর ছেলের নাম রেখেছিলেন হেমন্ত! এক বাঙালি সুরকার-শিল্পী এবং প্রযোজককে শ্রদ্ধা জানিয়ে। বাঙালির কাছে এর থেকে গর্বের কী হতে পারে?

মঙ্গেশকর পরিবারের সঙ্গে আমার পরিচয়ের হেতু ওই ‘বিশ সাল বাদ’ ছবিটি। ছবির প্রিমিয়ারে লতা মঙ্গেশকর এবং আশা ভোসলে এসেছিলেন। ছবি দেখে এতই ভাল লেগেছিল আশাজির যে, হেমন্তদাকে বলেছিলেন, “কই আপনার হিরো? ডাকুন তাঁকে। আলাপ করি।” পরে লতাজির আমন্ত্রণে ওঁদের বাড়ি ‘প্রভু কুঞ্জ’তে যাই। পাশাপাশি দুটো ফ্ল্যাট। একটি লতাজির, অন্যটি আশাজির। সেখানেই আশা ভোসলের সঙ্গে আলাপ।

Advertisement

আশাজির সঙ্গে আলাপ গাঢ় হল সুরকার ও পি নইয়রের হাত ধরে। ওঁরা তখন হিট জুটি। তার কারণ ছিল। শুনেছি, নইয়রের কেরিয়ারের শুরুতে লতাজি তাঁকে বাতিল করেছিলেন। ওই ঘটনা ধাক্কা দিয়েছিল সুরকারকে। তিনি যখন খ্যাতি পেলেন, তখন তিনি এড়িয়ে গেলেন লতাজিকে। সখ্য হল তাঁরই বোন আশার সঙ্গে। সেই সখ্য গাঢ় হল ক্রমে। নইয়র-আশা জুটির রসায়ন ছাপ ফেলল তাঁদের গানেও। আমার ছবির বেশির ভাগ সুরকার নইয়র। ব্যস, আশাজির সঙ্গে আমারও বন্ধুত্ব জমে গেল।

বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়, আশা ভোসলে, রাহুল দেব বর্মণ, মহম্মদ রফি (বাঁ দিক থেকে ডান দিক))। ছবি: সংগৃহীত।

হ্যাঁ, বন্ধুত্বই। লতা-আশা দুই বোন সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর। লতাজি নিজের মধ্যে থাকতে ভালবাসতেন। আশাজি হুল্লোড়, আনন্দে মত্ত। ভীষণ আধুনিক, সপ্রতিভ, ঝকঝকে। কথায় জড়তা নেই। ভাবনায় দ্বিধা নেই। ওঁর সঙ্গে প্রাণ খুলে মেশা যায়। বন্ধুত্ব করা যায়। খুব খোলামেলা মেজাজের মানুষ। মনে আছে, নইয়রের জন্মদিনে একবার ওঁর কোমর জড়িয়ে নেচেছিলাম। বল ডান্স করেছিলাম ওঁর সঙ্গে। কিচ্ছু মনে করেননি। স্বভাবের মতোই বিপরীতধর্মী গায়িকা ছিলেন দুই বোন। লতাজির কণ্ঠ তাঁর মতোই ‘সিরিয়াস’। ওঁর আলাদা ঘরানা। আশাজির কণ্ঠে যে কোনও গান আলাদা প্রাণপ্রাচুর্যে ভরে যেত। কী পেপি সং, রোমান্টিক কিংবা দুঃখের। ওঁর কণ্ঠে সব গান মানিয়ে যেত। তাই দুই বোনের গানের তুলনা আমি অন্তত করিনি কখনও।

Advertisement

নইয়রের সৌজন্যে এমন হল, বিশ্বজিতের ছবি মানেই আশার গান। গান রেকর্ডিংয়ের আগে আশা আমার সঙ্গে বসতেন। বলতেন, “বিশু, বুঝিয়ে দাও তো, ওই গানের দৃশ্যে তোমার নায়িকা কেমন অভিনয় করবেন?” সে সব শুনে উনি গানে অভিব্যক্তি জুড়তেন। গান ‘হট কেক’-এর মতোই হিট। একটা সময়ের পর নইয়রের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ল আশার। আমার সঙ্গে কিন্তু বন্ধুত্ব অটুট। ওঁর জীবনে এলেন আমার আর এক বন্ধু রাহুল দেব বর্মণ। আপনারা যাঁকে পঞ্চম বলে জানেন। গানের দুনিয়ায় রাহুল-আশা জুটিও হিট। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে, বার্মিংহামে আশা, রাহুলের সঙ্গে আমিও গিয়েছি। একই মঞ্চে আমারও গানের আমন্ত্রণ। সেই গান শুনে আশা রীতিমতো প্রভাবিত। রাহুলকে বললেন, “বিশুকে দিয়ে গাওয়াচ্ছ না কেন!” সে দিন জোড়হাতে অনুরোধ করেছিলাম। বলেছিলাম, “অনেক বাংলা গান গেয়েছি। তা বলে হিন্দিতে গাইব না।”

আশাজির এই রূপটাই বরাবর প্রকাশ্যে এসেছে। এত হাসিখুশি মানুষটার মনেই যন্ত্রণার পাহাড়। একাধিক অসফল বিয়ে, সম্পর্ক। পরিণতবয়স্ক মেয়ের আত্মহত্যা। সেই সব নিয়েই তিনি একের পর এক শো করে গিয়েছেন। গেয়েছেন বহু গান। আমার দুর্গাপুজোয় ওঁর খুব আসার ইচ্ছা ছিল। দেখা হলেই বলতেন, আগামী বছর অবশ্যই আসবেন। আশা হয়নি কখনও। ঠিক যেমন আমার আগামী ছবি ‘অগ্নিযুগ: দ্য ফায়ার’-এর আইটেম গানে কণ্ঠ দেওয়ার কথা ছিল ওঁর। এই প্রথম বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের ছবিতে আশা ভোসলে নেই।

সামনেই আমার একটি গানের অনুষ্ঠান আছে। ওই অনুষ্ঠান আশাজিকে উৎসর্গ করব। ওঁর গাওয়া কিছু গান সে দিন শুনবেন শ্রোতারা। মনে পড়ে, একটা সময় ‘হোপ ৮৩’ বা ‘হোপ ৮৬’ অনুষ্ঠিত হত? ‘হোপ’ মানেই তো আশা। আমরা আশায় বাঁচি। আশা ভোসলেও সে রকমই।

ওঁর গান আমাদের বাঁচার আশা। আমাদের জীবন থেকে তাই ‘আশা’ ভোসলে বাদ যাবেন কী করে?

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement