K Bhagyaraj

নিজের লেখার জোরেই ‘নায়ক’ হয়েছিলেন, চিত্রনাট্যকার-অভিনেতা কে ভাগ্যরাজের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ বিনোদনদুনিয়া

শনিবার, ২৭ জুন হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৩ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন বর্ষীয়ান চিত্রনাট্যকার-অভিনেতা-পরিচালক কে ভাগ্যরাজ। তাঁর প্রয়াণে স্তব্ধ বিনোদনদুনিয়া।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬ ১৭:১৫
Share:

প্রয়াত জনপ্রিয় চিত্রনাট্যকার-পরিচালক-অভিনেতা কে ভাগ্যরাজ। ছবি: সংগৃহীত।

ভারতীয় চলচ্চিত্রে চিত্রনাট্যকার-পরিচালক হিসাবে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছিলেন কে ভাগ্যরাজ। শনিবার, ২৭ জুন হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৩ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন এই বর্ষীয়ান অভিনেতা-পরিচালক।

Advertisement

সকালে নিয়মমাফিক হাঁটাহাঁটি সেরে বাড়ি ফেরার পর বুকে ব্যথা অনুভব করেন তিনি। দ্রুত তাঁকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে চলচ্চিত্রজগতে পা রাখলেও, ভাগ্যরাজের যাত্রা শুরু হয় কিংবদন্তি পরিচালক ভারতীরাজার সহকারী হিসাবে। ১৯৭৭ সালের ‘১৬ বয়তিনিলে’ ছবিতে কাজ করার পর ‘পুতিয়া ওয়ারপুগাল’-এ তাঁকেই নায়ক হিসাবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ করে দেন ভারতীরাজা। এর পরে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। তামিল শব্দবন্ধ ‘পুতিয়া ওয়ারপুগাল’-এর অর্থ কোনও কিছুকে নতুন আকার দেওয়া। আক্ষরিক অর্থেই নিজের কর্মজীবনে নতুন ছাঁচে ফেলেছিলেন এর পরে ভাগ্যরাজ। নায়ক ও পরিচালক হিসাবে তিনি প্রায় ২৭টি ছবি করেন, যার অধিকাংশই বক্সঅফিসে বিপুল সাফল্য পায়।

Advertisement

এক পুরনো সাক্ষাৎকারে ভাগ্যরাজ বলেছিলেন, “আমার আয়নায় নিজের মুখ দেখার স্বভাব আছে। হঠাৎই এক দিন বুঝতে পারি যে, আমি অলীক স্বপ্ন দেখছি।” তিনি বোঝেন, তাঁর লেখনীই তাঁকে আলাদা পরিচয় এনে দিতে পারে। সেই বিশ্বাসই পরবর্তীকালে তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।

তামিল ছবির দৃশ্যে নায়িকার সঙ্গে কে ভাগ্যরাজ। ছবি: সংগৃহীত।

‘মুন্ধনৈ মুদিচু’, ‘অন্ধা ৭ নাটকাল’-এর মতো একের পর এক ছবিতে তিনি মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন, সম্পর্ক, হাস্যরস ও সামাজিক ব্যঙ্গকে সহজ অথচ গভীর ভাবে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর ছবিতে যৌনতা বা দাম্পত্যের সম্পর্কও কখনও অশ্লীলতার মোড়কে নয়, বরং বাস্তব জীবনের অংশ হিসাবেই উঠে এসেছে।

অভিনেতা হিসাবেও ভাগ্যরাজ প্রচলিত ‘মাস হিরো’-র ধারণা ভেঙে দেন। দুর্দান্ত নাচ বা অ্যাকশন নয়, সিনেমার চিরাচরিত নায়কের মোড়ক ভেঙে সাধারণ মানুষের মতো চরিত্রেই তিনি দর্শকের মন জয় করেছিলেন। ফলে তাঁকে পর্দায় দেখে দর্শক নিজেদেরই প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেতেন। ক’জন সাধারণ মানুষই বা চোখের পলকে নিখুঁত নাচ-গান বা মারপিট করে গুন্ডাদমন করতে পারেন? ফলে ভাগ্যরাজের পাশের বাড়ির ছেলের মতো নায়কের সঙ্গে একাত্ম বোধ করত দর্শক।

ভাগ্যরাজের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর আত্মবিশ্বাস। তিনি বিশ্বাস করতেন, তাঁর লেখা চিত্রনাট্যই তাঁকে নায়ক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যথেষ্ট। দর্শকও সেই বিশ্বাসে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছিলেন।

হিন্দি ভাষায় খুব একটা সাবলীল না হয়েও তিনি অমিতাভ বচ্চনকে নিয়ে পরিচালনা করেছিলেন ‘আখরী রাস্তা’। ছবিটি ছিল কমল হাসন অভিনীত তামিল ‘ওরু কৈধিয়িন ডায়রি’র হিন্দি রিমেক। পরে অনিল কপূরকে নিয়ে তৈরি করেন ‘মিস্টার বেচারা’। সেটি তাঁরই তৈরি ‘বিতলা বিশেষঙ্গা’র রিমেক।

যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজের পরিচালিত ছবির নায়ক তিনি নিজেই হতেন। তাঁর অসংখ্য ছবি পরবর্তীকালে হিন্দি, তেলুগু ও কন্নড় ভাষায় রিমেক হয়েছে। ‘বেটা’, ‘রাজা বাবু’, ‘অন্দাজ়’, ‘ঘরওয়ালি বাহারওয়ালি’, ‘মাস্টারজি’র মতো অজস্র হিন্দি ছবি তৈরি হয়েছে ভাগ্যরাজের চিত্রনাট্যের উপর ভিত্তি করে। সেগুলি বলিউডে বক্সঅফিস সাফল্যও পেয়েছে। এমনকি অক্ষয় কুমার, প্রিয়ঙ্কা চোপড়া, সলমন খান অভিনীত ‘মুঝসে শাদি করোগি’র মূল চিত্রনাট্যও লেখা ভাগ্যরাজের। সেখান থেকে হিন্দিতে চিত্রনাট্য তৈরি করেন অনীস বাজ়মি।

কে ভাগ্যরাজ। ছবি: সংগৃহীত।

কর্মজীবনের একটা সময়ে সুরকার ইলাইয়া রাজার সঙ্গে মতবিরোধ হয় ভাগ্যরাজের। তখন নিজের কয়েকটি ছবিতে নিজেই সঙ্গীত পরিচালনাও করেছিলেন। পরে অবশ্য তাঁদের মধ্যে মানঅভিমানের পালা সাঙ্গ হয় এবং আবার একসঙ্গে কাজ করেন। তাঁকে শেষ দেখা গিয়েছিল ২০২৫ সালে, ধনুষের ‘কুবেরা’ ছবিতে। ২০১০ সালে মুক্তি পায় তাঁর পরিচালিত শেষ সিনেমা। কিছু দিন আগে তিনি পরিচালনায় ফেরার ঘোষণা করেছিলেন।

ভাগ্যরাজের বিদায়ে ভারতীয় সিনেমা হারাল তার এক অনন্য গল্পকারকে, যিনি প্রমাণ করেছিলেন, বড় তারকা হওয়ার জন্য সবসময়ে বড় আয়োজনের প্রয়োজন পড়ে না; অসাধারণ লেখনীই এক জন শিল্পীকে অমর করে রাখতে পারে। রবিবার চেন্নাইয়ে রাষ্ট্রীয় সম্মানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। তাঁর প্রয়াণে দক্ষিণী বিনোদনদুনিয়া তো বটেই, স্তব্ধ বলিউডও। শোকপ্রকাশ করেছেন কমল হাসন, রজনীকান্ত, ধনুষ, অনিল কপূর, অমিতাভ বচ্চনের মতো বহু তারকা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement