নক্ষত্রের ঔজ্জ্বল্যে ধরে রাখা গেল না তৃণমূলের দুর্গ। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
এমনই কি হওয়ার ছিল? তৃণমূলের এক জন তারকাও জিতলেন না, কিন্তু বিজেপি-তে উজ্জ্বল হয়ে রইলেন নক্ষত্রেরা!
এক সময়ে তারকার ছটায় জ্বলজ্বল করত তৃণমূলের প্রার্থিতালিকা। অনেকে বলতেন, তারকাদের মুখ দেখিয়েই বেশি ভোট জিতেছে ওই দল। সেই তারকায় যে ভরসা হারাচ্ছে দল, ইঙ্গিত আসছিল ঠিকই। এক তৃণমূল ঘনিষ্ঠ তারকা আবার বন্ধুদের মহলে নির্বাচনের কিছু আগেই উল্টো মন্তব্যও করেছিলেন। তারকারাই নাকি আসলে ভরসা হারিয়েছেন। তাই একে একে সরে দাঁড়িয়েছেন তাঁরা। সে যা-ই হোক, এক অংশের সঙ্গে তৃণমূলের দূরত্ব যে বাড়ছিল, তা ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থিতালিকাই স্পষ্ট করে দেয়। বিদায়ী বিধায়কও নির্বাচনে লড়ার টিকিট পাননি, এমনও দেখা গিয়েছে। তবে ফল প্রকাশের পরে যা দেখা গেল, তা হল নক্ষত্রের ঔজ্জ্বল্যে ধরে রাখা গেল না তৃণমূলের দুর্গ!
ঘাসফুলভর্তি টলিউডের উজ্জ্বল তারকাপ্রার্থীরা গেরুয়া ঝড়ের তাণ্ডবে চলে গেলেন পিছনের সারিতে। তৃণমূলে এক জন তারকাপ্রার্থীও জয়ের হাসি হাসতে পারলেন না। রাজ চক্রবর্তী থেকে ব্রাত্য বসু, সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে লাভলি মৈত্র, সোহম চক্রবর্তী থেকে অদিতি মুন্সী, কে না লড়েছেন তৃণমূলের হয়ে! একদা এই তারকাদের ঘিরেই উজ্জ্বল হয়েছিল তৃণমূল। পথসভা থেকে চলচ্চিত্র উৎসব, ভোটপ্রচার থেকে দুর্গাপুজোর কার্নিভাল— মঞ্চ আলো করে ছিলেন তাঁরা। মিশে গিয়েছিলেন ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে। এখন টলিপাড়ার অন্দরে কান পাতলে উঠে আসছে তাঁদের মধ্যেই কাউকে কাউকে নিয়ে অভিযোগ। কারও ক্ষেত্রে বা মন্তব্য করতে গিয়ে হয়রান হচ্ছেন সহকর্মীরা।
রাজ চক্রবর্তী। ছবি: সংগৃহীত
সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত
কিন্তু বিজেপি-তেও তো তারকারা ছিলেন, তা হলে তাঁদের প্রতি তো ভরসা হারায়নি জনতার। অন্তত ভোট বাক্স তো তেমনই বলছে। টলিপাড়ায় বহু বছর ধরে কর্মরত এক টেকনিশিয়ান বলেন, ‘‘তারকাদের উপরে কেন রাগ হবে, তাঁরা তো বন্ধু মানুষ। কিন্তু তাঁদের নিজেদের মধ্যে এত ঝগড়া, সে সব অনেকেই পছন্দ করেন না। এর সঙ্গে কাজ করা যাবে না, ওর সঙ্গে বেশি কথা বলা যাবে না— এ সব আর বোধ হয় কেউ ভাল চোখে দেখছেন না।’’ টলিউডের অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্রও এই বক্তব্যের সঙ্গে সহমত। তাঁর কথায়, ‘‘তৃণমূল এসেই ইন্ডাস্ট্রির ভিতরে দু’টি ভাগ করে দিয়েছিল। সব সমস্যা সেখান থেকেই শুরু হয়েছে। সরকারের পক্ষের লোক হলে তবেই সে গ্রহণযোগ্য হবে। কিন্তু রাজনীতি যে কেবল তারকা দিয়ে হয় না, তা মানুষ বুঝে গিয়েছেন।’’ আর তাই বোধহয় এমন ভাবে পরাজয়ের মুখোমুখি হলেন তাঁরা। শ্রীলেখার মতে, রাজনীতি করতে হলে, মানুষের জন্য কাজ করতে মাঠঘাটে নেমে করতে হবে। তখন আর সাজগোজ, মেকআপ নিয়ে ভাবলে চলে না। তৃণমূলের তারকাদের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগ, ‘‘ওঁরা তো রাজনৈতিক সভাতেও মেকআপ আর্টিস্টদের নিয়ে যায়। মানুষ কি অত বোকা? কেনই বা এ সব দেখে আর ভরসা রাখবে তাঁরা?’’
ও দিকে, পদ্মশিবিরে নতুন করে নক্ষত্রদের উজ্জ্বল আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে উঠেছে। অগ্নিমিত্রা পাল থেকে রুদ্রনীল ঘোষ, পাপিয়া অধিকারী থেকে রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, হিরণ চট্টোপাধ্যায় থেকে শর্বরী মুখোপাধ্যায়। তাঁদের কি তবে বেশি জনে পছন্দ করেন?
রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত
পাপিয়া অধিকারী। ছবি: সংগৃহীত
এই প্রশ্নের পক্ষে একটি কথা বার বার ঘুরে আসছে। তা হল, বিজেপি-তে যে সকল তারকা জিতেছেন, তাঁদের অধিকাংশই বেশ মন দিয়ে রাজনীতি করছেন। রূপা হোন বা অগ্নিমিত্রা— কেউই মূলত অভিনয় বা ফ্যাশন জগতে আটকে রাখেননি নিজেকে। গুরুগম্ভীর রাজনীতিককে ভোটে দাঁড় করানোর ফল পাচ্ছে বিজেপি, এমনই ফিসফাস এখন টলিপাড়ায়। আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে কথা বলার সময়ে রূপা যা বলেছেন, তা এই ধারণার সঙ্গেই যেন মিলে যাচ্ছে। তাঁর কথায়, ‘‘সোনারপুর দক্ষিণকে উন্নত করার রোড ম্যাপ আমার তৈরি। আমার চিত্রগ্রাহকেরা আমার ছবি তোলার জন্য ঘোরেননি। তাঁরা এলাকার দুর্দশার ছবি তোলার জন্য ঘুরেছেন।’’ এ দিকে, তৃণমূলের তারকাপ্রার্থীদের ভোটপ্রচারের ছবি সমাজমাধ্যমে পৌঁছোতে দেরি হত না বলে ব্যঙ্গ করতেন অনেকে।
টলিউড অভিনেতা ঋষি কৌশিকের মতে, এই জয়ের মূলে রয়েছে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা। জনগণ পরিবর্তন চেয়েছিল বলেই এই ভাবে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন তাঁরা। এর পাশাপাশি, বিজেপি খুব ভেবেচিন্তেই প্রার্থী বাছাই করেছে। যাঁরা রাজনৈতিক ভাবে সচেতন তাঁদেরই বেছে নেওয়া হয়েছে বলে তাঁর মত। ঋষির কথায়, ‘‘প্রার্থী হিসেবে তারকাদের বেছে নেওয়ার এই প্রবণতা শুরু করেছে তৃণমূল। কিন্তু বিজেপি সে ভাবে কাজ করে না বলেই মনে হয়। তারকা হলেও তাঁদের ফোকাসটা কোন দিকে, সেটা দেখে নেওয়া হয়।’’ অভিনেতা মনে করালেন, টলিউডের শিল্পী হিসেবে জনপ্রিয় হওয়া, আর রাজনৈতিক মঞ্চে কাজ করে জনপ্রিয় হওয়ার মধ্যে ফারাক আছে। আর সেটাই বোধহয় গুলিয়ে ফেলেনি বিজেপি।