স্তন, ফুসফুস কিংবা কোলন ক্যানসারের মতো পরিচিত নামগুলির আড়ালে লুকিয়ে আছে ক্যানসারের এমন এক অন্ধকার জগৎ, যার খবর রাখা দুঃসাধ্য। চিকিৎসাবিজ্ঞানের চেনা ছকের বাইরে থাকা এই নীরব ঘাতকেরা হানা দেয় গুটিকয়েকের শরীরে। কখনও অজান্তে বাসা বাঁধে মস্তিষ্কের গভীরে, কখনও আক্ষরিক অর্থে দুমড়েমুচড়ে দেয় গোটা মেরুদণ্ডটাই।
শরীরের কাঠামো ধরে রাখে মেরুদণ্ড। তাতেই বাসা বাঁধে ‘কর্ডোমা’। ক্যানসারের অতি বিরল রূপ যা কব্জা করে ফেলে গোটা মেরুদণ্ডটাই। ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে কশেরুকাগুলি। সামান্য আঘাতেই গুঁড়িয়ে যায় মেরুদণ্ডের হাড়। পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারেন রোগী।
ভ্রূণ অবস্থায় শরীরের কাঠামো ধরে রাখে নোটোকর্ড যা পরবর্তীতে তৈরি করে মেরুদণ্ড। লুপ্ত হয়ে যাওয়া নোটোকর্ডের কোষ অতি সক্রিয় হয়ে ক্যানসারে বদলে গেলেই হয় কর্ডোমা। খুলির ঠিক নীচে থেকে পিঠের মাঝ বরাবর, মেরুদণ্ডের একেবারে নীচের অংশ অবধি ছড়াতে পারে ক্যানসার। ঘাড়ের কাছেও বাসা বেঁধে স্পন্ডিলাইটিসের মতো লক্ষণ দেখা দেয়। রোগটি ধরা কঠিন, চিকিৎসা আরও জটিল।
লিভার ক্যানসারের বিরল ধরন ‘ফাইব্রোলামেলার কার্সিনোমা’ তাদেরই হয় যাদের লিভারের রোগ নেই। কস্মিনকালেও ফ্যাটি লিভার হয়নি বা হেপাটাইটিস বাসা বাঁধেনি। গবেষকদের অনুমান, এর নেপথ্যে রয়েছে জিনেরই কারসাজি। পেট ও কাঁধে ব্যথা, খিদে কমে যাওয়া, ওজন হ্রাস, বমি ভাব— লক্ষণ এমনই। সাধারণ লিভার ক্যানসারের সঙ্গেও এর সম্পর্ক নেই। তাই এটি হলে ধরা পড়া সহজ নয়।
কমবয়সিদেরই হয় ফাইব্রোলামেলার কার্সিনোমা। এর কোনও চিকিৎসা নেই। রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও কম। কর্কট রোগের এই ভয়াবহ রূপকে ঠেকাতে টিকা তৈরি করেছে আমেরিকার জন হপকিনস কিমেল ক্যানসার সেন্টার। প্রতিষেধকটির ক্লিনিকাল ট্রায়াল চলছে মানুষের শরীরে।
স্তন ক্যানসারের যে লক্ষণগুলি সাধারণত দেখা যায়, তার চেয়ে এটি আলাদা। স্তনে কোনও বদলও সে ভাবে ধরা পড়ে না। বিরল প্রকারের এই ক্যানসারের নাম ‘ইনভেসিভ লোবিউলার কার্সিনোমা’। দুধ উৎপাদনকারী গ্রন্থি লোবিউলে ছোট ছোট টিউমার জন্মায় যা দ্রুত ছড়াতে থাকে। স্তন ও তার আশপাশের কোষগুলি ক্ষয়ে যেতে থাকে। মহিলাদের দুই হরমোন ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের ক্ষরণের তারতম্য হতে থাকলে ক্যানসার আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
লোবিউলার কার্সিনোমায় নিজে থেকে পরীক্ষা করে কিছু বোঝা সম্ভব নয়। ম্যামোগ্রামেও ধরা পড়ে না সে ভাবে। ‘আলট্রাসাউন্ড’ এবং ‘ব্রেস্ট এমআরআই’ করলে কিছু ক্ষেত্রে এই ক্যানসার শনাক্ত করা যেতে পারে। পরিবারে স্তন ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে অথবা খুব বেশি ধূমপান-অ্যালকোহলের নেশা থাকলে এই ক্যানসারের আশঙ্কা বাড়ে।
হার্টেও ক্যানসার হয়? চিকিৎসকেরা বলেন, অবিরত রক্ত পাম্প করার ক্ষমতার কারণেই হার্টে ক্যানসার হওয়া অত্যন্ত বিরল। তবুও তা হতে পারে। ‘কার্ডিয়াক অ্যাঞ্জিয়োসারকোমা’ তেমনই এক ধরন যাকে বলে প্রাইমারি হার্ট ক্যানসার। হার্টের নিজের কোষেরই বিভাজন অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যায় এবং টিউমার তৈরি হয়।
কার্ডিয়াক অ্যাঞ্জিয়োসারকোমা যেমন বিরল, তেমনই বিপজ্জনকও। রক্তনালি ও লিম্ফ নোডের ভিতরে ছড়িয়ে পড়ে ক্যানসার। পা, গোড়ালি, পেটে জল জমতে থাকে, বুক ধড়ফড় করে, শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। রোগী বুঝতেই পারেন না তিনি হৃদ্রোগে আক্রান্ত না ক্যানসারে!
কিডনির ঠিক উপরে অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির বাইরের স্তরে গজিয়ে ওঠা বিরল ধরনের ক্যানসার ‘অ্যাড্রেনোকর্টিক্যাল কার্সিনোমা’। বিশ্বে গড়ে প্রতি ১০ লক্ষের মধ্যে ১ জন এই ক্যানসারে আক্রান্ত হন। কারণ অজানা! গবেষকদের অনুমান অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির কোষের ডিএনএ-তে মিউটেশন (রাসায়নিক বদল) ঘটার কারণে ক্যানসার হয়।
‘অ্যাড্রেনোকর্টিক্যাল কার্সিনোমা’ হলে হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায়। রক্তচাপ বাড়ে, মহিলাদের ক্ষেত্রে ঋতুস্রাব অনিয়মিত হয়ে পড়ে, সারা মুখে রোম গজাতে থাকে, পেটে ব্যথাও হয়।
মেলানোমা ত্বকে হয়, কিন্তু চোখের ভিতরেও যখন মেলানোসাইট কোষ গজায় তখন দৃষ্টি ঝাপসা হতে থাকে। চোখের ভিতরে টিউমার তৈরি হয় যার নাম ‘অকুলার মেলানোমা’। চোখের ক্যানসারের অতি বিরল রূপ যা প্রাপ্তবয়স্কদেরই বেশি হয়।
চোখের মণি বা কালো অংশে খুব গাঢ় রঙের ‘স্পট’ তৈরি হয়। মূলত কনজাঙ্কটিভা আক্রান্ত হয়, এতে চোখে যন্ত্রণা হয়। দৃষ্টিশক্তি কমতে থাকে। চোখের সামনে আলোর ঝলকানি দেখা যায়। বা মনে হয় কোনও বিন্দু ভেসে রয়েছে। টিউমার খুব বড় হয়ে গেলে চোখ প্রতিস্থাপন করা ছাড়া গতি থাকে না।
‘মেসোথেলিয়োমা’-র নাম প্রায় অজানা। ফুসফুস, পেট অথবা হৃৎপিণ্ডের চারপাশের পাতলা আবরণী বা মেসোথেলিয়ামে টিউমার তৈরি হয়। দীর্ঘ দিন ধরে নির্মাণস্থল, অ্যাসবেস্টস বা অভ্র খনিতে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের এই ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা বেশি।
প্রাথমিক অবস্থায় এই ক্যানসার চিহ্নিত করা কঠিন। শ্বাসকষ্ট, বুকে তীব্র ব্যথা, অনবরত কাশি এবং হঠাৎ ওজন কমে যাওয়াকে ফুসফুসের রোগ বা অন্য অসুখ বলেই ভ্রম হয়। বর্তমান সময়ে ইমিউনোথেরাপিতে এর চিকিৎসা করার উপায় খুঁজে পাওয়া গিয়েছে।
চোখের ক্যানসার হতে পারে শিশুদেরও। তা অতি বিরল এবং বিপজ্জনক। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর নাম ‘রেটিনোব্লাস্টোমা’। কেন হয় সে কারণ অজানা, অনুমান জিনগত কারণ থাকতে পারে। পাঁচ বছরের নীচে শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হয়। এই ক্যানসার হলে দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি চলে যেতে পারে।
দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সে (এমস) রেটিনোব্লাস্টোমা নিরাময়ে নতুন এক অস্ত্রোপচারের পদ্ধতি নিয়ে এসেছে যার নাম ‘গামা নাইফ রেডিয়োসার্জারি’। এই পদ্ধতিতে গামা রশ্মির সাহায্য চোখের টিউমার নির্মূল করার চেষ্টা করা হবে। গামা রশ্মি কেবলমাত্র রেটিনায় থাকা টিউমারকে নষ্ট করবে, চারপাশের সুস্থ কোষগুলিতে এর কোনও প্রভাবই পড়বে না।
ত্বকের ক্যানসারের বিরল রূপ ‘মার্কেল সেল কার্সিনোমা’। ত্বকের ঠিক নীচের স্তরে ক্যানসার কোষ তৈরি হয় এবং সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। রোদে বেশি থাকলে সূর্যের অতিবেগনি রশ্মির প্রভাবে ক্যানসার আরও বেড়ে যেতে পারে।
ত্বকে লাল, বেগনি রঙের শক্ত, ব্যথাহীন মাংসপিণ্ড তৈরি হয়। মাথার ত্বকেও আঁচিলের মতো দেখা দেয়। সাধারণ ত্বকের ক্যানসার মেলানোমার চেয়ে এটি আলাদা। এই ক্যানসারের চিকিৎসা পদ্ধতিও জটিল।
থাইরয়েড ক্যানসারের সবচেয়ে বিরল ধরন হল ‘অ্যানাপ্লাস্টিক থাইরয়েড ক্যানসার’। অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত ষাটোর্ধ্বদের হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
থাইরয়েড গ্রন্থি ফুলে ওঠে, গলায় পিণ্ডের মতো দেখা দেয়, খাবার গিলতে কষ্ট হয়। শ্বাসকষ্টও হতে পারে। গলার স্বরে আচমকা বদল আসে। সঠিক সময়ে ধরা না পড়লে এবং ক্যানসার ছড়িয়ে পড়লে রোগীর কথা বলার ক্ষমতাও চলে যেতে পারে।