আপনি কত দিন বাঁচবেন, তা বলে দেবে রক্তের এই পরীক্ষা। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
আপনি কত দিন বাঁচবেন? সুস্থ শরীরে বাঁচবেন কি? এ সব প্রশ্ন মনে এলে, একটি রক্তপরীক্ষা করিয়ে দেখা যেতে পারে। রক্তের এমন একটি পরীক্ষা আছে যা করলে আয়ু আর কত দিন সে সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা দিতে পারবেন চিকিৎসকেরা। শুধু তা-ই নয়, সুস্থ শরীরে বাঁচবেন, না দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হবেন, তার পূর্বাভাসও দেওয়া যাবে।
বার্ধক্যকে থামিয়ে দিয়ে যৌবন ধরে রেখে বাঁচার প্রয়াসই চলছে বিশ্ব জুড়ে। সে জন্যই অ্যান্টি-এজিং নিয়ে এত গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তবে যৌবন ধরে রাখতে গেলে দীর্ঘ সময় বাঁচতেও তো হবে। আর বাঁচতে হবে সুস্থ ও নীরোগ শরীরে। অসুখ বাসা বাঁধলে যৌবন ধরে রাখার কোনও চিকিৎসাই কাজে আসবে না। সে কারণে শুধু অ্যান্টি-এজিং একমাত্র আলোচনার বিষয় নয়, কত দিন আয়ু টিকে আছে সে নিয়েও নতুন করে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে। কোন ধরনের পরীক্ষায় তা ধরা পড়বে, তা নিয়েও পরীক্ষা চলছে। হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলে বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষা করছেন গবেষকেরা। তাঁরাই জানিয়েছেন, ‘ডিএনএ মিথাইলেশন’ নামে রক্তের এমন এক পরীক্ষা আছে, যা করালে আয়ুষ্কাল নিয়ে ধারণা পাওয়া যাবে। ‘নেচার এজিং’ জার্নালে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিতও হয়েছে।
কী এই ডিএনএ মিথাইলেশন?
ডিএনএ মিথাইলেশন একটি জৈবিক প্রক্রিয়া, যেখানে ডিএনএ অণুর সঙ্গে একটি মিথাইল গ্রুপ জুড়ে যায়। এটি ডিএনএ-র মূলগত গঠনে পরিবর্তন না এনেই জিনের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। প্রক্রিয়াটি খুবই জটিল। মিথাইল গ্রুপ জুড়ে গিয়ে নির্দিষ্ট কিছু জিনকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে, আবার কিছু জিনকে সক্রিয় করে তুলতেও পারে। এটিকে শরীরের ‘সুইচবোর্ড’ বলা যেতে পারে। কোন কোন জিন সক্রিয় হবে আর কোন কোনটি নিষ্ক্রিয় হবে, তার উপরেই নির্ভর করবে শরীর কতটা ভাল থাকবে। হয়তো এমন কিছু জিন আপনার শরীরে সক্রিয় হয়ে উঠল, যা ভবিষ্যতে ক্যানসার বা অটোইমিউন রোগের কারণ হয়ে উঠল, আবার এমন কিছু জিন নিষ্ক্রিয় হল যা হয়তো ক্যানসারের কারণ হতে পারত, কিন্তু তা হল না। সবটাই নির্ভর করবে ওই সুইচবোর্ডের উপরে। গবেষকেরা সেই কারসাজিটাই ধরবেন ডিএনএ মিথাইলেশন পরীক্ষার মাধ্যমে।
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শরীরের ভিতরে মিথাইলেশনের প্রক্রিয়াটিতে নানা বদল আসে। এই বদলকে বলা হয় ‘এপিজেনেটিক ক্লক’। এমন এক জৈবিক ঘড়ি, যা কোষের বয়স, জন্ম-মৃত্যু নির্ধারণ করে। অর্থাৎ, কোন কোষের মৃত্যু হবে, কোথায় নতুন কোষ জন্মাবে, শরীর কতটা বুড়িয়ে যাবে, হরমোনে কী কী বদল আসবে— সবটাই নিয়ন্ত্রণ করবে ওই ঘড়ি। সে যা সময় দেখাবে, তা থেকে জৈবিক বয়স জানা যাবে। অর্থাৎ, শরীরের ভিতরের কোষের বয়স কত হল, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি আদৌ সজীব আছে না বুড়িয়ে যাচ্ছে, তা ধরা যাবে।
ধরা যাক, কারও বয়স ৪০ বছর, কিন্তু ডিএনএ মিথাইলেশনে ধরা পড়ল তাঁর শরীরের অভ্যন্তরের জৈবিক বয়স ষাট ছুঁতে চলেছে। সময়ের আগেই তাঁর কোষ বুড়িয়ে যাচ্ছে, অঙ্গগুলি দুর্বল হচ্ছে। এ রিপোর্ট দেখে গবেষকেরা বুঝবেন, ওই ব্যক্তির আয়ু কমতে শুরু করেছে, কোনও দুরারোগ্য রোগেও আক্রান্ত হতে পারেন তিনি। আরও সূক্ষ্ম পরীক্ষায় ধরা পড়বে কী ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। ক্যানসারের আশঙ্কা, জিনগত জটিল রোগের ঝুঁকি, মৃত্যুর ঝুঁকি কতটা এবং অ্যালঝাইমার্স বা ডিমেনশিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও ধরা পড়বে এই পরীক্ষায়। গবেষকেরা জানাচ্ছেন, ডিএনএ মিথাইলেশন পরীক্ষার আরও উন্নত পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চলছে, যা অকালমৃত্যুর আশঙ্কাও জানিয়ে নিতে পারবে।