জমে বরফ হবে ক্যানসার, জ্বালাপোড়া কমবে, কী এই চিকিৎসা? ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।
ডান্ডা মেরে নয়, একেবারে বরফ জমিয়ে ঠান্ডা করা হবে ক্যানসার কোষকে। না হবে তার নড়নচড়ন, না করবে তর্জন-গর্জন। স্রেফ জমিয়ে ঠান্ডা করে ক্যানসার কোষ নিধনের উপায় পেয়েছেন গবেষকেরা। এতে কাটাছেঁড়ার ভয় নেই, রক্তপাত হবে না এক ফোটাও। কেমোথেরাপি বা রেডিয়োথেরাপির মতো আগুনে রশ্মি ঢুকবে না শরীরে। শুধু রোগী বুঝবেন, তাঁর শরীর জুড়ে শীতল স্রোত বয়ে যাচ্ছে। জ্বালাপোড়ার জায়গাগুলি ঠান্ডা হচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই থেরাপির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ক্রায়োঅ্যাবলেশন’, যা ক্রায়োথেরাপিরই এক বিশেষ ধরন।
ক্যানসারকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করার নানা পদ্ধতিই এসেছে এত দিন। কিন্তু এতে শত্রুনাশ যেমন হয়, তেমন সুস্থ কোষেরও ক্ষতি হয় বিস্তর। একটি কোষকে পোড়াতে গিয়ে, পুড়ে যায় চারপাশের নিরীহ কোষগুলিও। দহনজ্বালা সইতে হয় গোটা শরীরকেও। তাই জ্বালানো বা পোড়ানোর দিকে আর যেতে চাইছেন না গবেষকেরা। বদলে এখন লক্ষ্য হাড়হিম ঠান্ডায় আক্রান্ত কোষগুলিকে জমিয়ে বরফ করে দেওয়া। এতে সাপও মরবে, আবার লাঠিও ভাঙবে না। টিউমার জমে বরফ হয়ে নিষ্ক্রিয় হবে, তার আশপাশের কোষও শীতল হবে।
‘তেড়েমেরে ডান্ডা, করে দিই ঠান্ডা’
ডান্ডার বদলে গবেষকেরা বেছে নিয়েছেন সূক্ষ্ম সুচ। তার মধ্যে দিয়ে তরল নাইট্রোজেন ঢুকে যাবে ক্যানসার কোষে। আর হিমাঙ্কের নীচের তাপমাত্রায় জমে বরফ হয়ে যাবে প্রতিটি ক্যানসার কোষ। জন্স হপকিন্স ইউনিভার্সিটি, স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ক্রায়োঅ্যাবলেশন নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে। থেরাপিটি মানুষের শরীরে প্রয়োগও করা হচ্ছে। এমন থেরাপি এ দেশেও হয়।
ক্রায়োঅ্যাবলেশনের প্রক্রিয়া ক্রায়োথেরাপির মতোই। চিকিৎসকেরা একে ফ্রিজ় থেরাপিও বলেন। কিডনি, লিভার, ফুসফুস, স্তন এবং হাড়ের ক্যানসারের চিকিৎসায় এর প্রয়োগ করা হচ্ছে। প্রথমে আলট্রাসাউন্ড ও সিটি স্ক্যানের সাহায্যে টিউমারের সঠিক অবস্থান নির্ণয় করা হয়। তার পর খুব সূক্ষ্ম সুচ ফুটিয়ে তরল নাইট্রোজেন, হিলিয়াম বা আর্গন গ্যাস টিউমারে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে। এই তরল গ্যাসের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের চেয়েও ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও কম। ফলে টিউমারের চারপাশে বরফের গোলক তৈরি হবে। তরল গ্যাস ক্যানসার কোষের যত ভিতরে ঢুকতে শুরু করবে, ততই তা জমতে থাকবে। শেষে ক্যানসার কোষের ভিতরে ও বাইরে বরফের ক্রিস্টাল তৈরি হবে। এই ক্রিস্টাল এমন প্রাচীর তৈরি করবে, যা ভেদ করে রক্ত ও শরীরের পুষ্টি উপাদান কোষগুলিতে পৌঁছোতে পারবে না। ফলে একটা সময়ে গিয়ে কোষগুলি নিস্তেজ হয়ে পড়বে, তাদের বাইরের আবরণী বা কোষের পর্দা ফেটে যাবে ও কোষগুলি বিভাজিত হতে না পেরে নষ্ট হতে থাকবে।
কেন লাভজনক ক্রায়োঅ্যাবলেশন?
কাটাছেঁড়া নেই বলে অস্ত্রোপচারের পরবর্তী যন্ত্রণা কম হবে। ক্যানসার চিকিৎসক শুভদীপ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, এই থেরাপিতে শরীরের ভিতরে কোনও রশ্মি ঢুকবে না, তাই সুস্থ কোষগুলির ক্ষতি হবে না। তরল নাইট্রোজেন বা অন্য গ্যাস এত কম মাত্রায় ঢোকানো হবে, যার কোনও ক্ষতিকর প্রভাব শরীরে পড়বে না। এই থেরাপির একমাত্র উদ্দেশ্য হল ক্যানসার কোষকে জমিয়ে বরফ করে ধ্বংস করে দেওয়া। শুধু সেই কাজটুকুই করা হবে।
কিডনির টিউমারের ক্ষেত্রেও এই থেরাপিটি বিশেষ ভাবে উপযোগী বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। রোগীদের উপর পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, ক্রায়োঅ্যাবলেশনে টিউমারকে জমিয়ে তার অপসারণও সম্ভব হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, চিরদিনের মতো ক্যানসার ফিরে আসার পথটিকেও বন্ধ করে দেওয়া গিয়েছে। এই থেরাপির কারণে রোগীর আর ডায়ালিসিস করার প্রয়োজনও হয়নি। গবেষকেরা জানিয়েছেন, স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় থেরাপিটি করলে ফের ক্যানসার ফিরে আসার আশঙ্কা কমবে। চিরকালের মতো রোগমুক্তি ঘটবে।