কান্নাকাটি করছে না নবজাতক শিশুটি, কিন্তু তা সত্ত্বেও তার চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রুধারা বয়ে চলেছে, এমন সমস্যা অনেক সময়েই দেখা যায়। শুধু শিশুদের নয়, বয়স্করাও এই সমস্যার সম্মুখীন হন। কোনও কারণে নেত্রনালির পথ অবরুদ্ধ হলে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ার মতো সমস্যার সূত্রপাত হয়। একে ডাক্তারি ভাষায় বলে টিয়ার ডাক্ট ডিসফাংশন।
টিয়ার ডাক্ট ডিসফাংশন আসলে কী
টিয়ার ডাক্ট বা নাসোলাক্রিমাল ডাক্ট বা নালি চোখের ড্রেনেজ সিস্টেমের একটি অংশ। এই নেত্রনালি চোখ থেকে নাকের ভিতরে অশ্রু বহন করে, তার পরে তা গলা দিয়ে নেমে যায়। “টিয়ার ডাক্ট বিভিন্ন কারণে বাধাপ্রাপ্ত হলে, চোখের জল নেত্রনালি দিয়ে স্বাভাবিক ভাবে বয়ে যেতে পারে না। তখন অতিরিক্ত জল চোখ দিয়ে বাইরে উপচে পড়ে। এই বাধা চিকিৎসার মাধ্যমে সারিয়ে ফেলা যায়। কিন্তু এই বিষয়টিকে অবহেলা করলে ক্রমাগত জল পড়া থেকে চোখে সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে,” বললেন চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শুভ্রাংশু সেনগুপ্ত। অশ্রুগ্রন্থির বৈকল্য অনেক সময়ে শিশুদের মধ্যে, বিশেষ করে নবজাতকের মধ্যে দেখা যায়। তবে বয়স্করাও এই সমস্যায় ভোগেন।
এই ধরনের সমস্যায় চোখ দিয়ে সব সময়ে জল পড়বে। চোখের কোণ ফুলে যাবে এবং ব্যথা হতে পারে। ক্রমাগত জল পড়ায় চোখ জ্বালা করে বা লাল হতে পারে। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যেতে পারে।
শিশুদের অশ্রুগ্রন্থিতে বৈকল্য
এই প্রসঙ্গে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. প্রভাসপ্রসূন গিরি বললেন, “এটা জন্মগত কারণে হয়। বাবা-মা কারও হলে যে তাঁদের সন্তানদেরও হবে এমন নয়। বাচ্চাদের এই সমস্যা হলে চিন্তার কিছু নেই। চিকিৎসা পেলে ৯৫ শতাংশ শিশু সেরে যায়।” এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের দায়িত্ব অনেকটাই। কোনও সমস্যা হলে ছোটরা তা স্পষ্ট করে বলতে পারে না। তাই বাচ্চার চোখ দিয়ে অকারণে জল পড়ছে কি না তা অভিভাবকদেরই নজরে রাখতে হবে। এই ধরনের সমস্যা চোখে পড়লে দেরি না করে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। কারণ ক্রমাগত চোখ দিয়ে জল পড়তে থাকলে সংক্রমণ হতে পারে। “একটু বড় শিশুদের মধ্যেও এই সমস্যা দেখা যায়। তবে সেটা জন্মগত কারণে নয়, সংক্রমণ বা ড্যাক্রিয়োসিস্টাইটিস থেকে হয়। এটা অশ্রুগ্রন্থির একটি সংক্রমণ, যা সাধারণত নাসোলাক্রিমাল নালিকে অবরুদ্ধ করে দেয়,” বললেন ডা. গিরি।
যাদের জন্মগত ভাবে অশ্রুগ্রন্থি বন্ধ থাকে, তাদের নাকের পাশে আঙুল দিয়ে মাসাজ করতে বলা হয়। কী ভাবে মাসাজ করতে হবে তা শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ দেখিয়ে দেন। “আমরা যে ভাবে দেখিয়ে দিই, সে ভাবে রোজ ১০-১২ বার মাসাজ করতে হয়। রাতারাতি নয়, কয়েক মাস ঠিক মতো মাসাজ করলে টিয়ার ডাক্ট খুলে যায়। যত দিন না খোলে, চোখ দিয়ে জল পড়লে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দিতে বলা হয়। কোনও আই ড্রপ দেওয়া হয় না, যদি না বাচ্চার চোখ লাল হয়ে যায়। যাদের মাসাজ করা সত্ত্বেও ব্লক খোলে না তাদের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার করতে হয়। তবে এদের সংখ্যা বেশ কম। আর যাদের সমস্যা জন্মগত নয় সংক্রমণ থেকে হয়, তাদের অ্যান্টিবায়োটিক, আই ড্রপ এবং কিছু ক্ষেত্রে চোখের মলম দেওয়া হয়,” বললেন ডা. গিরি।
প্রাপ্তবয়স্কদের সমস্যা
মধ্যবয়স্ক বা বয়স্কদের চোখেও সংক্রমণ থেকে এই সমস্যা হয়। ক্রমাগত চোখ দিয়ে জল পড়ে। বয়স্করা বুঝতে পারলেও অনুমান করতে পারেন না আসলে সমস্যাটি কোথায়। “সাধারণ ভাবে মানুষের পক্ষে এটা বোঝা সম্ভব নয় যে টিয়ার ডাক্ট ডিসফাংশন থেকে নাকি অন্য কারণে চোখ দিয়ে জল পড়ছে। যেমন এখন চোখ দিয়ে জল পড়ার অন্যতম কারণ বায়ুদূষণ। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের জন্য ড্রাই আইজ়ের সমস্যাতেও চোখ থেকে জল পড়ে,” বললেন ডা. সেনগুপ্ত। অনুমান করতে না পারার জন্য, প্রথমেই কেউ চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে যাওয়া প্রয়োজন মনে করেন না, বাজারচলতি আই ড্রপ ব্যবহার করেন। তাতে সমাধান না হলে তবেই চিকিৎসকদের কাছে যান। এই প্রসঙ্গে ডা. সেনগুপ্ত বললেন, “বড়দের ক্ষেত্রে কিন্তু অনেক সময়েই মাসাজ করে সমাধান করা যায় না। তখন অস্ত্রোপচার করতে হয়। তার আগে অবশ্য অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ বা মলম দিয়ে সংক্রমণ কমিয়ে নেওয়া হয়। তার পরে সিরিঞ্জিংয়ের মাধ্যমে দেখে নেওয়া হয় অস্ত্রোপচার করার মতো অবস্থা আছে কি না। তাই যত আগে আসা যাবে, তত তাড়াতাড়ি সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।”
কয়েকটি ভুল ধারণা
নবজাতক হোক বা বয়স্ক ব্যক্তি, টিয়ার ডাক্ট ডিসফাংশন ভয়ঙ্করকিছু নয়। তবে ঠিক সময়ে চিকিৎসা করালে চোখ সুস্থ থাকবে, দৃষ্টিওস্বচ্ছ হবে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে