শব্দেই জব্দ পারকিনসন্স। প্রতীকী ছবি।
পারকিনসন্স নামটি পরিচিত। তবে রোগটি কী, তা বোধগম্য না-ও হতে পারে। সহজ করে বললে, এটি স্নায়ুর এমন অসুখ যা এক বার হলেই হাত-পা কাঁপা, কথা জড়িয়ে যাওয়া, হাঁটাচলা করার সমস্যা শুরু হয়। স্নায়ুর রোগটিকে আগে থেকে চেনা সহজ নয়। ধরা তার চেয়েও বেশি কঠিন। এর উপযুক্ত চিকিৎসা নেই, ওষুধ নিয়ে রোগটিকে নির্মূল করা যায় না। পারকিনসন্সের রোগীর জীবনের একটা বড় পর্যায় কেটে যেতে পারে হুইলচেয়ারে বন্দি অবস্থায়। এমন জটিল ও দুরারোগ্য রোগও যে নির্মূল করা যেতে পারে, তা নিয়ে বিশ্ব জুড়েই মাথা ঘামাচ্ছেন গবেষকেরা। এক উপায় বেরিয়ে এসেছে। তা হল শব্দশক্তি। অস্ত্রোপচার নয়, খুলিতে কাটাছেঁড়া নয়, ওষুধ নয়— কেবল শব্দের তাণ্ডবেই জব্দ হবে স্নায়ুর রোগ। মগজে পাঠাতে হবে শব্দতরঙ্গ। তার ধাক্কাতেই নষ্ট হয়ে যাওয়া স্নায়ুগুলি ধ্বংস হবে।
শব্দেই জব্দ স্নায়ুর ব্যাধি
চিকিৎসাটির নাম ‘ফোকাসড আলট্রাসাউন্ড’। মগজের যে অঞ্চলের স্নায়ুগুলি জট পাকিয়ে শরীরে কাঁপুনি জাগায় ও স্মৃতিশক্তি ঝাপসা করে দেয়, সেই স্নায়ুগুলিকে কব্জা করাই লক্ষ্য। তবে স্নায়ুকে বাগে আনা সহজ নয়। খুলি ভেদ করে স্নায়ুর ‘সার্কিট’ অবধি পৌঁছোনো যথেষ্টই কঠিন। কিছু ক্ষেত্রে অসম্ভবও বটে। সেই কাজই করবে শব্দতরঙ্গ। শব্দের জোর কতটা, তা আলাদা করে বলে দিতে হয় না। তাই শব্দ দিয়েই ঝাপটা দেওয়া হবে স্নায়ুর জটকে। উচ্চ কম্পাঙ্কের কিছু শব্দতরঙ্গকে খুলির শক্ত আবরণ ভেদ করে পাঠানো হবে মগজের অন্দরে। সেই তরঙ্গ নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে তালগোল পাকিয়ে থাকা স্নায়ুকে সঠিক পথে আনবে। ক্ষতিগ্রস্ত স্নায়ুর কোষকেও নষ্ট করবে। মস্তিষ্কের যে এলাকার কোষ নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়ে স্মৃতিশক্তি দুর্বল করে দিয়েছিল, সেগুলিকে জাগিয়ে তোলাও হবে এর কাজ।
দু’ভাবে হবে শব্দের চিকিৎসা। একটি ‘থার্মাল অ্যাবলেশন’। একাধিক শব্দতরঙ্গ এমন ভাবে মগজে পাঠানো হবে যাতে সুস্থ কোষের ক্ষতি না হয়। সমস্ত তরঙ্গ একত্রিত হয়ে তাপ উৎপন্ন করবে, যা ক্ষতিগ্রস্ত স্নায়ুকোষগুলিকে ধ্বংস করবে।
দ্বিতীয় পদ্ধতি হল মস্তিষ্কের রোগাক্রান্ত জায়গাটিতে ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। মস্তিষ্কের রক্তনালিগুলির দেওয়ালে একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা প্রাচীর থাকে, যাকে ‘ব্লাড-ব্রেন ব্যারিয়ার’ বলে। এই আস্তরণ এতটাই মজবুত যে, তা ভেদ করে ওষুধ বা অ্যান্টিবডি স্নায়ু অবধি পৌঁছোতে পারে না। শব্দের কাজ হবে জোরালো ধাক্কায় এই প্রাচীরকে সাময়িক ভাবে আলগা করে দেওয়া, যাতে সঠিক পথে ওষুধ বা অ্যান্টিবডি মগজে পৌঁছে দেওয়া যায়। এর সুবিধা হল, মস্তিষ্কে কাটাছেঁড়া করার প্রয়োজন হবে না। খুলিতে ছিদ্র করলে বা কেটে সেই প্রাচীর আলগা করার চেষ্টা করলে রোগীর বিপদ বাড়তে পারে। সেই কাজই শব্দতরঙ্গ দিয়ে করা হবে।
ফোকাসড আলট্রাসাউন্ডের গবেষণা বিশ্বের অনেক জায়গাতেই হচ্ছে। আমেরিকার ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালযয়ের স্কুল অব মেডিসিন এবং কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এই পদ্ধতিতে পারকিনসন্স শুধু নয়, মস্তিষ্কের অন্য জটিল স্নায়বিক ব্যাধি নিরাময়েরও চেষ্টা করছেন। কিছু ক্ষেত্রে সাফল্য এসেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।