রক্তল্পতায় শিশুর পাতে কী কী থাকতে হবে? ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।
বেশ কয়েক বছর আগে, কেন্দ্রীয় সরকারের নানা সমীক্ষায় উঠে এসেছিল, দেশের এক বড় অংশের শিশুর আনাহার এবং অপুষ্টির কথা। শিশুদের সেই অপুষ্টির অভাব দূর করতে, তখন সরকারের তরফ স্কুলে স্কুলে শুরু হয়েছিল মধ্যাহ্নকালীন আহার বা মিড-ডে মিল কর্মসূচি। এই রক্তাল্পতায় ভোগার কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা গিয়েছে, এর একটি বড় অংশের জন্য দায়ী আয়রন ও ফলিক অ্যাসিডের অভাব। এই ঘাটতি মেটাতে ‘উইকলি আয়রন ফলিক অ্যাসিড সাপ্লিমেন্টেশন’ কর্মসূচিও চালু হয়েছে। তবে চিকিৎসকেরা বলছেন, কেবল ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট নয়, শিশুর রক্তল্পতা দূর করতে হলে তার খাওয়াদাওয়ায় নজর দেওয়া সবচেয়ে বেশি জরুরি। কেবল যে প্রত্যন্ত এলাকার শিশুরা অপুষ্টিজনিত রক্তল্পতায় ভুগছে তা নয়, শহরাঞ্চলেও এর হার বেশি। এর কারণ হল সঠিক পুষ্টির অভাব। বাবা-মায়েরা শিশুর স্বাস্থ্য ভাল হবে ভেবে হয়তো প্রচুর পরিমাণে খাওয়াচ্ছেন, কিন্তু ঠিক কোন কোন খাবার বাড়ন্ত বয়সের শিশুর জন্য জরুরি, তা নিয়ে সঠিক ধারণা নেই।
দেশের ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেল্থ সার্ভের রিপোর্ট (২০১৯-২১) বলছে, এ দেশে তিন থেকে পাঁচ বছর ও তার নীচের প্রায় ৬৭ থেকে ৭১ শতাংশ শিশু রক্তাল্পতায় ভুগছে। জন্মের পর তিন মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর শরীরে যেটুকু হিমোগ্লোবিন থাকে, তা সে তার মায়ের কাছ থেকেই নিয়ে আসে। এর পর তার নিজের শরীরের অস্থিমজ্জায় রক্ত তৈরি হতে শুরু করে। সাধারণত ৬ মাস থেকে ২ বছর বয়স অবধি শিশুর রক্তে হিমোগ্লোবিনের স্বাভাবিক মাত্রা থাকা উচিত প্রতি ডেসিলিটারে ১০.৫ থেকে ১৩.৫ গ্রাম। ২ বছরের পর থেকে ১২ বছর অবধি প্রতি ডেসিলিটারে ১১.৫ থেকে ১৫.৫ গ্রাম। এর চেয়ে কম হয়ে গেলেই তখন রক্তাল্পতার লক্ষণ দেখা দেবে। শিশু দুর্বল হয়ে পড়বে, খিদে কমে যাবে, মুখ-চোখ ফ্যাকাশে দেখাবে। ওই বয়স থেকে তাই শিশুকে পরিপূরক খাবার খাওয়ানোও জরুরি, যার মধ্যে আয়রন সমৃদ্ধ খাবার থাকতেই হবে।
রক্তাল্পতায় শিশুর ডায়েট
প্রাণিজ ও উদ্ভিজ্জ খাদ্য উৎস থেকে আয়রন পাওয়া যায়। মাছ, মাংস, ডিম থেকে যে আয়রন পাওয়া যায়, তাকে ‘হিম’ আয়রন বলে। আর উদ্ভিজ্জ উৎস যেমন ড্রাই ফ্রুট, ডুমুর, বাদাম, কিশমিশ, সবুজ শাকসব্জি থেকে প্রাপ্ত আয়রনকে বলে ‘নন-হিম’ আয়রন। শরীর দু’রকম আয়রনই ভাল শোষণ করতে পারে।
সকালের জলখাবারে শিশুকে দেওয়া যেতে পারে দুধ-ওট্স। আয়রন ও ফাইবার সমৃদ্ধ ওট্স শিশুর শরীরের জন্য ভাল। গরুর দুধে অ্যালার্জি থাকলে কাঠবাদামের দুধ বা দই দিয়ে ওট্স দিতে পারেন।
এর এক ঘণ্টা পরে ভাল করে সেদ্ধ করা ডিম ও যে কোনও এক প্রকার মরসুমি ফল দিতে হবে। ফলের মধ্যে আপেল, ন্যাসপাতি, বেদানা, কলা থাকলে ভাল।
দুপুরের খাবারে ভাত বা খিচুড়ি, যা-ই দিন না কেন, সঙ্গে গাজর, বিন,বিট, ব্রকোলি বা পালংশাকের মতো সব্জি রাখতে হবে। এই সব্জিগুলি আয়রন সমৃদ্ধ। ছোট মাছ, মাংসের মেটেতেও আয়রন থাকে। যদি শিশু মাছ খেতে না চায়, তা হলে সয়াবিন দিতে পারেন। অথবা বাড়িতে তৈরি ছানাও উপকারী।
১ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সের শিশুদের রোজ ভিজিয়ে রাখা খেজুর ও কিশমিশ খাওয়াতে পারলে ভাল। এতে রক্তল্পতার ঝুঁকি অনেক কমে যাবে।
মা-বাবারা খেয়াল রাখবেন, শুধু শরীর যাতে তা গ্রহণ করতে পারে সে জন্য লেবু, আমলকি বা কমলালেবুর মতো ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল বা সব্জিও রাখতে হবে রোজের পাতে।
ছোট থেকে বেশি চা বা কফি খাওয়ানোর অভ্যাস করবেন না। চা বা কফি আয়রন শোষণে বাধা দেয়। বদলে ঘরে তৈরি ডিটক্স পানীয় বা ওট্স-কাঠবাদাম-খেজুর বেটে তৈরি স্মুদি খাওয়ালে উপকার বেশি হবে।