গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
মনের কথা মুখ ফুটে বলতে পারাই কি সাহসিকতা? কেউ বলতে না পারলে কি তাঁকে ভীতু বলা হবে? যাঁরা মুখচোরা, আবেগ সরাসরি প্রকাশ করতে পারেন না, তাঁরা কি আদতে দুর্বল? বলিউডের অভিনেতা রণবীর কপূর সেই দলে পড়েন। একা তিনিই বা কেন, তাঁর মতো মনের কথা মুখ ফুটে বলতে পারেন না অনেকেই। তাঁদের কি সেই স্বভাব পাল্টানো দরকার?
এক পডকাস্টে রণবীর খোলাখুলিই কথা বলেছেন নিজের আবেগ প্রকাশের কুণ্ঠাবোধ নিয়ে। রণবীর বলেছেন, ‘‘আমি খুব আবেগপ্রবণ মানুষ নই। বরং আমার মধ্যে সব কিছু চেপে রাখার একটা প্রবণতা রয়েছে। আমি তাতেই অভ্যস্ত। তার মানে এই নয় যে, আমি কিছু অনুভব করি না।’’ আবেগ প্রকাশের অক্ষমতা প্রসঙ্গে রণবীরের যুক্তি, তিনি সবই গভীরভাবে অনুভব করেন, কিন্তু গুছিয়ে বলতে হবে কী ভাবে, অনেক সময়ে তা বুঝতে পারেন না। তাই বেশির ভাগ সময়ে চুপ করে থাকাই শ্রেয় বলে মনে করেন। একান্তে ওই সব চেপে রাখা আবেগই তাঁর সঙ্গী হয়। তাদের নিয়ে এক অন্য রকমের একলাযাপন করেন তিনি।
মনোবিজ্ঞান বলছে, রণবীরের এই অভ্যাসের একটি নাম রয়েছে। ‘ইমোশনাল মিনিমালিজম’, যা আসলে আবেগ লুকিয়ে রাখার প্রবণতার কথা বলে।
ইমোশনাল মিনিমালিজ়ম কী?
প্রত্যেকের আবেগ প্রকাশের ধরন আলাদা হয়। কেউ কথা বলে হালকা হন, আবার কেউ নিজের অনুভূতিগুলো নিজের মধ্যেই গুটিয়ে রেখে দিতে ভালোবাসেন। এই দ্বিতীয় ধরনের অভ্যাস কিন্তু কোনও মানসিক সমস্যা নয়। বরং বলা ভাল, এমনটা তাঁদেরই হয়, যাঁরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটু বেশিমাত্রায় সচেতন। যাঁরা নিজের সমস্ত আবেগ হুড়মুড়িয়ে বলে ফেলার বদলে একটু থামেন। ভাবেন, তা বলার আদৌ কোনও দরকার আছে কি না। বলে ফেললে কি প্রতিক্রিয়া আসতে পারে। সেই প্রতিক্রিয়ার কোনও প্রয়োজন তাঁর জীবনে আছে কি না। অথবা যে ভাবে বলছেন, তা উল্টো দিকের মানুষটি ঠিক সেই ভাবেই বুঝবেন কি না। খুব গভীর অনুভূতিতে ভেসে যেতে পারেন ভেবে ভয়ও পান অনেকে। এমনই নানা চিন্তা এবং তজ্জনিত অতিসচেতনতার ফলে আবেগ নিজের মনের মধ্যে চেপে রাখেন অনেকেই। যদিও বা প্রকাশ করেন, তবে নানা প্রশ্নের ছাঁকনির মধ্যে ফেলে বলেন। ফলে যা ভাবছেন, তার কণামাত্রই দেখা যায় বাইরে। এমন সমস্যাকেই বলা হয় ইমোশনাল মিনিমালিজ়ম।
এই অভ্যাস কি সমস্যার?
১। সোশ্যাল মিডিয়ার মানুষ ইদানীং সব কিছু উজাড় করে প্রকাশ করছেন। প্রতিটি অনুভূতির কথা লিখে ভরিয়ে তুলছেন সমাজমাধ্যমের দেওয়াল। খাওয়াদাওয়া, বেড়ানো, ভালবাসা, রাগ-ঝগড়ার মুহূর্তের ছবি-ভিডিয়োও বাদ যাচ্ছে না। এমন যখন ‘ট্রেন্ড’, তখন নিজেকে যাঁরা প্রকাশ করেন না, তাঁদের উপর প্রকাশ করার একটা প্রচ্ছন্ন চাপ থাকেই।
২। যদি কেউ অনুভূতি এড়ানোর জন্য চুপ থাকেন, তবে তা তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। কিন্তু যদি দৈনন্দিন জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে বা নিজেকে সামলে নিতে শান্ত থাকেন, তবে তা সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যকর।
৩। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই সব বিষয়ে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে চুপ করে থাকাই পছন্দ করেন। তবে তাতে তাঁকে আবেগহীন ভাবলে ভুল করা হবে। বরং ওই চুপ করে থাকাকে মানসিক পরিপক্বতা বা ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বলেই মনে করা হয়।
৪। সব আবেগ মুখে প্রকাশ করতে হবে— তার কোনও নিয়ম নেই। একা থাকা, শান্ত থেকে নিজের আবেগ অনুভব করা, সব জায়গায় সব কথা না বলার মধ্যে আদতে একরকমের মানসিক শক্তিরই প্রকাশ হয়। তাই পরিণত বয়সে পৌঁছেও যদি কেউ কম কথা বলেন, তবে তা সমস্যা নয় বরং বিচক্ষণতারই প্রকাশ।