গর্ভপাত ও গর্ভনিরোধক বিষয়ে অনেকেরই নানা ভ্রান্ত ধারণা থাকে, যা থেকে বিপদের আশঙ্কা বাড়ে। সে বিষয়ে আলোচনা করলেন বিশেষজ্ঞরা
গর্ভপাত— শব্দটির সঙ্গে আজও জড়িয়ে আছে লজ্জা, সম্মানহানির ভয়। যদিও ভারতে ২০২২ সালে সুপ্রিম কোর্ট বিবাহিত ও অবিবাহিতদের মধ্যে পার্থক্য তুলে দিয়ে সকলের জন্যই গর্ভপাতের সময়সীমা ২৪ সপ্তাহের মধ্যে বৈধ বলে ঘোষণা করেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিবাহিত নারীই যেহেতু সন্তান ধারণ করেন, তাই এই আইন হয়েছিল শুধু বিবাহিতাদের জন্য। কিন্তু আমাদের দেশ একক মাতৃত্বকে স্বীকৃতি দেয়। তাই এই পার্থক্য তুলে দেওয়া হয়েছে। একজন মহিলা শারীরিক কারণে বা প্রয়োজনে স্বেচ্ছায় চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে গর্ভপাত করাতে পারবেন।
আইন করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু অধিকাংশই এই আইন সম্পর্কে সচেতন নন। আজও ভারতের অধিকাংশ মহিলা-পুরুষ যৌনতার পাঠ নিতে বা এই বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে অস্বস্তিবোধ করেন। তাই অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভপাতের জন্য বহু মহিলা বিশেষ করে অবিবাহিত নাবালিকা এমন কিছু পদক্ষেপ করেন যাতে জীবনহানির ঝুঁকি থেকে যায়।
গর্ভপাতের ওষুধ
সার্জারি ছাড়াও বড়ি বা ওরাল পিলের মাধ্যমে গর্ভপাত সম্ভব। তবে গর্ভধারণের কত দিনের মধ্যে এই ওষুধ ব্যবহার করা যাবে তার নিয়ম আছে। এই বিষয়ে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. চন্দ্রিমা দাশগুপ্ত বললেন, “এমটিপি (মেডিক্য়াল টার্মিনেশন অব প্রেগন্যান্সি) অ্যাক্ট অনুযায়ী গর্ভধারণের ন’সপ্তাহ বা ৬৩ দিনের মধ্যে ওরাল অ্যাবরশন পিলের মাধ্যমে গর্ভপাত সম্ভব। সেটি করতে হবে একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে। এই ধরনের পিল প্রেসক্রাইব করার আগে চিকিৎসকেরা একটা আলট্রাসনোগ্রাফি করে দেখে নেন গর্ভাবস্থা কত সপ্তাহের এবং ভ্রূণের অবস্থান। যা জরায়ুর ভিতরে হলে ঠিক আছে কিন্তু যদি এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি হয়, তা হলে অ্যাবরশন পিল প্রেসক্রাইব করা হয় না। পিল নেওয়ার নির্দিষ্ট সময় পরে রক্তপাত হয়ে গর্ভপাত হয়। ব্লিডিং টানা দু’-তিন সপ্তাহ চলতে পারে। অতিরিক্ত ব্লিডিং হওয়ার সম্ভাবনা থাকে প্রথম দিকে। ব্লিডিং বন্ধ হলে আবার আলট্রাসনোগ্রাফি করে দেখে নেওয়া হয় পুরো পরিষ্কার হয়েছে কি না। ন’সপ্তাহের বেশি দিন গর্ভধারণ করে থাকলে এই ওষুধের মাধ্যমে গর্ভপাত করা যাবে না। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সার্জিক্যাল পদ্ধতির মাধ্যমে করতে হবে।”
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নয়
আমাদের দেশে আইন আছে বিবাহিত ও অবিবাহিত মহিলার স্বেচ্ছায় গর্ভপাত করানোর। কিন্তু একজন অবিবাহিতা মেয়ে, সে নাবালিকা হোক বা সাবালিকা, গর্ভবতী হয়ে পড়লে, তাকে মানসিক ও সামাজিক ভাবে বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে সমাজে সম্মানহানির ভয়ে অবাঞ্ছিত গর্ভধারণের লজ্জা লুকোতে চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে গর্ভপাতের ওষুধ জোগাড় করে খেয়ে ফেলে তারা। “এতে বেশ ঝুঁকি আছে, বিশেষত এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি হলে। ডাক্তারের পরামর্শ না নিয়ে অ্যাবরশন পিল খেলে রক্তপাতের পরে পুরোপুরি ক্লিয়ার হল কি না সেটাও তো দেখা হচ্ছে না। ফলে কিছু রয়ে গেলে ভবিষ্যতে তা থেকে সমস্যা হতে পারে। পরে সন্তানধারণেও সমস্যা হতে পারে। এর পাশাপাশি কম বয়স থেকে একাধিক যৌনসঙ্গী থাকলে পেলভিক ইনফেকশন, ইনফার্টিলিটি প্রবলেম, যৌনরোগ, ওভারি টিউব ড্যামেজ, সারভাইক্যাল ক্যানসারের আশঙ্কা বেড়ে যায়,” বললেন ডা. দাশগুপ্ত।
গর্ভপাতের বড়ি ও গর্ভনিরোধক বড়ির মধ্যে পার্থক্য
অসুরক্ষিত যৌনসঙ্গমের পরে মহিলারা গর্ভধারণ এড়ানোর জন্য আপৎকালীন গর্ভনিরোধক বড়ি ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নিয়ে থাকেন। কিন্তু অনেকেই গর্ভপাতের বড়ি এবং গর্ভনিরোধক বড়ির মধ্যে পার্থক্য জানেন না। আবার অনেকে গর্ভধারণ এড়ানোর জন্য নিয়মিত ব্যবহার করেন এই ধরনের পিল। নিয়মিত এই ধরনের ওষুধ ব্যবহার করলে তার প্রভাব পড়ে শরীরের উপরে। এই বিষয়ে ডা. দাশগুপ্ত বললেন, “ইমার্জেন্সি কনট্রাসেপটিভ পিল ১০০ শতাংশ সুরক্ষা দেওয়ার গ্যারান্টি দেয় না। অবশ্য অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্কের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যদি এটি খাওয়া হয়, তা হলে ৯৪ শতাংশ সুরক্ষা দেয়। যদি কেউ গর্ভবতী হয়ে যান, তা হলে এই ওষুধ গর্ভধারণ আটকাতে পারে না বা গর্ভপাত ঘটাবে না। ইমার্জেন্সি কনট্রাসেপটিভ কখনওই নিয়মিত খাওয়া উচিত নয়। এতে উচ্চ মাত্রায় প্রোজেস্টেরন থাকে। নিয়মিত খেতে থাকলে ভবিষ্যতে এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসেবে মাসিক ঋতুচক্র অনিয়মিত হয়ে যেতে পারে, হরমোনাল সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।” যদি নিয়মিত কনট্রাসেপ্টিভ পিল খেতেই হয়, তা হলে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে ওরাল কনট্রাসেপ্টিভ মান্থলি পিল খাওয়া যেতে পারে, যা বেশি সুরক্ষিত। তবে যাঁরা একাধিক যৌন সম্পর্কে আছেন, তাঁরা এই ধরনের ওষুধ খেলেও তাঁদের পুরুষ পার্টনারের কন্ডোম ব্যবহার করা জরুরি। এতে যৌনবাহিত রোগের ঝুঁকি এড়ানো যায়।
আমাদের দেশে আইন ও চিকিৎসা ব্যবস্থা যথাযথ থাকলেও গোড়ায় গলদ রয়ে গিয়েছে। আজও সমাজের অধিকাংশ স্তরে অভাব উপযুক্ত যৌন শিক্ষার। অধিকাংশ বাড়িতে কমবয়সি ছেলে-মেয়েরা বাড়ির অভিভাবকের সঙ্গে যৌনতা, গর্ভধারণ, যৌনবাহিত রোগ ইত্যাদি নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতে পারে না। ফলে বহু প্রশ্ন তাদের মনের মধ্যেই উত্তরহীন অবস্থায় থেকে যায়। সামাজিক ছুঁতমার্গ শিকেয় তুলে, অকারণ অস্বস্তি ভুলে এই ব্যাপারে একটু উদ্যোগী হতে হবে অভিভাবকদের। বয়ঃসন্ধির সময় থেকে যদি প্রতিটি ছেলেমেয়েকে উপযুক্ত যৌনশিক্ষা এবং এই সংক্রান্ত আইন সম্পর্কে ঠিক তথ্য দেওয়া যায়, তা হলে একাধিক ভুল ধারণা, অযথা ভয়, লজ্জা তাদের মনে ঠাঁই পাবে না, বরং সচেতন হতে শিখবে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে