Pregnant Women

নজরে থাকুক ভ্রূণের সুস্থতা

অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গর্ভস্থ শিশুর সুস্থতা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত থাকতে করানো যেতে পারে কিছু রুটিন পরীক্ষা। রইল বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ।

চিরশ্রী মজুমদার 

শেষ আপডেট: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:০৬
Share:

গর্ভাবস্থা নিশ্চিত হওয়ার পর আনন্দের সঙ্গে আসে কিছুটা চিন্তা। সন্তানের বিকাশ ঠিক ভাবে হবে কিনা, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন হবু মা ও তাঁর পরিবার। সন্তান গর্ভে সুস্থ ও স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে উঠছে কিনা জানতে এই সময়ে বেশ কিছু পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। এর ফলে কোনও ঝুঁকি থাকলে তা আগেই শনাক্ত করা যায় ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করা যায়।

শুরুতেই যে পরীক্ষা জরুরি

গর্ভাবস্থার প্রথমে ও বিভিন্ন পর্যায়ে মায়ের রক্তপরীক্ষার মাধ্যমে শর্করার মাত্রা, থাইরয়েড বা কোনও সংক্রমণ আছে কিনা দেখা হয়। কারণ, এই ধরনের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে তা গর্ভস্থ শিশুর উপরে প্রভাব ফেলতে পারে। স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ চন্দ্রিমা দাশগুপ্ত বললেন, “১২-১৪ সপ্তাহের মধ্যে ‘কম্বাইনড ফার্স্ট ট্রিমেস্টার স্ক্রিনিং’ করাতে বলা হয়। এ ক্ষেত্রে ট্রাইজ়োমি টোয়েন্টিওয়ান (ডাউন সিনড্রোম), ট্রাইজ়োমি এইট্টিন (এডওয়ার্ড’স সিনড্রোম), ট্রাইজ়োমি থার্টিন (প্যাটাউ সিনড্রোম) এই তিনটি জিনগত খুঁত ধরা পড়ে। যদিও এ সময়ে শরীরের সব অঙ্গের গঠন সম্পূর্ণ হয় না, তবুও, স্ক্যানিং-এর মাধ্যমে ভ্রূণের শরীরে কোনও ত্রুটি রয়েছে কিনা দেখা হয়। নিউরাল টিউব ডিফেক্ট যেমন স্পাইনা বাইফিডা (এর থেকে স্নায়ুগত সমস্যা তৈরি হয়) ইত্যাদি, তলপেটের প্রাচীর ঠিকমতো তৈরি না হলে যে জন্মগত খুঁত (যেমন ওমফ্যালোসিল, এর থেকে হার্নিয়ার মতো তৈরি হয়) দেখা যায়, সেগুলি বোঝা যায়। নিউরাল টিউব ডিফেক্ট যাতে না হয়, তার জন্য চিকিৎসক আগেই ফোলিক অ্যাসিড খেতে বলে দেন।

২০-২২ সপ্তাহের মধ্যে ‘ফিটাল অ্যানাটমি আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষা’ হয়। তাতে আরও পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে শিশুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দেখা যায়। শিশুর মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ড, হৃৎপিণ্ডের গঠন ঠিক হচ্ছে কিনা খুঁটিয়ে দেখে নেন চিকিৎসক। ফুসফুস, মূত্রথলি, বৃক্ক, অন্ত্র, খুলির গঠনে কোনও বিকৃতি আছে কিনা দেখে নেওয়া হয়। দু’-এক সপ্তাহ পরে ‘ফিটাল ইকো’-র পরীক্ষা করলে হৃৎপিণ্ড ভাল ভাবে কাজ করছে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়। এই পরীক্ষাগুলোয় যদি কোনও বড়সড় সমস্যার ইঙ্গিত ধরা পড়ে যার হয়তো চিকিৎসা নেই, বা গর্ভের মধ্যেই অঘটন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে, তবে অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ করেন। প্রসঙ্গত, আইন অনুযায়ী জন্মগত খুঁতের জন্য ২৪ সপ্তাহের পরে আর ভ্রূণ নষ্ট করা যায় না।

আরও নিশ্চিত হতে

চন্দ্রিমা বললেন, “কোনও সন্দেহ হলে নন-ইনভেসিভ প্রি-নেটাল টেস্ট (এনআইপিটি) বা মায়ের রক্তপরীক্ষা করা হয় ১৬ সপ্তাহের কাছাকাছি। রুটিন পরীক্ষা না হলেও অনেক হবু মা-ই এটি করাতে চান। বাচ্চার কিছু কোষের অবস্থা মায়ের এই রক্তপরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায়। ট্রাইজ়োমি অর্থাৎ অতিরিক্ত ক্রোমোজ়োমের অস্তিত্ব, সেক্স ক্রোমোজ়োম অ্যানিউপ্লিউডি নামক সমস্যা নির্ণীত হয়। এই পরীক্ষায় সাফল্য ৯৯%-এরও বেশি, ফলস পজ়িটিভ রেট-ও কম। প্রথমে এই ধরনের ‘স্ক্রিনিং’-এর মাধ্যমে যে ভ্রূণগুলি ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের আলাদা করা হয়। তার পরেও সন্তানের কোনও জিনগত খুঁত আছে কিনা সে বিষয়ে ১০০ শতাংশ নিশ্চিত হতে অ্যামনিয়োসেন্টেসিস পরীক্ষা করতে হয়।” সন্তান যে জলে ভাসছে, মায়ের পেটে সূক্ষ্ম সূচ ঢুকিয়ে সেই জল খানিকটা বার করে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়।

২৮ ও ৩৪ সপ্তাহ নাগাদ আলট্রাসাউন্ড করে কয়েক সপ্তাহ অন্তরই বাচ্চার বাড়বৃদ্ধির উপরে নজর রাখেন চিকিৎসক। বেশি ঝুঁকি থাকলে আলট্রাসাউন্ড বারবার করা হতে পারে। তখনই বাচ্চার বিভিন্ন ধমনি যেমন আম্বিলিকাল আর্টারি, মিডল সেরিব্রাল আর্টারি, ডাক্টাস ভেনোসাস আর্টারির উপরে ডপলার (এটি রক্তের প্রবাহ ও গতি দেখতে সাহায্য করে) পরীক্ষা করা হয়। তার ফলাফল নির্দেশ করে বাচ্চার স্বাস্থ্য কেমন আছে, ফলে কখন প্রসবের সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে সেই সিদ্ধান্তগুলি নিতে সুবিধা হয়। বাচ্চার হৃদ্‌স্পন্দন ধরা পড়ে ছোট হ্যান্ডল ডপলার যন্ত্রে। এতে কিন্তু বাচ্চার স্বাস্থ্য কেমন আছে সেটা ততটা বোঝা যায় না। পেটে হাত দিয়ে, গ্রোথ স্ক্যানের সময়ে বাচ্চার অবস্থান, প্ল্যাসেন্টা ঠিক জায়গায় আছে কিনা, চিকিৎসক নজরে রাখেন। প্ল্যাসেন্টা প্রিভিয়া-র (প্ল্যাসেন্টা নীচে থাকলে) ক্ষেত্রে রক্তপাত ও জটিলতার আশঙ্কা থাকে। বিষয়টি জানা থাকলে, এগুলি প্রতিরোধ করার জন্য চিকিৎসক উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারেন।

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কার্ডিয়ো টোপোগ্রাফি বা সিটিজি। মায়ের পেটে বেল্টের মতো বেঁধে বাচ্চার হৃদ্স্পন্দনকে রেকর্ড করা হয়। ওই সময়ে বাচ্চা কেমন আছে, সেটা আর একটু পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বোঝা যায়।

প্রস্তুত থাকেন বিশেষজ্ঞরা

ডা. দাশগুপ্তের পরামর্শ, পরিবার পরিকল্পনা করলে গর্ভধারণের আগেই ‘প্রি-কনসেপশন ইনভেস্টিগেশন’ করিয়ে নিন। কী কী সমস্যা আছে বা থাকতে পারে আগে জানা গেলে মা ও সন্তানের ঝুঁকি কম থাকে। একই সঙ্গে তাঁর আশ্বাস, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় অল্পস্বল্প সমস্যা ধরা পড়লে সেটা নিয়ন্ত্রণ করার সব রকম ব্যবস্থা আছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের প্রস্তুত থাকতে বলা হয়। পেডিয়াট্রিশিয়ান, পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়োলজিস্ট সকলে হবু মাকে পরামর্শ দেন, সম্ভাব্য চিকিৎসাপদ্ধতি আলোচনা করেন। কত সপ্তাহ পর্যন্ত গর্ভাবস্থা চালানো যেতে পারে, কখন প্রসবের ব্যবস্থা করা হবে, তার পর কতটা নজরদারি লাগবে, কী ভাবে চিকিৎসা এগোবে তা স্থির করেন।

অতএব, গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ মতো পরীক্ষাগুলি করিয়ে নিলে মা ও শিশুর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত থাকবে। দেশে সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রে এই পরীক্ষাগুলি করার ও ফলাফলের উপরে ভিত্তি করে চিকিৎসা এগোনোর সব রকম সুবিধা রয়েছে। তাই সন্তানের সুস্থ ও নিরাপদ জীবনের স্বার্থে এগুলি জেনে রাখুন ও সময়মতো পরীক্ষাগুলি করিয়ে নিন।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন