Psoriasis Types

সোরিয়াসিস কি শুধুই চর্মরোগ? ত্বক থেকে হাড়ে এর অবাধ গতি, নানা ভ্রান্ত ধারণা সরিয়ে জানুন আসল সত্যি

সোরিয়াসিস নিয়ে শুধু আতঙ্কই নয়, অনেক ভুল ধারণাও আছে। রোগটি আসলে কী, কেন হয় সে নিয়ে বিভ্রান্ত না হয়ে আসল কারণ জেনে রাখা জরুরি। সোরিয়াসিসের নানা রকম চিকিৎসাপদ্ধতিও বেরিয়ে গিয়েছে এখন। সেগুলির কয়েকটি বেশ কার্যকর বলেও প্রমাণিত হচ্ছে।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:০৪
Share:

সোরিয়াসিস কি ছোঁয়াচে? এই রোগ কি সারে? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

সোরিয়াসিস কী ও কেন হয়, এই নিয়ে প্রশ্ন অনেক। সাধারণ ফুস্কুড়ি বা র‌্যাশ নিয়ে লোকজন তেমন মাথা ঘামান না। কিন্তু সোরিয়াসিসের নাম শুনলেই অজানা এক আতঙ্ক চেপে বসে মনে। রোগটি যে প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক, তা আর বলে বোঝানোর কিছু নেই। এক সময়ে রোগটি নিয়ে তেমন আলোচনা না হলেও, এখন সোরিয়াসিস বেশ পরিচিতই ত্বকের একটি অসুখ। ইন্টারনেটের দৌলতে রোগটি নিয়ে নানা কথাও কানে আসে। কেউ ভাবেন সোরিয়াসিস ছোঁয়াচে, কেউ ভাবেন রোগটি এক বার জাঁকিয়ে বসলে আর কস্মিনকালেও কমবে না। নানা রকম ভ্রান্ত ধারণাও আছে সোরিয়াসিস নিয়ে। হাতে, কনুইয়ে, ঘাড়ের কাছে বা মাথায় ওই রকম রুপোলি আঁশের মতো চমড়া উঠতে শুরু করলে যতটা না জ্বালা হয়, তার চেয়েও বেশি অবসাদ আসে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগেন অনেকে। তবে জেনে রাখা ভাল, সোরিয়াসিস রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার নানা রকম চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। সেগুলির কয়েকটি বেশ কার্যকর বলেও প্রমাণিত হচ্ছে।

Advertisement

সোরিয়াসিস আসলে কী?

কোনও সংক্রমণজনিত রোগ নয়। ত্বকের ভুল পরিচর্যার কারণেও হয় না। ত্বক চিকিৎসক কৌশিক লাহিড়ী বলেন, ‘‘সোরিয়াসিস হল দীর্ঘমেয়াদি এক ‘অটো-ইমিউন’ রোগ, যার জন্য দায়ী শরীর নিজেই। শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যখন ভুল সঙ্কেত দিতে থাকে, তখন কোষের বিভাজন অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে হতে থাকে। এরই ফল হল সোরিয়াসিস। রোগটি মোটেই ছোঁয়াচে নয়।’’

Advertisement

সোরিয়াসিস হল দীর্ঘমেয়াদি এক ‘অটো-ইমিউন’ রোগ। ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।

বুঝিয়ে বলা যাক। সোরিয়াসিস আসলে ত্বকের এক বিশেষ ধরনের ক্রনিক সমস্যা। ত্বকের দু’টি স্তর থাকে— বাইরের স্তরটিকে বলে এপিডার্মিস এবং তার নীচে থাকে ডার্মিস। উপরের ত্বকে যে কোষগুলির মৃত্যু হয়, সেগুলি নির্দিষ্ট সময়ে ঝরে পড়ে। তখন নীচের স্তরে থাকা সজীব কোষগুলি উপরে উঠে আসে। এই প্রক্রিয়া নিরন্তর চলতে থাকে। যদি এতে হেরফের হয়, তখন গোল বাধে। চিকিৎসকের কথায়, ‘‘সাপ যেমন খোলস ছাড়ে বছরে এক বার, মানুষেরও তেমন চামড়ার পুরনো কোষ উঠে নতুন কোষ তৈরি হয়। মানুষের ক্ষেত্রে এই খোলস ছাড়ার সময়টা চলে ২৮-৩০ দিন অন্তর। অর্থাৎ, প্রতি ২৮ দিন বাদে আবার নতুন ও সজীব কোষ তৈরি হয় চামড়ায়। এখন যদি এই ২৮ দিনের চক্রটি খুব দ্রুত ৩-৪ দিনে হতে থাকে, তা হলে প্রতি ৩ দিন অন্তরই মৃত কোষ ঝরে নতুন কোষ উঠতে শুরু করবে। তখন দেখলে মনে হবে, চামড়া থেকে রুপোলি আঁশের মতো ছাল উঠছে। এটিই হল সোরিয়াসিসের লক্ষণ।’’

সোরিয়াসিস রোগটি প্রাচীন। প্রাচীন মিশরীয়, গ্রিক ও রোমান সভ্যতাতেও এই রোগের উল্লেখ আছে। চামড়ার উপর পুরু লালচে স্তর ও সেখান থেকে আঁশের মতো ছাল ওঠা দেখে রোগটিকে কুষ্ঠ বা শ্বেতির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হত। ভাবা হত, সেটি সংক্রামক। ১৮০৯ সালে ইংরেজ চিকিৎসক রবার্ট উইলান সোরিয়াসিস রোগটিকে আর পাঁচটি চর্মরোগের থেকে আলাদা করেন। পরে ১৮৪১ সালে অস্ট্রিয়ার চিকিৎসক ফার্দিনান্দ ভন হেব্রা প্রথম জানান, সোরিয়াসিস আসলে কুষ্ঠ বা শ্বেতির কোনওটিই নয়। সেটি অটো-ইমিউন ডিজ়অর্ডার। রোগটির নামকরণেও তাঁর ভূমিকা ছিল বলে জানা যায়।

রোগটি শুধু ত্বকের নয়

সোরিয়াসিস মানেই যে মুখ বা হাতের নানা জায়গা থেকে ছাল উঠবে, তা নয়। শরীরের আরও অনেক অংশে এই রোগ হয়। তার লক্ষণও আলাদা হয়। রোগের স্থান ও উপসর্গের উপর ভিত্তি করে সোরিয়াসিসের শ্রেণিবিন্যাসও করা হয়েছে। গোড়ার দিকে লালচে গুটির মতো প্যাচ দেখা যায়। ধীরে ধীরে ত্বকের এই অংশগুলি পুরু হয়ে ওঠে। কখনও আবার তা অত্যন্ত শুষ্ক হয়ে ফেটে যেতে থাকে, ছাল ওঠে, চুলকানি হয় বা জ্বালা করতে থাকে। মুখ, বুক, পিঠ, কনুই ছাড়াও মাথাতেও হয় সোরিয়াসিস। পাশাপাশি গোপনাঙ্গে, এবং হাঁটু ও কনুইয়ের হাড়েও সোরিয়াসিস হতে দেখা যায়। এমনটাই জানিয়েছেন ত্বক চিকিৎসক অতুল তানেজা।

সোরিয়াসিসের নানা ধরন। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

প্লাক সোরিয়াসিস এর সবচেয়ে সাধারণ ধরন। এতে রুপোলি আঁশের মতো ছাল উঠতে থাকে। চুলকালে চামড়া খসে যেতে থাকে। ভয়ানক জ্বালা ও চুলকানি হয়। ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে এই সোরিয়াসিসই বেশি হতে দেখা যায়। কনুই, হাঁটু, মাথার তালু এবং পিঠের নীচের অংশে বেশি হয়।

গাটেট সোরিয়াসিস শৈশব বা কৈশোরে শুরু হয়। এমনিতে সোরিয়াসিস যে কোনও বয়সেই হয়। গাটেট সোরিয়াসিসে আবার প্রচণ্ড গলা ব্যথা হয়। সারা শরীরে ছোট ছোট জলের ফোঁটার মতো গোলাপি বা লাল রঙের ছোপ দেখা দেয়। হাত, পা এবং পেটে বেশি হয়।

ইনভার্স সোরিয়াসিস বাহুমূল, স্তনের নীচে ও গোপনাঙ্গে বেশি হয়। ঘাম জমে তা আরও বাড়তে থাকে। পুরু লালচে ‌র‌্যাশের মতো ফুটে ওঠে চামড়ায়। এই ধরনের সোরিয়াসিসে আবার আঁশের মতো ছাল ওঠে না। চামড়ার কোনও এক বা একাধিক জায়গায় লালচে ফোস্কার মতো হয়ে জমাট বেঁধে থাকে।

হাত ও পায়ের তালু ফেটে গেলে ও সেখানে লালচে ফুস্কুড়ি হলে তা সোরিয়াসিসের লক্ষণও হতে পারে। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, পাসচুলার সোরিয়াসিস খুব কম জনের হয়। এটি আরও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। ত্বকের উপর সাদাটে পুঁজভর্তি ছোট ছোট ফুস্কুড়ি দেখা দেয়, যার চারপাশ লালচে হয়ে থাকে।

সোরিয়াসিস শরীরেরযে কোনও জায়গায় হতে পারে। ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।

সোরিয়াসিসের একটি বিপজ্জনক ধরন হল এরিথ্রোডার্মিক। এতে চামড়া পুড়ে লাল হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। এতে প্রচণ্ড ব্যথা, চুলকানি এবং শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এমন অবস্থায় দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করানো প্রয়োজন।

হাত ও পায়ের নখেও সোরিয়াসিস হতে পারে। নখের উপরিভাগ এবড়োখেবড়ো হয়ে যায়। নখের উপর হলদেটে ছাপ পড়ে। অনেক সময়ে আবার নখ আলগা হয়ে খুলে আসে।

সোরিয়াসিসের যে ধরনটি নিয়ে বেশি আলোচনা হয় না, সেটি হল সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস। গাঁটে গাঁটে প্রচণ্ড ব্যথা, ফোলা ভাব থাকে। পেশি শক্ত হয়ে যায়। সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিসে গাঁটের ব্যথার পাশাপাশি পিঠে ও কোমরের নীচে ব্যথা হতেও দেখা যায়। স্পন্ডিলাইটিসের লক্ষণও দেখা দিতে পারে। কাজেই গাঁটের ব্যথা বাত না সোরিয়াসিস, তা পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

মাথায় ও ঘাড়েও হয় সোরিয়াসিস। ছবি: ফ্রিপিক।

সোরিয়াসিস কিন্তু মাথাতেও হয়। মাথার ত্বকে চাপ চাপ সাদা আঁশের মতো চামড়া আটকে থাকে, সেখানে জ্বালা, চুলকানি হয়। খুশকি এবং মাথার ত্বকের সোরিয়াসিসের উপসর্গ প্রায় একই রকমের। সোরিয়াসিসের শুরুর সময়ে লক্ষণের মিল থাকে। একে বলে স্কাল্প সোরিয়াসিস। অনেকেই দু’টি অবস্থাকে গুলিয়ে ফেলেন, তাই চিকিৎসায় দেরি হয়ে যায়।

ওজন বৃদ্ধির সঙ্গে যোগসূত্র আছে কি?

অসুখটা ত্বকের হলেও এর সঙ্গে মেটাবলিক সিনড্রোমের গভীর যোগাযোগ আছে। এমনটাই মত চিকিৎসক কৌশিক লাহিড়ীর। স্থূলত্ব বা অতিরিক্ত ওজন হয়ে গেলে বা যিনি দীর্ঘ সময় ধরে লিভারের অসুখে ভুগছেন, তাঁরও হতে পারে। আবার যাঁর রক্তচাপ বেশি, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রাও বেশি, তিনিও ঝুঁকিতে রয়েছেন। মদ্যপান ও ধূমপানও কিন্তু তালিকায় রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ এবং সেই সংক্রান্ত ওষুধ খেতে থাকলেও রোগটি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। গলা ও ত্বকের নানা সংক্রমণজনিত সমস্যা ক্রনিক হয়ে গেলে, তখনও বিপদ বাড়ে।

সোরিয়াসিস কি সারে?

বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমাণিত কিছু ওষুধ আছে যা খেলে রোগটি নিয়ন্ত্রণে থাকে। তবে সোরিয়াসিস যে পুরোপুরি নিরাময় হয়ে যায়, তা বলা যায় না। ওষুধ ও ইঞ্জেকশনে রোগটিকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। শরীরের অল্প জায়গায় সোরিয়াসিস হলে লেজ়ার রশ্মি দিয়েও চিকিৎসা হয়।

সোরিয়াসিসের নানা রকম চিকিৎসাপদ্ধতি চলে এসেছে এখন। ছবি: ফ্রিপিক।

বর্তমানে ফোটোথেরাপি নিয়ে নানা পরীক্ষা চলছে। আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকেরা নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকরশ্মি দিয়ে কোষের দ্রুত বিভাজন বন্ধ করে রোগটি সারিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন।

আরও একটি থেরাপি আছে, যার নাম পিউভা। এতে রোগীকে প্রথমে 'সোরালিন' নামক একটি ওষুধ দেওয়া হয়, যা ত্বককে আলোর প্রতি সংবেদনশীল করে তোলে। এর পর অতিবেগনি রশ্মির নীচে রেখে চিকিৎসা করা যায়।

ন্যারোব্যান্ড ইউভিবি আরও একটি চিকিৎসা পদ্ধতি, যা অনেক বেশি নিরাপদ। এতে কেবল একটি নির্দিষ্ট ব্যান্ডের অতিবেগনি-বি রশ্মি দিয়ে চিকিৎসা করা হয়।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement