মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যই সেরা সম্পদ? ছবি: শাটারস্টক।
অর্থ, বিলাসবহুল জীবন না কি ঝরঝরে, সুস্থ ও সুঠাম শরীর? সাফল্যকে যদি মাপতে হয়, তবে মাপকাঠিতে কোনটি সব থেকে উপরে থাকবে? এক যুগ আগেও এ প্রশ্নের উত্তর অন্য রকম হত। কেউ বলতেন অর্থই সব। কেউ বলতেন স্বাস্থ্যই সম্পদ। কিন্তু এ যুগে এই সব কিছুর উপরে জায়গা করে নিয়েছে ব্রেন হেল্থ বা মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য। তারকা থেকে সচেতন সাধারণ মানুষ— সকলেই মনে করছেন মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যই আসল সম্পদ।
ব্যাঙ্ক ব্যালান্স যত বেশিই হোক না কেন শরীরের ‘সুপার কম্পিউটার’ বা মগজ যদি ঠিকমতো কাজ না করে, তবে ষোল আনাই বৃথা। তাই মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যকেই সেরা সম্পদ বিবেচনা করা হচ্ছে। তাকে বলা হচ্ছে ‘ব্রেন ওয়েলথ’।
গত বেশ কয়েক বছর ধরে তাই মন আর মাথার ভাল থাকা, মন্দ থাকা নিয়ে সচেতন হয়েছেন মানুষ। কেউ মস্তিষ্ক ভাল রাখতে পারে বিশেষ খাবার খাচ্ছেন, কেউ সকাল সকাল করছেন বিশেষ ভঙ্গির প্রাণায়ম। এমনকি, এখন মানুষ শরীরচর্চাও আর শুধু চেহারা সুন্দর দেখানোর জন্য করছেন না। করছেন মগজ আরও খোলতাই হবে বলে।
বাহুর জোর নয়, মাথার জোরই যে আসল— সেই উপলব্ধি নতুন নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে মানুষ ‘দর্শনধারী’ মনোভাবকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছিল। দেখা যাচ্ছে, সেই মোহ ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে। মগজের স্বাস্থ্য যে সেরা সম্পদ, এবং তাতেই যে সবচেয়ে বেশি সময় এবং শ্রম বিনিয়োগ করা উচিত, তা নিয়ে কথা বলেছেন তারকারাও।
দীপিকা পাড়ুকোনের কথাই ধরা যাক। দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বারবার দীপিকা বলেছেন, “আমাদের মাথা এবং মন যদি শান্ত ও সচল না থাকে, তবে বাহ্যিক সাফল্য স্থায়ী হয় না।” আবার আলিয়া ভট্টকে এক সাক্ষাৎকারে বলতে শোনা গিয়েছে, তিনি নিজের যাপনে এখন গুরুত্ব দিচ্ছেন ‘স্লিপ হাইজিন’ এবং ধ্যানের ওপর। প্রতিদিন অন্তত কিছুটা সময় ফোন থেকে দূরে থাকার এবং মস্তিষ্কের ব্যায়াম হিসাবে বই পড়া বা নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করছেন। কারণ, তিনি জেনেছেন এই পদ্ধতি ভাবনাচিন্তা এবং বিচারবিবেচনা করার ক্ষমতা উন্নত করতে সাহায্য করে। শুধু বলিউডই বা কেন? হলিউডের অভিনেতা ক্রিস হেমসওয়ার্থ এক তথ্যচিত্রে দেখিয়েছেন, কী ভাবে অ্যালঝাইমার্সের ঝুঁকি কমাতে তিনি নিজের শরীরচর্চা এবং খাদ্যাভ্যাস বদলে ফেলছেন। কারণ একটাই। ক্রিস চেয়েছেন তাঁর মস্তিষ্কের সুস্থ এবং সচল ভাব বেশি বয়স পর্যন্ত বজায় রাখতে।
মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভাল রাখতে মানুষ কী কী করছেন?
১. সচেতন খাদ্যাভ্যাস
মানুষ এখন ডায়েট চার্ট বানাচ্ছেন মগজের ক্ষমতা বাড়াতে। পাতে পড়ছে ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ আখরোট, বেরি বা চিয়া সিড। ক্যাফিনের বদলে জায়গা নিচ্ছে ‘মাচা গ্রিন টি’। অনেকে আবার ডায়েটে রাখছেন কুমড়োর বীজ বা তিসি— যার মূল লক্ষ্যই হলো মস্তিষ্কের কোষ বা নিউরনগুলিকে পুষ্টি জোগানো। একেই বলা হচ্ছে মস্তিষ্কের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
২. ব্যায়ামে বদল
শুধু ট্রেডমিলে দৌড়োনো নয়, মানুষ এখন বেশি ঝুঁকছেন যোগব্যায়াম আর প্রাণায়ামের দিকে। কারণ, প্রাণায়াম মস্তিষ্কে অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়, যা মনঃসংযোগ বৃদ্ধি করতে এবং স্ট্রেস কমাতে ম্যাজিকের মতো কাজ করে। জিমে গিয়ে পেশি বৃদ্ধির চেয়েও এ প্রজন্মের কাছে মস্তিষ্কের গ্রে ম্যাটার বৃদ্ধি গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি।
৩. ডিজিটাল ডিটক্স
এক সময় সারা দিন অনলাইন থাকাটাই হয়েছিল দস্তুর। কারণ, তাতে আশপাশের সব খবর সম্পর্কে থাকা যায় ‘আপ টু ডেট’। কিন্তু এখন সেই ভাবনার বিপরীতে হেঁটে দিনে অন্তত ১-২ ঘণ্টার ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। মানুষ ফোন বন্ধ রেখে নিজের সঙ্গে, আশপাশের মানুষের সঙ্গে সময় কাটানোকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
৪. ব্রেইন গেমস
ভিডিও গেমের বদলে এখন জায়গা করে নিচ্ছে এমন সব খেলা বা হবি যা যুক্তিবোধ বা স্মৃতিশক্তিকে চ্যালেঞ্জ করবে। কেউ নতুন ভাষা শিখছেন, কেউ নতুন কোনও বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছেন। শুধু শখের জন্য নয়, মস্তিষ্ককে ধারালো রাখার জন্য।
সোজা কথায়, লড়াইয়ে টিকে থাকতে এত দিন বাহ্যিক নানা বিষয়ে গুরুত্ব দিলেও মানুষ বুঝেছে এ ব্যাপারে সেরা কৌশল হল, নিজের মস্তিষ্কের যত্ন নেওয়া। অস্থির পৃথিবীতে বুদ্ধি আর ভাল মানসিক স্বাস্থ্যই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ভেসে থাকার রসদ জোগাবে।