Alexithymia

রাগ হলে প্রকাশ করতে পারেন না, দুঃখ হলেও না, নিজের মনের খাঁচায় আবদ্ধ থাকা কি আসলে কোনও অসুখ?

আবেগ আছে। অনুভূতিও। শুধু তা প্রকাশের ভাষাটুকু নেই। এমন মানুষজন উদাসীন নন। শুধু নিজের মনের ঘেরাটোপেই আবদ্ধ।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১৫ জুন ২০২৬ ১৫:১০
Share:

রাগ হলেও দেখাতে পারেন না, দুঃখপ্রকাশের ভাষাও নেই। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন— “ বেদনা কী ভাষায় রে/ মর্মে মর্মরি গুঞ্জরি বাজে”। মর্মে বেদনা গুমরে উঠছে, অথচ বোঝানোর ভাষাটুকু নেই। ভিতরে ভিতরে গুমরে থাকাই সার। হঠাৎ বুকের ভিতরটা ধড়ফড় করে উঠল, কিংবা পেটের ভিতর একটা অস্বস্তিকর মোচড় দিয়ে গেল। শিরদাঁড়া বেয়ে নামল ঠান্ডা স্রোত। তা ভয়ের কারণে না দুশ্চিন্তা না অধিক উত্তেজনা, ঠাহর করতেই পারলেন না। আপনি কি রেগে আছেন, না কি উদগ্রীব, না উত্তেজিত— তা আলাদা করার কোনও ক্ষমতাই আপনার নেই! অথচ বেশ টের পাচ্ছেন, মনের ভিতরে একটা চাপা অস্বস্তি জগদ্দল পাথরের মতো চেপে রয়েছে। আবেগ বা অনুভূতি প্রকাশের যে অক্ষমতা, তাকে ঠিক ‘মনের অসুখ’ বলা যায় না। এটি মনের এক অদ্ভুত অবস্থা, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘অ্যালেক্সিথাইমিয়া’। বিশ্বের অসংখ্য মানুষ ভুগছেন এই মানসিক অবস্থায়। নিজেদের অজান্তেই।

Advertisement

অসুখ, না মনের বিশেষ অবস্থা?

প্রাচীন গ্রিক শব্দ থেকে আসা এই নামের আক্ষরিক অর্থ হল— আবেগ প্রকাশের ভাষা হারিয়ে ফেলা। তাই বলে কি উদাসীন? রাগ-দুঃখ বা আনন্দের অনুভূতিগুলি হারিয়ে যায়? একেবারেই নয়। সবই থাকে ষোলোআনা। অ্যালেক্সিথাইমিয়াকে আবেগহীন বা অনুভূতিশূন্য অবস্থা ভেবে নেন অনেকে। আসলে তা নয়। ভিতরে ভিতরে রাগ, দুঃখ, উত্তেজনা, উদ্বেগ, সবই হয়, শুধু সেই অনুভূতিগুলি আলাদা করে চেনার ও তা প্রকাশের ভাষা থাকে না। অ্যালেক্সিথাইমিয়ায় ভোগা কাউকে জিজ্ঞাসা করলে সেই মুহূর্তে তিনি বলতেই পারবেন না যে তাঁর রাগ হচ্ছে, দুঃখ হচ্ছে, না কি তিনি প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

Advertisement

মনের ভাব ভাষায় প্রকাশ করতে অপারগ। ছবি: ফ্রিপিক।

সংসার, কর্মজীবন, সম্পর্কের ঘেরাটোপে থেকে উদ্বেগ জন্মাানো খুবই স্বাভাবিক। দুশ্চিন্তার মেঘ কখন যে মনের স্বতঃস্ফূর্ততাকে ভেঙে তছনছ করে দেয়, তা টের পাওয়া যায় না। অনুভূতিগুলি যেন জট পাকিয়ে যায়। প্রায় সকলেই এমন মানসিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যান বা গিয়েছেন কখনও না কখনও। অ্যালেক্সিথাইমিয়ায় যাঁরা ভোগেন, তাঁরা এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না। কী ধরনের মনঃকষ্টে তাঁরা রয়েছেন, তা প্রকাশ করতেও পারেন না। আর পাঁচজনের থেকে তাঁদের তফাৎ এখানেই।

অ্যালেক্সিথাইমিয়া নতুন কোনও সমস্যা নয়। বহু মানুষই ভুগছেন এতে। শুধু নামটিই স্বল্প পরিচিত। অবসাদ, উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠা নিয়ে ইদানীং এত বেশি আলোচনা হচ্ছে যে, অ্যালেক্সিথাইমিয়ার নামও উঠে এসেছে সে প্রসঙ্গে। অথচ এই সমস্যাটি প্রথম চিহ্নিত হয় ১৯৮০-র দশকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চিকিৎসকেরা লক্ষ করেন যে, কিছু সাইকোসোম্যাটিক রোগী (মানসিক চাপের কারণে যাঁদের নানা রকম শারীরিক লক্ষণ দেখা দেয়)থেরাপির সময়ে তাঁদের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে একেবারে চুপ করে যান। এর থেকে বোঝা যায়, তাঁরা তাঁদের অনুভূতি প্রকাশ করতে অপারগ। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে আমেরিকার হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের সাইকোথেরাপিস্ট পিটার ইম্যানুয়েল সিফনিয়োস এই বিশেষ মনের অবস্থার নামকরণ করেন ‘অ্যালেক্সিথাইমিয়া’। তাঁর সহকর্মী জন নেমাইয়াহ লক্ষ করেন, কিছু রোগী 'টক থেরাপি'-র সময়েও কথা বলেন না। নিজের মনের অবস্থা বোঝাতে পারেন না। ‘অ্যালেক্সিথাইমিয়া’ নিয়ে গবেষণা শুরু হয়ে যায় জোরকদমে। এর একটি বিশেষ স্কেলও তৈরি করেন গবেষকেরা। মনের অবস্থা কেমন, তা পরিমাপ করা যায় এই স্কেলে।

গবেষকেরা অ্যালেক্সিথাইমিয়াগ্রস্ত মানসিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, মস্তিষ্কের গঠনগত তারতম্যে এই সমস্যাটি হতে পারে। মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণের কুঠুরিটি হল ‘অ্যামিগডালা’। সেটির কলকব্জা বিগড়ে গেলে সমস্যা হয়। সাধারণত মস্তিষ্কের ডান গোলার্ধ (যা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে) এবং বাম গোলার্ধের (যা ভাষা প্রকাশকে নিয়ন্ত্রণ করে) মধ্যে সঙ্কেতের আদান-প্রদান ব্যাহত হলেও অ্যালেক্সিথাইমিয়া হতে পারে।

বর্তমান সময়ে লন্ডনের কিংস কলেজ ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা অ্যালেক্সিথাইমিয়ার সঙ্গে স্নায়ুর রোগের সংযোগ খুঁজে পেয়েছেন। তাঁরা জানাচ্ছেন, বড় মানসিক আঘাত বা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজ়অর্ডার থাকলে আবেগ প্রকাশের পথটা অবরুদ্ধ হয়ে যায় অনেক সময়েই। তা ছাড়া অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিজ়অর্ডার, স্কিৎজ়োফ্রেনিয়া এবং ক্যানসারের মতো দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গেও এর যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছে। দেখা গিয়েছে, অটিজ়মে আক্রান্তদের প্রায় ৫০ শতাংশের মধ্যে অ্যালেক্সিথাইমিয়া দেখা যায়। এই সমস্যা যাঁদের থাকে, তাঁরা যেমন নিজের আবেগ প্রকাশ করতে পারেন না, তেমনই অন্যের অনুভূতির সঙ্গেও একাত্ম হতে পারেন না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁরা নিজেদের গুটিয়ে রাখেন। আবার অনেকেই অবসাদে ডুবে যান।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement