বরাক-চর্চা-১

ইতিহাস কিংবা প্রাক্-ইতিহাস, বরাক একশো ভাগ বাঙালি

দক্ষিণ অসমের তিনটি জেলা নিয়ে আজ যে ভূখণ্ড ‘বরাক উপত্যকা’ নামে অভিহিত, প্রাচীন এবং মধ্য যুগে এর নাম ছিল কাছাড়।

Advertisement

সঞ্জীব দেবলস্কর

শেষ আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০৩:০৪
Share:

দক্ষিণ অসমের তিনটি জেলা নিয়ে আজ যে ভূখণ্ড ‘বরাক উপত্যকা’ নামে অভিহিত, প্রাচীন এবং মধ্য যুগে এর নাম ছিল কাছাড়। ভৌগোলিক ভাবে অঞ্চলটি বঙ্গীয় সমভূমিরই সম্প্রসারিত অঞ্চল। প্রাক-ঐতিহাসিক পর্ব থেকে ঐতিহাসিক পর্বে এ অঞ্চলে আর্য-ব্রাহ্মণ্য জনগোষ্ঠীর আগমন, কৃষিসংস্কৃতির বিকাশ, ত্রিপুরি-কামরূপী এবং হরিকেল-সমতট রাষ্ট্রশক্তির আত্মপ্রকাশ। সব মিলিয়ে দশম শতকে শ্রীহট্ট রাজ্যের অভ্যুত্থান পর্যন্ত একটি ঐতিহাসিক রূপরেখার আদল পাওয়া যায়। ওই পর্বে অঞ্চলটি এক বা একাধিক রাষ্ট্রশক্তির আওতায় আসে। দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকে স্বাধীন সার্বভৌম শ্রীহট্ট রাজ্যের বিভাজন, পতন এবং এ অঞ্চলে তুর্ক-আফগান শাসন প্রতিষ্ঠা এবং কাছাড়ে দ্বিতীয় পর্যায়ে ত্রিপুরি রাজত্বের প্রতিষ্ঠা—এ হল বরাক উপত্যকার সমাজ ও জাতি-গঠন ইতিহাসের দ্বিতীয় পর্ব।

Advertisement

এখানে যে ত্রিপুরি শাসনের কথা বলা হয়েছে তার সপক্ষে বিভিন্ন প্রত্ননিদর্শন, লোকশ্রুতি ছাড়াও বরাকবিদদের হাতে এসেছে ত্রিপুরি রাজা, আদি ধর্মফা প্রদত্ত একটি সংস্কৃত তাম্রপত্র। যেখানে রয়েছে: ‘ত্রিপুরা চন্দ্রবানাব্দে মকরন্দে রবৌ শুক্লপক্ষে পঞ্চদশী দিনে’ (৬৪১ খ্রিস্টাব্দে) ক্রোশিয়া নদীর তীরে ভূমিদানের কথা। খ্রিস্টিয় ষষ্ঠ-সপ্তম শতকে কামরূপরাজ ভাস্কর বর্মন কর্তৃক তাঁর বৃদ্ধ প্রপিতামহ ভূতিবর্মন প্রদত্ত নবীকৃত তাম্রশাসনে উল্লিখিত ‘চন্দ্রপুরি বিষয়া’র সীমারেখায় কাছাড় জেলার একাধিক অঞ্চলের অবস্থিতি, এ অঞ্চলে কামরূপ রাজ্যের সাক্ষ্য বহন করছে। অন্য দিকে, দক্ষিণ-পূর্ববঙ্গের সমতট রাজ্যের সামন্তরাজ লোকনাথের অপর একটি তাম্রশাসনে সমতল কাছাড়ে ‘জয়তুঙ্গবর্ষ’-এর অন্তর্গত ‘সুরঙ্গ বিষয়া’তে ব্রাহ্মণকে ভূমিদানের কথা রয়েছে।

Advertisement

প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থ ‘কৃতসার’-এ শ্রীহট্টকে হরিকেল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ত্রিপুরা, কুমিল্লা, শ্রীহট্টের বিভিন্ন স্থানে হরিকেল মুদ্রার আবিষ্কার এ অঞ্চলে হরিকেল রাজ্যের সম্প্রসারণের সম্ভাবনা স্পষ্ট করেছে। শ্রীহট্টের ‘পশ্চিমভাগ তাম্রফলক’ থেকে দশম শতকে শ্রীহট্ট-কাছাড়ে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের নতুন তথ্য পাওয়া যায়।

চতুর্দশ শতকের কাছাড়ে দ্বিতীয় পর্যায়ে ত্রিপুরি রাজত্বের বিস্তৃতি ঘটে লালা, প্রতাপগড় অঞ্চলে। তার অবসান হয় ১৫৬২ খ্রিস্টাব্দে। কাছাড়ে কোচ শক্তির আত্মপ্রকাশে। কোচ সেনাপতি চিলারায় মাইবাঙ রাজকে পরাভূত করে সমতল কাছাড় পর্যন্ত অগ্রসর হন এবং নিজের ভাই কমল নারায়ণকে উপ-রাজ নিযুক্ত করে ফিরে যান। একাধিক রাজা খাসপুরে রাজত্ব করার পর শেষ রাজা ভীমসিংহের কন্যার সঙ্গে ডিমাসা যুবরাজ লক্ষীচন্দ্রের বিবাহ এবং দুই রাজ্যের সংযুক্তিতে কোচ রাজত্বের অবসান হয়।সমতল কাছাড়ে ডিমাসা রাজত্বের সম্প্রসারণ ঘটে। সেটা ১৭৪৫ খ্রিস্টাব্দ।

১৭৪৫ থেকে ১৭৫০ সাল কাছাড়ে ডিমাসা রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করে। ১৭৫০ থেকে ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দ ক্রমান্বয়ে একাধিক রাজা খাসপুরে রাজত্ব করেন। মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র এবং গোবিন্দচন্দ্র ছিলেন নিঃসন্তান। তাঁদের রাজত্বকালেই রাজ্যে ইংরেজদের আনাগোনার শুরু। ইতিমধ্যে সিলেট ইংরেজদের হস্তগত হয়েছে। পাশাপাশি, বর্মা, মণিপুর-সহ কাছাড়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল হতে থাকে, রাজ্যে বহিঃশত্রুর মোকাবিলার জন্য ইংরেজদের সাহায্যও প্রার্থনা করা হয়। ১৮২৪ সালে কর্নেল ইনিস ব্রহ্মসৈন্যদের প্রতিহত করেন। এর পর বড়লাট বাহাদুরের প্রতিনিধি ডেভিড স্কটের সঙ্গে ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে ডিমাসা রাজার একটি চুক্তি হয়। কার্যত এই ‘বদরপুর সন্ধি’র পরই ডেভিড স্কটের হাতে কাছাড়ের স্বাধীনতার অবসান।

গোবিন্দচন্দ্র ছিলেন স্বভাবকবি, প্রশাসনে উদাসীন। স্বাভাবিক ভাবেই রাজ্যের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযোগে মণিপুরি যুবরাজদের ক্ষমতা প্রদর্শনের অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে ওঠে কাছাড়। তাঁদের ষড়যন্ত্রে রাজা গোবিন্দচন্দ্র রাজধানী ছেড়ে অস্থায়ী রাজধানী, হরিটিকরে সরে আসেন। অবশেষে ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে মণিপুরি যুবরাজ গম্ভীর সিংহের চক্রান্তে গোবিন্দচন্দ্র আততায়ীর হাতে নিহত হন। কাছাড়ের রাজসিংহাসন শূন্য হয়ে পড়ে। অপুত্রক রাজাকে ইতিপূর্বে সিংহাসনের উত্তরাধিকারের জন্য দত্তক গ্রহণ করতে ইংরেজরা বাধা দেয়। এ দিকে, ডিমাসা সেমফঙের সদস্যরাও উত্তরাধিকারী নির্বাচনের বিষয়ে একমত হতে পারেন না। রাজমহিষী ইন্দুপ্রভার বৈধতা নিয়ে প্রভাবশালী ডিমাসা প্রতিনিধি এবং ইংরেজরাও প্রশ্ন তোলেন। পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। ইংরেজরা এটাই চাইছিল। প্রজারা নিরাপত্তাহীনতায় রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে যেতে থাকে। এই অবস্থায় ১৮৩২ সালের ১৪ অগস্ট, একটি অধ্যাদেশ জারি করে ডিমাসা রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে ইংরেজরা কাছাড় অধিগ্রহণ করল। কাছাড়ের প্রশাসক নিযুক্ত হলেন ক্যাপ্টেন টমাস ফিসার।

অধিগ্রহণের পর ‘নন-রেগুলেটেড প্রভিন্স’ কাছাড়কে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের ‘মিনিটস্’ অনুযায়ী বাংলা প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সুপারিনটেন্ডেটই তখন একাধারে প্রশাসক, বিচারক এবং রাজস্ব প্রধান। তাঁর আদালতের বিরুদ্ধে আপিলের জন্য যেতে হত চেরাপুঞ্জিতে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে গভর্নর জেনারেলের প্রতিনিধি ডেভিড স্কটের কার্যালয়ে। মুক্তারি প্রথার বিরুদ্ধে প্রবর্তিত হল তহশিলদারি প্রথা। ফৌজদারি এবং দেওয়ানি মামলাগুলিকে আনা হল কলকাতা উচ্চ ন্যায়ালয়ের আওতায়। কাছাড় জেলাটিকে আনা হল সিলেটের দায়রা বিচারকের আওতায়। প্রতিরক্ষার জন্য প্রথমে কাছাড় লেভি, পরে সুষমা ভ্যালি লাইট ইনফ্যান্ট্রি গঠন করা হয়। পরে এই লাইট ইনফ্যান্ট্রি রূপান্তরিত হল আসাম রাইফেলসে। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের রণাঙ্গন হিসেবে কাছাড়ের মাটিতে ঝরল সিপাহিদের রক্ত।

অন্য দিকে, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার জেলাগুলিকে নিয়ে চিফ কমিশনার শাসিত প্রদেশ হিসেবে অসমকে সংগঠিত করার জন্য প্রয়োজনীয় জনসংখ্যা এবং রাজস্ব বৃদ্ধির উদ্দেশে ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে গোয়ালপাড়া এবং সিলেটের সঙ্গে কাছাড়কেও অসমের সঙ্গে যুক্ত করা হল। আর এরই সঙ্গে প্রাক-ঔপনিবেশিক পর্বের ‘কাছাড় রাজ্য’ হয়ে গেল অসম প্রদেশের একটি জেলা। এক কালের স্বাধীন সার্বভৌম রাজ্য, পরবর্তী কালে বাংলা ডিভিশনের অঙ্গ, কাছাড়ের গরিমার পতনের শুরু তখনই।

স্বাধীন ভারতের মাটিতে বঙ্গীয় ঐতিহ্যের ধারা বহন করে আসা আবহমানকালের ভারতীয় ঐতিহ্য-লালিত এই নির্বাসিতা ভূমির সন্তানের অস্তিত্ব, নাগরিকত্ব, ভাষা এবং সাংস্কৃতিক বৈধতা আজ প্রমাণ সাপেক্ষ! ইতিহাসের এ এক নির্মম পরিহাস!

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement