Splits In Political Parties

তৃণমূলের পর এ বার ভাঙন উদ্ধবসেনার সংসদীয় দলে? জল্পনা অখিলেশের দলে অন্তর্দ্বন্দ্ব নিয়েও, নেপথ্যে কি দুই তৃতীয়াংশের অঙ্ক?

লোকসভায় উদ্ধবসেনার সাংসদ সংখ্যা ন’জন। ফলে ছ’জন (অর্থাৎ, দুই-তৃতীয়াংশ) সাংসদ দল ছাড়লে দলত্যাগ বিরোধী আইনে তাঁদের সাংসদ পদ খারিজ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করা হচ্ছে।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬ ২৩:২৯
Share:

(বাঁ দিক থেকে) পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে এবং উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব। — ফাইল চিত্র।

পশ্চিমবঙ্গে ‘অপারেশন লোটাস’-এর পরে এ বার মহারাষ্ট্রে ‘অপারেশন টাইগার’! তৃণমূলের পরে বিজেপি এ বার মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা (ইউবিটি)-র সংসদীয় দলে ভাঙন ধরাতে সক্রিয় হয়েছে বলে অভিযোগ। সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার দিল্লিতে উদ্ধব শিবিরের ‘বিদ্রোহী’ ছ’জনের সঙ্গে বৈঠকে বসতে পারেন শিবসেনা প্রধান একনাথ শিন্দের পুত্র তথা সাংসদ শ্রীকান্ত!

Advertisement

লোকসভায় উদ্ধবসেনার সাংসদ সংখ্যা ন’জন। ফলে ছ’জন (অর্থাৎ, দুই-তৃতীয়াংশ) সাংসদ দল ছাড়লে দলত্যাগ বিরোধী আইনে তাঁদের সাংসদ পদ খারিজ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করা হচ্ছে। এরই মধ্যে জল্পনা তৈরি হয়েছে, উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদবের দল সমাজবাদী পার্টি (এসপি)-তে ভাঙনের সম্ভাবনা নিয়ে। সে রাজ্যের মন্ত্রী তথা সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টি (এসবিএসপি)-র প্রতিষ্ঠাতা প্রধান ওমপ্রকাশ রাজভর বুধবার দাবি করেছেন, এসপির নেতা এবং জনপ্রতিনিধিদের বড় অংশই দল ছাড়তে প্রস্তুত। পূর্ব উত্তরপ্রদেশের প্রভাবশালী অনগ্রসর (ওবিসি) নেতা ওমপ্রকাশ একদা অখিলেশের সহযোগী ছিলেন। ২০২৩ সালে তাঁর দল এসপির সঙ্গে ছেড়ে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএ-তে যোগ দিয়েছিল। ওমপ্রকাশ বুধবার এক্স পোস্টে লেখেন, ‘‘সমাজবাদী পার্টিতে বড় ধরনের বিভাজন হতে চলেছে। রাম গোপাল যাদব কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে একটি চিঠি দিয়েছেন। খনি কেলেঙ্কারি এবং গোমতী রিভার ফ্রন্ট কেলেঙ্কারির মূল হোতা কে, তা উত্তর প্রদেশের সকলেই জানেন। ফাঁস চেপে বসার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় এসপি উদ্বিগ্ন। মহারাষ্ট্র ও পশ্চিমবঙ্গের কথা বাদ দিন, পুরো এসপি বিজেপিতে যোগ দিতে প্রস্তুত।’’

উদ্ধবসেনায় আবার ভাঙন

২০২২ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত মহারাষ্ট্রের রাজনীতির বাইরে শিবসেনা নেতা একনাথ শিন্দের তেমন কোনও পরিচিতি ছিল না। সে বছর ২০ জুন একদল শিবসেনা বিধায়ককে সঙ্গে নিয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই তিনি শিরোনামে। প্রথমে গুজরাত, তার পর অসম এবং তার পরে গোয়া— তিন বিজেপি শাসিত রাজ্যে বিক্ষুব্ধ বিধায়কদের সঙ্গে নিয়ে তিনি মুখ্যমন্ত্রী এবং দলের শীর্ষনেতা উদ্ধবের সঙ্গে দর কষাকষি চালাতে থাকেন। এক সময়ে বোঝা যায়, শিবসেনার অধিকাংশ বিধায়কই শিন্দের সঙ্গে রয়েছেন। অতঃপর নিরুপায় উদ্ধবের ইস্তফা। সে বছরের ৩০ জুন বিজেপিকে সঙ্গে নিয়ে নতুন সরকার গড়েন শিন্দে। উপমুখ্যমন্ত্রী হন বিজেপির ফডণবীস। এর পরে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে এনসিপি প্রধান শরদের ভাইপো অজিতও কাকার দলের অধিকাংশ বিধায়ককে নিয়ে এনডিএ-তে শামিল হন।

Advertisement

২০২৪ সালের নভেম্বরে মহারাষ্ট্রের বিধানসভা ভোটে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ‘মহাজুটি’র বিপুল জয়ের পরে অবশ্য মুখ্যমন্ত্রিত্ব ফিরে পাননি শিন্দে। ফড়ণবীসের ডেপুটি হয়েই সন্তষ্ট থাকতে হয় তাঁকে। যা নিয়ে সে সময় শিন্দে অনুগামীদের একাংশ প্রকাশ্যে বিজেপির বিরুদ্ধে তোপ দেগেছিলেন। কিন্তু দেড় বছরের মাথায় উদ্ধবসেনায় ভাঙনের সম্ভাবনা উস্কে নতুন করে খবরের শিরোনাম হয়েছেন তিনি। বুধবার দিল্লিতে উদ্ধবসেনার চার সাংসদ— সঞ্জয় দিনা পাতিল, সঞ্জয় দেশমুখ, নাগেশ পাতিল অষ্টিকর এবং সঞ্জয় যাদবের সঙ্গে শিন্দে শিবিরের কথা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। ওমরাজে নিম্বলকর এবং ভাউসাহেব ওয়াকচাউরেও বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিচ্ছেন বলে ‘খবর’। তাঁদের কারও সঙ্গে ফোনেও যোগাযোগ করতে পারেনি উদ্ধব শিবির। এই পরিস্থিতিতে বুধবার উদ্ধব অনুগামী তিন লোকসভা সাংসদ— অরবিন্দ সাওয়ন্ত, অনিল দেশাই এবং রাজাভাবু ওয়াজে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে দলত্যাগী সাংসদদের কোনও ‘পৃথক গোষ্ঠী’ হিসাবে স্বীকৃতি না দেওয়ার আবেদন জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন। অরবিন্দের সঙ্গে বুধবার দিল্লিতে গিয়েছেন রাজ্যসভার নেতা সঞ্জয় রাউত। তাঁর অভিযোগ, সাংসদ কেনার জন্য প্রত্যেককে আলাদা করে ৫০ কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, প্রাইভেট জেটের প্রলোভনও রয়েছে বলে দাবি সঞ্জয়ের। এক্স পোস্টে সঞ্জয় লিখেছেন, ‘‘মহারাষ্ট্রের সাংসদদের কেনার জন্য প্রত্যেককে ১৫ কোটি টাকা করে অগ্রিম দেওয়া হচ্ছে। এই তথ্য মর্মান্তিক এবং জঘন্য।’’

কী দাবি অখিলেশের

সমাজবাদী পার্টিতে ভাঙনের গুঞ্জনের মধ্যেই বুধবার মুখ খুলেছেন অখিলেশ যাদব। তাঁর দাবি, দল এখনও মজবুতই রয়েছে। একই সঙ্গে এ-ও বললেন, “যো ডর জায়েগা, ওহ ভাগ জায়েগা (কেউ ভয় পেলে তিনি পালিয়ে যাবেন)।”

এসপি-তে ভাঙন ঘটছে চলেছে বলে দাবি করায় উত্তরপ্রদেশের মন্ত্রী ওমপ্রকাশকে নিশানা করেন অখিলেশ। সমাজবাদী পার্টির প্রধান বলেন, “এ সব গল্প আর কতদিন চলবে?” অতীতেও যে সমাজবাদী পার্টির নেতারা দলবদল করে বিজেপিতে গিয়েছেন, তা-ও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। এ প্রসঙ্গে অখিলেশ বলেন, “বিজেপি এ ভাবেই কাজ করে। দল ভাঙে। আগেও ওরা আমাদের সাংসদ, বিধায়কদের ভাঙিয়েছে। যাঁরা ভয় পাবেন, তাঁরা চলে যাবেন। বিজেপির বিরুদ্ধে লড়তে আমাদের এমন লোক দরকার, যাঁরা সাহসী।”

কেন এমন তৎপরতা

বিরোধী শিবির মনে করছে, ২০২৯-এর লোকসভা ভোটের আগে বিজেপি লোকসভার আসন সংখ্যা বাড়িয়ে মহিলা সংরক্ষণ চালু করা এবং ‘এক দেশ এক ভোট’ সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতে চায়। লোকসভা ও রাজ্যসভায় নরেন্দ্র মোদী সরকার এখন দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদের সমর্থন জোগাড় করতে মরিয়া। সেই জন্যই তৃণমূলের পরে এ বার উদ্ধবসেনা, এসপি-তে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে। দলত্যাগ-বিরোধী আইনে যাতে উদ্ধব শিবিরের সাংসদেরা না পড়েন, তার জন্য ৯ জনের মধ্যে ৬ জনকে একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে হবে। সেই অঙ্কেই এগোচ্ছে বিজেপি এবং শিন্দেসেনা। পাশাপাশি, মোদী-অমিত শাহদের লক্ষ্য, বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-ছুট ডিএমকের লোকসভার ২২ এবং রাজ্যসভার ৮ সাংসদের সমর্থনও নিশ্চিত করা। ইতিমধ্যেই সেই লক্ষ্যে ‘কাজ’ শুরু হয়েছে বলে প্রকাশিত কয়েকটি খবরে দাবি।

দুই-তৃতীয়াংশ ও দশম তফশিল

দলত্যাগ বিরোধী আইন বলছে, কোনও রাজনৈতিক দলের টিকিটে নির্বাচিত সাংসদ-বিধায়কদের দুই-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি সদস্য মনে করলে অন্য দলে যোগ দিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সংবিধানের দশম তফসিল অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে দলত্যাগবিরোধী আইন কার্যকর হবে না। তাঁরা সংসদে নিরপেক্ষ ভাবে বা সংশ্লিষ্ট দলের নামে বসতে পারবেন। কিন্তু তাঁরা যে প্রতীকে জিতেছেন, যদি সেই দলের প্রতীক বা তহবিলের দাবি করেন, তা হলে সেটা সংসদের অধীনে থাকবে না। তা চলে যাবে নির্বাচন কমিশনের অধীনে।

কলকাতা হাই কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি দেবাশিস করগুপ্ত এ প্রসঙ্গে ১৯৬৮ সালের প্রতীক সংরক্ষণ এবং বরাদ্দ সংক্রান্ত নিয়মের কথা বলেন। তাঁর ব্যাখ্যা, ‘‘একটি রাজনৈতিক দলের দু’টি ‘উইং’ থাকে। একটি পরিষদীয় বা সংসদীয়। অর্থাৎ, বিধায়ক এবং সাংসদেরা। দ্বিতীয়টি, সাংগঠনিক। এই দুই অংশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যদি দলের প্রতীক এবং তবহিলের দাবি জানায়, সই করে নথি দাখিল করে, কমিশন তখন তা খতিয়ে দেখতে পারে। সেই যাচাইপর্ব যত দিন চলবে, তত দিন কী হবে? প্রাক্তন বিচারপতি করগুপ্তের বক্তব্য, ‘‘তত দিন চাইলে কমিশন দু’পক্ষকে দু’টি পৃথক প্রতীক দিতে পারে।’’ ২০১৭ সালে মার্চ মাসে নির্বাচন কমিশন এমনটাই করেছিল এডিএমকের ভাঙনের সময়। পলানীস্বামী এবং পন্নীরসেলভম, কোন গোষ্ঠীই দলের পুরনো নাম এবং ‘জোড়াপাতা’ নির্বাচনী প্রতীক পায়নি সে সময়। ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া-য় (এনসিপিআই) মিশে যাওয়া তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদেরা আর জোড়াফুল প্রতীক দাবি করবেন না বলেই মনে করছেন অনেকে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement