লখনউয়ের কালিদাস মার্গে জ্ঞানেশ্বর মিশ্র ট্রাস্টের অফিস। তার দোতলায় অখিলেশ যাদবের ‘ওয়ার রুম’।
চারটে ‘টিম’ একসঙ্গে কাজ করছে। একদলের কাজ টেলিভিশনে সংবাদমাধ্যমে নজর রাখা। আর এক দল গবেষণায় মগ্ন। ‘পিকু’-র অন্যতম গীতিকার মনোজ যাদবের নেতৃত্বে একটি দল নতুন নতুন প্রচারের মন্ত্র তৈরি করে চলেছে। একটি দল সে সব ছড়িয়ে দিচ্ছে হোয়াটসঅ্যাপ-ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের মতো যাবতীয় সোশ্যাল মিডিয়ায়।
গোটা রাজ্য থেকে তথ্য আসছে, কোথায় সমাজবাদী পার্টির প্রচারে কেমন সাড়া মিলছে। কোথায় নরেন্দ্র মোদী বা মায়াবতী কী বলে সপা-কে আক্রমণ করছেন। তার পাল্টা জবাবে কী বলতে হবে, সেই তথ্য পৌঁছে যাচ্ছে সপা-র প্রার্থী ও মুখপাত্রদের কাছে। ফেসবুকের দেওয়ালে কিংবা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছড়িয়ে পড়ছে অখিলেশের জমানায় কাজের ছবি-ভিডিও। কোথায়, কীসে সাড়া মিলছে, সেই তথ্যও পৌঁছচ্ছে অখিলেশের কাছে। এই সোশ্যাল মিডিয়ার সাড়া থেকেই কোন বিধানসভা কেন্দ্রে কী কী স্থানীয় সমস্যা রয়েছে, তা ছেঁকে বের করছেন হার্ভাডের গবেষক অংশুমান শর্মার দায়িত্বে থাকা দলটি। তা সরকারি তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। তার পর অখিলেশের কাছে বার্তা যাচ্ছে, ওই এলাকায় প্রচারে গিয়ে তাঁর কী বলা উচিত। অখিলেশ সেই মতো গিয়ে নিজেই সমস্যার কথা তুলে ধরে সমাধানের আশ্বাস দিয়ে আসছেন। লোকের কাছে বার্তা যাচ্ছে, তাঁদের সমস্যাও মুখ্যমন্ত্রীর অজানা নয়।
কে বলবে, রাজ্যটার শতকরা ৭৮ ভাগেরও বেশি মানুষ গ্রামে থাকেন! এই উত্তরপ্রদেশেই মুখ্যমন্ত্রীর গদিতে ফিরতে ‘ডিজিটাল’ পথেই সাইকেল চালাচ্ছেন অখিলেশ যাদব। মূল সুর তিনি নিজেই বেঁধে দিয়েছেন। নেতিবাচক প্রচার বা ব্যক্তিগত স্তরে আক্রমণ যতখানি সম্ভব এড়িয়ে যেতে হবে। মুখ ফসকে কোনও কটু মন্তব্য করা যাবে না। লখনউ-আগরা এক্সপ্রেসওয়ে, লখনউয়ের মেট্রোর মতো ইতিবাচক কথা তুলে ধরতে হবে। ব্যক্তি অখিলেশ নয়। মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশের কাজ হবে প্রচারের সূচীমুখ। মূল মন্ত্রই হল ‘কাম বোলতা হ্যায়’।
কিন্তু ডিজিটাল মাধ্যমে এই প্রচার কি উত্তরপ্রদেশের গ্রামে গ্রামে পৌঁছচ্ছে?
ডিজিটাল প্রচারের দায়িত্বপ্রাপ্ত আহমেদ আফতাব নকভির জবাব, ‘‘কেন নয়? উত্তরপ্রদেশের যুব সমাজের ৯০ শতাংশের মোবাইলে হোয়াটসঅ্যাপ রয়েছে। আমরা সেখানে যা পৌঁছে দিচ্ছি, তা ওরা পড়বেন, দেখবেন, শেয়ার করবেন।’’ মুম্বইয়ে দেশের অন্যতম বড় ডিজিটাল সংস্থা চালান নকভি। তাঁর বক্তব্য, অখিলেশ যাদবের প্রচারের শ্লোগান ‘কাম বোলতা হ্যায়’-ও প্রথমে ডিজিটাল মাধ্যমে ছাড়া হয়েছিল। সেখানে প্রবল সাড়া মিলতেই অখিলেশ তাকে মূলমন্ত্র করে ফেলেন।
প্রচারের অন্যতম কারিগর আশিস যাদবের বক্তব্য, ২৪ ঘণ্টা এই ‘ওয়ার রুম’ মুখ্যমন্ত্রীর চোখ-কান হিসেবে কাজ করছে। একেবারে বুথ স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার জন্য সবরকম পন্থা কাজে লাগানো হচ্ছে। তা সে সোশ্যাল মিডিয়াই হোক বা ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচার। বিবিসি-র প্রাক্তন কর্মী আশিসকে লখনউয়ে অনেকেই সমাজবাদী পার্টির প্রশান্ত কিশোর বলে ডাকেন। আশিসের জবাব, ‘‘আমাদের সঙ্গে একাধিক প্রশান্ত কিশোর রয়েছে।’’ আশিস-নকভিদের দাবি, তাঁরা স্বেচ্ছায় কাজ করছেন। সকলেই নিজের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। কাজেই কিছু পাওয়ার জন্য এই কাজ করছেন না। শুধু উত্তরপ্রদেশের উন্নয়ন চান। কারণ সকলেই রাজ্যের ভূমিপুত্র।
৩০-৪০ জনের এই দলটির মধ্যে অন্তত জনা দশেক মার্কিন ভোটে হিলারি ক্লিনটনের প্রচার দেখে হাতেকলমে শিখে এসেছেন। এখানে তাঁদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী নরেন্দ্র মোদী-র প্রচার টিম। অখিলেশের জনসভা সরাসরি ইউটিউব, ফেসবুকে লাইভ দেখানোর ব্যবস্থা এরাই করছেন। অখিলেশের সভার শেষে এরাই ভিড়ে মিশে গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলে বোঝার চেষ্টা করছেন, কোন কথায় বেশি সাড়া মিলল। পরের সভাতেও তার প্রতিধ্বনি মিলছে।
উদাহরণ? ডিম্পল যাদব একটি সভায় ‘আপনাদের অখিলেশ ভাইয়া’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। ঘরের লোকের মতো ডিম্পলের কথা সকলের খুব ভাল লেগেছিল। তার পর থেকেই ডিম্পল সব সভায় ‘আপনাদের অখিলেশ ভাইয়া’-র কথাই বলছেন।