(বাঁদিকে) নরেন্দ্র মোদী এবং প্রিয়ঙ্কা গান্ধী (ডানদিকে)।
মহিলা সংরক্ষণ বিলের আড়ালে লোকসভার আসন বাড়ানোর পরিকল্পনা ভেস্তে যেতেই লোকসভার এবং রাজ্যসভার বিশেষ অধিবেশন মুলতুবি করে দিল কেন্দ্র। শাসকদল বিজেপির নেতারা শনিবার থেকেই বিরোধীদের ‘মহিলাবিরোধী’ হিসাবে চিহ্নিত করে নেমে পড়লেন ময়দানে। বসে নেই বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ও। পশ্চিমবঙ্গ এবং তামিলনাড়ুর বিধানসভা ভোটের আগে শনিবার বিরোধী নেতারা পরবর্তী রণকৌশল নিয়ে বৈঠক করলেন।
বিরোধী জোটের বৈঠকের পরে কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বলেন, ‘‘এই ঘটনা ভারতীয় গণতন্ত্রের বড় জয়। এই ফলাফল বিরোধীদের ঐক্যের শক্তিকে প্রতিফলিত করেছে এবং ক্ষমতাসীন পক্ষের ষড়যন্ত্রে প্রথম বার আঘাত হেনেছে।’’ ঘটনাচক্রে, লোকসভায় সংশোধনী নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই বৃহস্পতিবার রাতে মহিলাদের আসন সংরক্ষণ সংক্রান্ত পুরনো আইন কার্যকর করার ঘোষণা করেছে কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রক এই আইন কার্যকর করার বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) থেকেই কার্যকর হয়ে যাচ্ছে ১০৬তম সংবিধান সংশোধনী আইন। শনিবার বিরোধীদের তরফে অবিলম্বে ওই আইন মেনে, লোকসভার আসনসংখ্যা ৫৪৩-এ সীমাবদ্ধ রেখেই তার মধ্যে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত এক-তৃতীয়াংশ আসন চিহ্নিত করার দাবি তোলা হয়েছে।
প্রসঙ্গত লোকসভার আসন বাড়িয়ে ৮৫০ করে মহিলাদের সংরক্ষণ চালুর উদ্দেশ্যে আনা ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল শুক্রবার লোকসভায় পাশ করাতে পারেনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার। দু’দিনের বিতর্ক পর্ব শেষে শুক্রবার বিকেলে বিল নিয়ে ভোটাভুটি হয়। বিলের পক্ষে পড়ে ২৯৮টি ভোট। বিপক্ষে ২৩০টি। মোট ৫২৮ জন সাংসদ ভোটাভুটিতে যোগ দেন। সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিল পাশের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। তা পেতে ব্যর্থ হয়েছে মোদী সরকার। কংগ্রেস, তৃণমূল, বাম-সহ বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র দলগুলির সাংসদেরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিলের বিরোধিতায় ভোট দেন। শনিবার উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ, অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নায়ডু-সহ শাসক শিবিরের নেতারা বিরোধী শিবিরকে ‘মহিলাবিরোধী’ হিসাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালিয়েছেন।
বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র এই রণকৌশল সম্পর্কে বিরোধীরা আগে থেকেই অবহিত ছিল বলে প্রিয়ঙ্কার দাবি। তিনি বলেন, “তাঁরা (বিজেপি জোট) ভেবেছিলেন, যদি বিল পাশ হয়, তবে ভাল। আর যদি ব্যর্থ হয়, তা হলে বিরোধীদের নারীবিরোধী হিসাবে তুলে ধরার এবং নিজেদের নারীদের রক্ষাকর্তা হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা চালাবেন। বিরোধী নেতাদের যুক্তি, ২০২৩ সালে ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’ বিল পাশ হয়েছিল লোকসভা এবং রাজ্যসভায়। মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের ওই বিলে বলা হয়েছিল, জনগণনার পরে আসন পুনর্বিন্যাস করা হবে। তার পর ওই আসনের এক-তৃতীয়াংশ সংরক্ষণ করা হবে মহিলাদের জন্য। কিন্তু এখন আর জনগণনা পর্যন্ত অপেক্ষা না করে দু’টি পৃথক বিষয়কে কেন একসঙ্গে জুড়ে দেওয়া হল, সে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহেরা লোকসভায় অভিযোগের সদুত্তর দেননি। তা ছাড়া, বিরোধীদের অভিযোগ, জনগণনার আগেই সুবিধামতো আসন পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির প্রভাব খর্ব করে উত্তর ভারতের আসনের অনুপাত বাড়িয়ে নেওয়াই উদ্দেশ্য, যেখানে বিজেপির প্রভাব অনেক বেশি। আর সেই কারণেই সংবিধান সংশোধনী বিলে লোকসভার আসন বৃদ্ধির সঙ্গে মহিলা সংরক্ষণকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। প্রিয়ঙ্কা শনিবার বলেন, “পুরো ষড়যন্ত্রটি ছিল ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য। তাঁরা ভেবেছিলেন, যদি এখন সীমা নির্ধারণ (ডিলিমিটেশন) না করা হয়, তবে ২০২৯-এর আগে তা করা হবে না, যাতে তাঁরা ক্ষমতায় থাকতে পারেন।”
শুক্রবার লোকসভায় বিতর্ক পর্বে জনগণনার আগেই তড়িঘড়ি বিল পাশের উদ্যোগ নিয়ে কেন্দ্রকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর অভিযোগ ছিল, বর্তমান খসড়া কার্যকর হলে অনগ্রসর (ওবিসি) মহিলারা বঞ্চিত হবেন। তিনি বলেন, ‘‘এই বিলের সঙ্গে মহিলাদের ক্ষমতায়নের কোনও সম্পর্কই নেই। এই বিল আসলে ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র। বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া সংসদের তিন দিনের বিশেষ অধিবেশনে তিনটি বিল পাশ করাতে সক্রিয় ছিল কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়ালের পেশ করা তিনটি বিলের প্রথমটি— লোকসভা এবং বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভায় মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল ( পোশাকি নাম, ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’। লোকসভার সাংসদ সংখ্যা বাড়িয়ে ৮৫০ করার বিষয়টি এরই অন্তর্গত), দ্বিতীয়টি— লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস (ডিলিমিটেশন) সংক্রান্ত বিল। তৃতীয়টি— কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আইন সংশোধনী বিল (কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে আসনবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে)। প্রথম বিলটি পাশ না হওয়ায়, পরের দু’টি নিয়ে ভোটাভুটির পথে হাঁটেনি কেন্দ্র।