স্কুলের ব্যাগটা বড্ড ভারী...আমরা কি আর বইতে পারি!!!
তার বয়স কম। চেহারাতেও একরত্তি। তবু জন্মের ৪১ বছরের মধ্যেই তা করে দেখাল বাংলাদেশ।
আর আমরা, তার পাশের দেশ ভারত, এই একাত্তরেও সেই ‘বুড়ো খোকা’টিই রয়ে গেলাম! করে দেখাতে পারলাম না!
শিশুদের পিঠের বোঝাটা আর কিছুতেই কমাতে পারলাম না দেশের সর্বত্র। এমনকী, আমাদের রাজ্যেও।
ফলে, শিশুদের পিঠের বোঝাটাই আমাদের ‘ভবিষ্যতের বোঝা’ হয়ে উঠছে! নতুন প্রজন্ম ক্ষয়ে যাচ্ছে শরীরে, মনে। ‘ব্যাগবোঝাই’ কচিকাঁচারা ‘গিনিপিগ’ হচ্ছে ‘বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাই’ বানানোর ল্যাবরেটরিতে! অফুরান মজা আর অনাবিল আনন্দে হেসে-খেলে বেড়ানোর দিনগুলিতে শিশুদের পিঠে বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের শরীরের স্বাভাবিক বাড়-বৃদ্ধির সময়টাকে অযথা, অকারণে জটিল করে তোলা হচ্ছে। কোন বয়সে শিশুরা কী চায়, তা ভুলে যাওয়া হচ্ছে। শিশু-মন নিয়ে বোধহয় অযথা, অকারণেই বেশি খেলা করা হচ্ছে। শিশু অধিকার রক্ষা সংস্থার কর্তা, শিশু মনস্তাত্বিক, চিকিৎসক, আইনজীবী ও প্রশাসক, সকলেরই মতামত এটা।
কবে যে হাল্কা হবে পিঠের এই বোঝা!...
বিক্ষিপ্ত ভাবে আইন-আদালতের বিধি-বিধান সত্ত্বেও দু’-একটি ব্যাতিক্রম বাদ দিলে এটাই গোটা ভারতের ছবি। পশ্চিমবঙ্গও তার বিশেষ ব্যাতিক্রম নয়। গত দু’-তিন বছরে রাজ্যে সরকারি স্কুলগুলোয় কিছুটা ‘পালাবদলের হাওয়া’ বইতে শুরু করলেও, তা সিন্ধুতে কার্যত, বিন্দুর মতোই! রাজ্যের সিবিএসই, আইসিএসই স্কুলগুলোয় তো বটেই, পশ্চিমবঙ্গ বোর্ডের আওতায় থাকা বেসরকারি স্কুলগুলোতেও শিশুদের এখনও ‘বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাই’ বানানোর ল্যাবরেটরির ‘গিনিপিগ’ বানানো হচ্ছে, কচিকাঁচাদের পিঠগুলোকে ‘ব্যাগবোঝাই’ করে!
আরও পড়ুন- শিশুদের স্কুলব্যাগের ওজন বেঁধে দিল বাংলাদেশ হাইকোর্ট
রাজ্যের স্কুল শিক্ষা দফতরের অধীন বিশেষজ্ঞ কমিটির চেয়ারম্যান, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অভীক মজুমদারের কথায়, ‘‘শিশুদের স্কুল ব্যাগের ওজনের দিকে কোনও নজরই দেওয়া হচ্ছে না। সিবিএসই এবং আইসিএসই বোর্ডের স্কুলগুলিতে। একই হাল পশ্চিমবঙ্গ বোর্ডের আওতায় থাকা বেসরকারি স্কুলগুলিরও। অত্যন্ত করুণ পরিস্থিতি। ৬ বছর থেকে ৮ বছর বা তার একটু বেশি বয়সের শিশুদের কাঁধে ভারী স্কুল ব্যাগ চাপানো হয় না পৃথিবীর কোথাওই। গোটা বিশ্বেই এটা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।’’
কী ভীষণ এই স্কুল ব্যাগ!
অথচ এই সে দিন বাংলাদেশ হাইকোর্ট একেবারে নির্দেশ জারি করে দিয়েছে যে, গড় ওজনের ১০ শতাংশের বেশি ভারী স্কুল ব্যাগ সে দেশের প্রাথমিক স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের বইতে দেওয়া যাবে না। আর সদ্য স্কুলে যাওয়া, মানে, প্রাক-প্রাথমিক স্তরের (প্লে স্কুল বা প্রি-প্রাইমারি) শিশুদের কাঁধে-পিঠে কোনও ধরনের বইয়ের ব্যাগই চাপানো যাবে না।
স্কুলের ব্যাগটা বড্ড ভারী...আমরা কি আর বইতে পারি...
আমাদের দেশের হতভাগ্য শিশুদের অবস্থাটা কী রকম?
তাদের এখন বোঝা বয়েই যেতে হচ্ছে। গড়ে ৫ কেজি ৬০০ গ্রাম থেকে সাড়ে ৭ কেজি ওজনের বইবোঝাই স্কুল ব্যাগ। রোজ। বাড়ি থেকে স্কুলে যাওয়া আর স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময়। যারা সরকারি স্কুলে পড়ে, সেই শিশুরা বোধহয় একটু চওড়া কপাল নিয়েই জন্মেছে! তাদের বইতে হচ্ছে কম-বেশি ৩ কেজি ৭০০ গ্রাম। সেটাই বিচিত্র এই দেশে শিশুদের পিঠে চাপানো সবচেয়ে হাল্কা স্কুল ব্যাগের ওজন! কেন্দ্রীয় সরকারের ডিপার্টমেন্ট অফ স্টেট এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (ডিএসইআরটি)-এর একেবারে হালের সমীক্ষা থেকেই এই তথ্য পাওয়া গিয়েছে। ওই সমীক্ষাই জানাচ্ছে, ওই শিশুদের মধ্যে কার্যত গড়ে, বেশি ‘বলির পাঁঠা’ হতে হচ্ছে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদেরই। স্কুল ব্যাগে তাদের রোজ সাড়ে ১০টি করে বই বাড়ি থেকে বয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে স্কুলে। আর ছুটির ঘণ্টা বাজলে সেই বইগুলি নিয়ে তাদের বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। বই ছাড়াও আনুষঙ্গিক আরও অনেক কিছু তাদের বয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে স্কুলে। আর তা রোজ বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে হচ্ছে।
স্কুল ব্যাগের সবচেয়ে বেশি কতটা ওজন রোজ বইতে হচ্ছে শিশুদের?
ডিএসইআরটি’র ওই হালের সমীক্ষা জানাচ্ছে, এ ব্যাপারে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়গুলির দশম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা। তাদের রোজ গড়ে ৮ কেজি ওজনের স্কুল ব্যাগ বইতে হচ্ছে। স্কুলে যেতে ও স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতে। আর তার পরেই রয়েছে সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত স্কুলগুলির ছাত্রছাত্রীরা। তাদের গড়ে রোজ বইতে হচ্ছে ৬ কেজি ৭০০ গ্রাম ওজনের স্কুল ব্যাগ। ভাবুন, কী ‘বিভীষণ’ বোঝা আমরা চাপিয়ে দিচ্ছি ‘ব্যাগবোঝাই’ শিশুদের পিঠে, তাদের ‘বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাই’ বানানোর তাগিদে!
কী বলছেন শিশু চিকিৎসকরা? কোন বয়সে শিশুদের কাঁধে সর্বাধিক কতটা ওজন চাপানো উচিত?
এ ব্যাপারে বিভিন্ন শিশু চিকিৎসকরা যা বলেছেন, তার নির্যাস-
১) প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া শিশুদের পিঠে রোজ ১ কেজি ওজনের বেশি স্কুল ব্যাগ চাপানো উচিত নয়।
২) তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া শিশুদের পিঠে রোজ ২ কেজি ওজনের বেশি স্কুল ব্যাগ চাপানো উচিত নয়।
৩) পঞ্চম থেকে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের পিঠে রোজ ৪ কেজি ওজনের বেশি স্কুল ব্যাগ চাপানো উচিত নয়।
৪) অষ্টম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের পিঠে রোজ ৫ কেজি ওজনের বেশি স্কুল ব্যাগ চাপানো একেবারেই অনুচিত।
এর থেকেই স্পষ্ট, শিশু চিকিৎসকরা যা বলছেন, তা দেশের প্রায় সর্বত্রই মানা হচ্ছে না। শিশুদের পিঠে স্কুল ব্যাগের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে।
এ ব্যাপারে কী বলেছিল যশপাল কমিটির রিপোর্ট?
১৯৯৩ সালে তদানীন্তন কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী অর্জুন সিংহের কাছে ‘লার্নিং উইদাউট বার্ডেন’ নামে একটি রিপোর্ট জমা দেয় বিশিষ্ট অধ্যাপক যশপালের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল অ্যাডভাইসারি কমিটি। পরে মুখে মুখে সেই রিপোর্টেরই নাম হয়ে যায় ‘যশপাল কমিটি রিপোর্ট’। শিশুদের স্কুল ব্যাগের ওজন নিয়ে সেই রিপোর্টে স্পষ্ট ভাবেই কয়েকটি সুপারিশ করা হয়। সেই সুপারিশগুলির মধ্যে রয়েছে:
১) কোন বয়সে কোন উচ্চতার শিশুদের সর্বাধিক কতটা ওজনের স্কুল ব্যাগ বহন করা উচিত তা নির্দিষ্ট করে দেওয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করা হোক।
২) এ ব্যাপারে শিক্ষক, অভিভাবক, স্কুল পরিচালন কমিটির সদস্যদের বাধ্যতামূলক ভাবে সচেতন করে তোলা হোক।
৩) দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিশুদের স্কুল ব্যাগ বহন করা একেবারেই নিষিদ্ধ করা হোক। তাদের স্কুল ব্যাগগুলি স্কুলেই রাখার ব্যবস্থা করা হোক, জরুরি ভিত্তিতে।
৪) যে সব স্কুল এই নিয়ম মেনে চলবে না, তাদের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করা হোক।
৫) শিশুদের স্কুল ব্যাগগুলি স্কুলেই রাখার জন্য প্রতিটি শ্রেণির প্রতিটি ক্লাস রুমে ‘র্যাক’ বানানো হোক বা রাখা হোক আলমারি।
কতটা মেনে চলা হচ্ছে ‘যশপাল কমিটির রিপোর্ট’?
কিন্তু দেশের অধিকাংশ রাজ্যের বেশির ভাগ স্কুলেই (সিবিএসই, আইসিএসই বোর্ড, পশ্চিমবঙ্গ বোর্ডের আওতায় থাকা বেসরকারি স্কুল, প্রাক-প্রাথমিক স্তর ও প্রাথমিক স্তরের স্কুল) সেই নিয়ম যথাযথ ভাবে এখনও মেনে চলা হচ্ছে না।
স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘মন ফাউন্ডেশন’-এর অন্যতম কর্তা, শিশু মনস্তাত্বিক মোহিত রণদীপের বক্তব্য, ‘‘এর জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ তো বটেই, অভিভাবকরাও কম দায়ী নন। তাঁরা শিশুদের ‘বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাই’ বানানোর তাগিদে স্কুল ব্যাগকে ভারী করে তোলায় হাত লাগিয়েছেন! বেশি বই স্কুলে নিয়ে গেলেই ছেলেমেয়েরা একেবারে ‘বিদ্যেবোঝাই’ হয়ে উঠবে, এখনও এমনটাই মনে করেন অনেক তথাকথিত শিক্ষিত মা, বাবা, অভিভাবকরা। শিশুরা না চাইলেও তাঁরা তাঁদের স্কুল ব্যাগগুলিকে বই ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জামে ভারী করে তোলেন। এ ব্যাপারে মায়েদের একাংশের উদ্বেগটাই আমাদের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। আর তার ছাপ পড়ছে তাঁদের স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েদের মানসিক কাঠামো ও শারীরিক গঠনের ওপর। এই মূহুর্তে রাজ্যের প্রতি চারটি শিশুর মধ্যে কম করে একটি শিশু কোনও না কোনও মানসিক সমস্যায় ভুগছে। পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে আমরা একটি সমীক্ষা করেছিলাম ’৯৭ থেকে ’৯৯ সালের মধ্যে। তাতে দেখেছিলাম, রাজ্যের অন্তত ২৩.৮ শতাংশ স্কুলপড়ুয়া শিশু ভুগছে নানা রকমের মানসিক সমস্যায়। সেই ছবিটার যে এখন খুব একটা হেলদোল হয়েছে, তা কিন্তু নয়। বরং, কোনও কোনও ক্ষেত্রে তা আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।’’
স্কুলপড়ুয়া শিশুদের শিক্ষাকে কী ভাবে ‘আদর্শ’ করে তোলা যেতে পারে?
দীর্ঘ দিন শিক্ষার পরিসরে কাজ করা মানুষ, রাজ্য শিশু অধিকার সুরক্ষা আয়োগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান অশোকেন্দু সেনগুপ্ত বলছেন, ‘‘কড়া নজর রাখতে হবে, স্কুলটা যেন শিশুদের জেলখানা না হয়ে ওঠে! সেখানে তারা যেন হেসে-খেলে, আনন্দ করতে করতে লেখাপড়াটা করতে পারে। ‘খেলতে খেলতে শেখো’। এটাই যেন শিশু-শিক্ষার ‘বীজমন্ত্র’ হয়ে ওঠে। স্কুলে শিশুদের বেশি বেশি করে খেলতে দেওয়া হোক। হাসতে দেওয়া হোক। আনন্দ করতে দেওয়া হোক। আর শুধুই স্কুল ব্যাগের ওজন নয়, তাদের পড়ার চাপটাও কমানো হোক, জরুরি ভিত্তিতে। এ ব্যাপারে শুধু স্কুল-কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক, শিক্ষিকাদের সতর্ক করলেই হবে না, মা-বাবা, অভিভাবকদেরও সচেতন করতে হবে। প্রয়োজনে তাঁদের নিয়ে ‘বিশেষ ক্লাস’ও (গার্জেন্স ট্রেনিং) করানো যেতে পারে স্কুলে স্কুলে। মনে রাখতে হবে শিক্ষাটা যেন শিশুদের কাছে একটা বিশাল বোঝা হয়ে না ওঠে! রবীন্দ্রনাথ ‘তোতা কাহিনী’তে যেমন বলেছিলেন, ‘যাকে বলে শিক্ষা’, তা যেন কখনওই না হয়ে ওঠে শিশুদের কাছে! তাই অধ্যাপক যশপালের নেতৃত্বাধীন কমিটির রিপোর্টেরও নাম ছিল- ‘লার্নিং উইদাউট বার্ডেন’। কোনও বোঝা ছাড়াই শিক্ষা।’’
পশ্চিমবঙ্গে কি এ ব্যাপারে কোনও ‘পালাবদলের হাওয়া’ বইতে শুরু করেছে?
রাজ্যের স্কুল শিক্ষা দফতরের অধীন বিশেষজ্ঞ কমিটির চেয়ারম্যান, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক অভীক মজুমদারের দাবি, ‘‘এ ব্যাপারে গত চার বছরে রাজ্যে শুধুই যে পালাবদলের হাওয়া বইতে শুরু করেছে, তা নয়; তা উত্তরোত্তর জোরালো হয়ে উঠছে। ২০১২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন, ‘যশপাল কমিটির রিপোর্ট’-এর সুপারিশগুলিকে যত তাড়াতাড়ি ও যতটা সম্ভব রাজ্যের স্কুলগুলিতে কার্যকর করা হবে। সেই লক্ষ্যে, শিশুদের স্কুল ব্যাগের ওজন কমাতে আমরা তাদের বইয়ের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছি। কমিয়েছি বইয়ের ওজনও। অনেকগুলি বইয়ের বদলে আমরা ‘কম্বাইন্ড’ বই বানিয়েছি। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের জন্য আমরা ‘কম্বাইন্ড’ বই বানিয়েছি। যা ভারতে প্রথম। সেই বইয়ে আমরা প্রথম ও দ্বিতীয় ভাষা ছাড়াও গণিত, ছবি আঁকা, ফিজিক্যাল এডুকেশন ও ‘অ্যাকটিভিটি বুক’-এ যা যা থাকে, সেই সব কিছুই রাখা হয়েছে। যার মানে, এক সঙ্গে ৬টি বিষয়ের বইয়ের বিষয়বস্তু আমরা একটি ‘কম্বাইন্ড’ বইয়ে রাখতে পেরেছি। তাদের স্কুলে যেতে হচ্ছে এখন শুধুই ‘সহজ পাঠ’ (‘আমার বই’)-এর প্রথম আর দ্বিতীয় ভাগ নিয়ে। বাকি বাইগুলি স্কুলেই রাখা থাকছে। তার জন্য গ্রামাঞ্চল-সহ রাজ্যের ৩০ হাজার স্কুলের প্রতিটি ক্লাসের প্রতিটি সেকশনের ঘরে আনাদা আলমারি রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তৃতীয়, চতুর্থ আর পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের জন্যেও বানানো হয়েছে ‘কম্বাইন্ড’ বই। সেখানে থাকছে প্রথম, দ্বিতীয় ভাষা ‘আমাদের পরিবেশ’ আর শারীর শিক্ষা সংক্রান্ত বইগুলির বিষয়বস্তু। তার মানে, আলাদা চারটি বইয়ের প্রয়োজন মিটেছে মাত্র একটি ‘কম্বাইন্ড’ বইয়ের মাধ্যমে।আর সেই বইগুলির ওজন গড়ে ৩০০ গ্রাম। তার মানে, বড়জোর ১২০০ গ্রামের বেশি বইয়ের ওজন শিশুদের বইতে হচ্ছে না। আর ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের ৭টি আলাদা বইয়ের প্রয়োজন মেটাচ্ছে এখন একটি ‘কম্বাইন্ড’ বই। সেই বইয়ে থাকছে প্রথম ও দ্বিতীয় ভাষা ছাড়াও গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল আর শারীর শিক্ষা সংক্রান্ত বইগুলির বিষয়বস্তু। ওই বইয়ের সর্বাধিক ওজন ৩ কেজির সামান্য বেশি।’’
ক্ষেত্রটা কিছুটা ভিন্ন হলেও প্রায় একই রকম দাবি করেছেন রাজ্যের শিশু, মহিলা ও কল্যাণ দফতরের সচিব রোশনী সেন। তাঁর কথায়, ‘‘আগের চেয়ে অবস্থা অনেক বদলে গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। আইসিডিএস প্রকল্পের অধীনে ৩ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ‘খেলার ছলে লেখাপড়া’ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে অন্তত এক হাজার স্কুলে।’’
বদল, বদল, বদল চাই...
তবু যাঁরা শিশুদের অধিকার রক্ষা নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে লড়াই করে চলেছেন, তাঁদের মতে, এখনও যেতে হবে অনেক অনেক দূর। নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে। সর্বভারতীয় শিশু অধিকার রক্ষা সংস্থা ‘চাইল্ড রাইট্স অ্যান্ড ইউ-ক্রাই’ (ইস্ট) -এর আঞ্চলিক অধিকর্তা অতীন্দ্রনাথ দাস বলছেন, “স্কুলপড়ুয়াদের বইয়ের ব্যাগের ওজন কোনও নির্দিষ্ট ঊর্ধ্বসীমার মধ্যে থাকা উচিত কিনা, তা নিয়ে আমাদের শিক্ষার অধিকার আইনে সুস্পষ্ট কোনও নির্দেশিকা না-থাকলেও, বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মহলে আলাপ-আলোচনা চলছে। ১৯৯৩ সালে কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকে ‘লার্নিং উইদাউট বার্ডেন’ নামে যশপাল কমিটি যে রিপোর্ট জমা দেয় সেখানে খুব স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছিল, পিঠে ভারী ব্যাগ বয়ে স্কুলে যেতে কোনও শিশুকে বাধ্য করা উচিত নয়। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, একদিকে তা যেমন পড়ুয়াদের স্বাস্থ্যের পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক, তেমনই তা পড়াশোনার আনন্দকেও কমিয়ে দেয় অনেকটাই। ২০০৬ সালে ‘চিলড্রেন স্কুলব্যাগস (লিমিটেশন অন ওয়েট)’ নামে একটি বিল রাজ্যসভায় পেশ হয়েছিল, কিন্তু তা নিয়েও পরে আর তেমন উচ্চবাচ্য শোনা যায়নি। তবে কেন্দ্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড-এর (সিবিএসই) ২০০৯-১০ সালের সার্কুলার এ-বিষয়ে খুব স্পষ্ট দিকনির্দেশ করেছে। সেই নির্দেশিকা অনুসারে, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে স্কুলব্যাগের ওজন হতে হবে দু’কেজি-র কম, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ক্ষেত্রে তা থাকতে হবে তিন কেজি-র নীচে। পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই ঊর্ধ্বসীমা চার কেজি, এবং নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির জন্য ছ’কেজি। অথচ আমাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখি একেবারে প্রাথমিক স্তরের পড়ুয়াদেরও দিনের পর দিন চার-পাঁচ কেজি ওজনের ব্যাগ পিঠে নিয়ে স্কুলে যেতে। বিষয়টি যে তাদের পক্ষে কতটা দুরূহ তা বোঝা যায়, যখন দেখি স্কুল থেকে ফেরার পথে প্রায়ই তাদের বাবামায়েরা সন্তানের ‘বিদ্যের বোঝা’ ঘাড়ে নিয়ে চলেছেন।শিক্ষাকে যদি শিশুদের আনন্দের উৎস হিসেবে আমরা দেখতে চাই, তা হলে অতি অবশ্যই তাদের ব্যাগের বোঝা কমানোর বিষয়টি নিয়ে আমাদের সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হবে। এবং মনে রাখতে হবে, তা যত শিগগির সম্ভব হয় স্কুলপড়ুয়াদের পক্ষে ততই মঙ্গল।”
দাবি আর পাল্টা দাবির মধ্যে সত্যটা এই, ভারী স্কুল ব্যাগের বোঝা বইতে গিয়ে শিশুদের কান্নাটা আর চাপা থাকছে না!