শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর ভাবনা ধর্মঘটের মুখে

চাপের মুখে নরম হতে চাইছেন নরেন্দ্র মোদী! নাকি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়ে আর্থিক বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পথে এগোতে চাইছেন তিনি! কারণ যা-ই হোক, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি এক লাফে বেশ খানিকটা বাড়ানোর কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে মোদী সরকার। কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রকের শীর্ষ সূত্রের খবর, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি অন্তত ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় আলোচনার জন্য নোট পাঠানো হবে।

Advertisement

প্রেমাংশু চৌধুরী

নয়াদিল্লি শেষ আপডেট: ২৭ অগস্ট ২০১৫ ০৩:৩৩
Share:

চাপের মুখে নরম হতে চাইছেন নরেন্দ্র মোদী! নাকি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়ে আর্থিক বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পথে এগোতে চাইছেন তিনি! কারণ যা-ই হোক, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি এক লাফে বেশ খানিকটা বাড়ানোর কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে মোদী সরকার। কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রকের শীর্ষ সূত্রের খবর, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি অন্তত ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় আলোচনার জন্য নোট পাঠানো হবে।

Advertisement

মজুরি বাড়ানোর এই ভাবনার পিছনে মোদী সরকারের অন্য দায়ও কম নয়। আগামী ২ সেপ্টেম্বর দেশ জুড়ে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে শ্রমিক সংগঠনগুলি। কংগ্রেসি-বাম থেকে শুরু করে সঙ্ঘ পরিবারের শ্রমিক সংগঠন বিএমএস-ও তাতে সামিল রয়েছে। এই ধর্মঘট বানচাল করতে মোদী সরকার মরিয়া। কারণ, দেশ জুড়ে শ্রমিকরা ধর্মঘট করলে এবং তাতে শাসক শিবিরের সংগঠন যোগ দিলে ভুল বার্তা যাবে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে। তাই শ্রমিক সংগঠনগুলির মন জয় করে ধর্মঘট ঠেকানো বা নিদেনপক্ষে সঙ্ঘ-শিবিরের শ্রমিক সংগঠনকে তা থেকে সরিয়ে আনাটাও কম জরুরি নয় সরকারের কাছে।

কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলির নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিগোষ্ঠী আজ শ্রমিক সংগঠনগুলির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে তাঁদের দাবিদাওয়া নিয়ে। গত জুলাই মাসেই জাতীয় স্তরে ন্যূনতম দৈনিক মজুরি ১৩৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬০ টাকা করেছে কেন্দ্র। তাতে মাসিক মজুরি দাঁড়ায় ৪,৮০০ টাকায়। শ্রমিক সংগঠনগুলির অন্যতম দাবি, ন্যূনতম মাসিক বেতন ১৫ হাজার টাকা করতে হবে।

Advertisement

ন্যূনতম বেতনের ক্ষেত্রে কী প্রস্তাব দিচ্ছে সরকার?

শ্রম মন্ত্রক সূত্রের খবর, কর্মস্থলে থাকাবাঁচার খরচ ও দক্ষতা— এই দু’টি মাপকাঠির ভিত্তিতে মজুরি ঠিক করার কথা ভাবা হচ্ছে এ বার। তাতে মহারাষ্ট্র, গোয়া, দিল্লির মতো যে সব রাজ্যে মাথাপিছু আয় বেশি, সেখানে প্রশিক্ষণহীন শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি হতে পারে ৮ হাজার টাকার কাছাকাছি। মাথাপিছু আয়ের হিসেবে নীচের সারিতে থাকা বিহার, উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যে তা ৬ হাজার টাকার আশেপাশে থাকবে। অর্ধপ্রশিক্ষিত শ্রমিকরা এর দেড় গুণ এবং প্রশিক্ষিত শ্রমিকরা এর দ্বিগুণ মজুরি পাবেন। তাতে আর্থিক ভাবে এগিয়ে থাকা রাজ্যগুলিতে অর্ধপ্রশিক্ষিত শ্রমিকদের মজুরি ১০ হাজারের কাছাকাছি এবং প্রশিক্ষিত শ্রমিকদের মজুরি ১৫ হাজার কাছাকাছিই পৌঁছে যাবে।

বৈঠকে সরকারের মৌখিক প্রস্তাব খারিজ করে দিয়ে শ্রমিক সংগঠনগুলি সরকারের তরফে লিখিত প্রতিশ্রুতি দাবি করে। সরকার তাতে রাজি হয়নি। কাল ফের বৈঠক হবে। সিটু-বিএমএস নেতারা জানিয়ে দিয়েছেন, ধর্মঘটে অনড়ই রয়েছেন তাঁরা।

কী বলছেন শ্রমমন্ত্রী বন্দারু দত্তাত্রেয়? তাঁর বক্তব্য, ‘‘শ্রমিক বিষয়টি কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ তালিকায় রয়েছে। তাই আমরা ন্যূনতম মজুরি বেঁধে দিতেই পারি। রাজ্যগুলি সেটি কেন্দ্রের পরামর্শ হিসেবে দেখবে।’’ তবে ন্যূনতম মজুরি আইনে সংশোধন করেই এ বার নতুন মজুরি বেঁধে দিতে চাইছে শ্রম মন্ত্রক।

শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নিয়ে সরকারের এতটা দরাজ ও তৎপর হওয়ার কারণ কী?

সরকারি সূত্রের বক্তব্য, মোদী যে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র ডাক দিয়েছেন, তার জন্য দেশে প্রচুর প্রশিক্ষিত কর্মী প্রয়োজন। দক্ষ কর্মী তৈরির জন্য আলাদা প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে। মজুরি দেড় থেকে দুই গুণ হবে যাবে দেখলে প্রশিক্ষণহীন শ্রমিকরাও প্রশিক্ষণ নিতে চাইবেন। নিজের কাজে যথেষ্ট মজুরি পেলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রমিকদের বিদেশে বা ভিন্ রাজ্যে যে কোনও কাজ জুটিয়ে চলে যাওয়ার ঝোঁকও কমবে। ন্যূনতম মজুরি বাড়লে লাভ অর্থনীতিরও। তাতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। বাজারে চাহিদা বাড়বে। সেই অনুযায়ী উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে। প্রত্যাশা মতো বিদেশি লগ্নি যখন আসছে না, তখন দেশীয় চাহিদা বাড়িয়েই আর্থিক বৃদ্ধির পথ খুঁজতে চাইছে সরকার।

মন্ত্রিগোষ্ঠীর সদস্যরা মনে করছেন, শুধু সিটু ও এআইটিইউসিই ধর্মঘটে অনড়। বিএমএস সুর নরম করেছে অনেকটা। সরকার তাদের মুখরক্ষার কিছু একটা ব্যবস্থা করে দিলে বিএমএস-ও ধর্মঘট থেকে বেরিয়ে আসার পথ পাবে। বিএমএস নেতা বৈজনাথ রাই অবশ্য এ দিনও বলেছেন, ‘‘সরকার দাবি মানার প্রতিশ্রুতি না দিলে আমরা ধর্মঘট থেকে সরছি না।’’ শ্রমমন্ত্রী দত্তাত্রেয়র পাল্টা যুক্তি, ‘‘সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান বাড়ানো, মূল্যবৃদ্ধির হার কমানোর মতো দাবি মেনে নিয়ে সরকার ইতিমধ্যেই পদক্ষেপ করেছে।’’

২ সেপ্টেম্বরের ধর্মঘট ব্যর্থ করতে প্রশাসনিক ভাবেও তৎপর কেন্দ্র। অর্থ মন্ত্রক বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী ধর্মঘটে অংশ নিলে শাস্তির ব্যবস্থা হবে। অফিসে এসে কাজ-বন্ধ , ধীরে চলো বা অবস্থান বিক্ষোভে অংশ নিলেও সেটা ধর্মঘট হিসেবে ধরা হবে। সে দিন ‘ক্যাজুয়াল লিভ’-ও মঞ্জুর করা হবে না।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
Advertisement
Advertisement
আরও পড়ুন