রঞ্জি ট্রফির ফাইনালে জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা। কেএসসিএ স্টেডিয়ামে। ছবি: পিটিআই।
শনিবারের পড়ন্ত বিকেলে কর্নাটকের হুবলির স্টেডিয়ামে স্বপ্নপূরণের উচ্ছ্বাসে আকাশে উড়েছিল নীল, সাদা আবির। সেই দুরন্ত আবেগের সংক্রমণ প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরের শ্রীনগরে পৌঁছতে এক মিনিটও সময় নেয়নি। কারণ, রঞ্জি ট্রফির ফাইনালে সবাইকে হারিয়ে ভারতের মধ্যে এক নম্বরে উঠে আসা জম্মু-কাশ্মীর দল এখানকার মানুষের মনে শুধু ক্রিকেট জয়ের তৃপ্তিই নিয়ে আসেনি, নিয়ে এসেছে মর্যাদা আর আত্মবিশ্বাসের এক অদ্ভুত মিশেল, যার জন্য যেন এতদিন অপেক্ষায় ছিল এখানকার মানুষজন।
না হলে শ্রীনগরের লাল চক থেকে শুরু করে জম্মু কিংবা বারামুলা শহরে উচ্ছ্বাসের এমন ব্যতিক্রমী ছবি চোখে পড়ত না। বছর বছর ধরে, দিনরাত কাশ্মীরের যেসব এলাকায় চলে এসেছে সন্ত্রাসের চোখরাঙানি, প্রতি মুহূর্তে রয়ে গিয়েছে অনিশ্চিত জীবনের ঝুঁকি, ক্রিকেটে জয়ের নির্মল আনন্দে আজ সেই এলাকাগুলিতেই জ্বলে উঠেছে আতশবাজি। মন ভরে বাজি ফাটিয়েছেন মানুষজন। কর্নাটকের টিমকে হারিয়ে এই প্রথমবার রঞ্জি ট্রফি ঘরে এনেছে জম্মু-কাশ্মীর। ৬৭ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা। তবে হুবলির কেএসসিএ স্টেডিয়ামে আজ যখন সেই স্বপ্নপূরণের ঘটনাটা ঘটেই গেল, তখন থেকেই খুশির বাঁধ ভেঙেছে জম্মু-কাশ্মীরের মানুষের মনে। ক্রিকেটের জয় এক অন্য কাশ্মীরকে নিয়ে এসেছে সকলের সামনে। যেখানে অস্ত্রের চোখরাঙানি নেই। নেই ভীতির বাতাবরণ কিংবা বিচ্ছিন্নতার হাতছানি। বরং সে সবের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে এক অদ্ভুত আনন্দ গ্রাস করেছে উপত্যকাকেও। যে আনন্দ নেহাতই সবার সঙ্গে খেলতে পারার আর জয় ছিনিয়ে নেওয়ার গর্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। জম্মু-কাশ্মীরের ইতিহাস গড়ার দিনে সমাজমাধ্যমও ভরে গিয়েছে অভিনন্দনের বন্যায়।
আবেগে ভেসে যাওয়া, গর্বিত জম্মু-কাশ্মীরের সেই ছবিটা আজ চোখে পড়েছে সব প্রান্তে। রঞ্জির ফাইনালে যাওয়ার আগেই অবশ্য বারামুলার আকিব নবি, কালাকোটের আব্দুল সামাদ, ডোডার আবিদ মুস্তাক কিংবা জম্মুর বংশরাজ শর্মা, সুনীল কুমারেরা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, এবার এক জোট হয়ে আত্মবিশ্বাস নিয়ে নেমেছেন তাঁরা। ঘরের মাটির রাজনৈতিক টানাপড়েন ছুঁতে পারবে না তাঁদের। ফাইনালে শক্তিশালী কর্নাটককে হারিয়ে সেটাই ফের প্রমাণ করেছেন তাঁরা। তাই জয়ের উচ্ছ্বাসের ছবিটা ভৌগোলিক ভাবেও ছড়িয়ে পড়েছে জম্মু-কাশ্মীরের সর্বত্র, কোনও ভেদাভেদের বার্তা না দিয়েই। আকিব নবির শহর বারামুলায় স্থানীয় মানুষজন স্বতঃস্ফূর্ত আবেগে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে মিছিল করেছেন। যুবক ক্রিকেটাররা তাঁদের ‘নতুন হিরো’ আকিবের পোস্টার বুকে নিয়ে মিছিলে যোগ দিয়েছেন। আবেগে আপ্লুত নবির ভাই ইমতিসার বলেন, ‘‘আজ হয়তো অনেকেই নবির উইকেট কিংবা রেকর্ডের কথা ভাবছেন। কিন্তু এর পিছনে আত্মত্যাগের গল্পটা অনেকে দেখছেন না। একটা সময় ছিল, যখন ম্যাচ খেলতে পৌঁছনোটাই কঠিন ছিল।’’ জম্মু-কাশ্মীর দলের আর এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য কামরান ইকবালের ভাই জামশির কথায়, ‘‘কামরান ভাই আমাদের কাছে নায়ক। আজকের জয় এখানকার যুব সমাজকে হাতে ব্যাট তুলে নিতে আর স্বপ্ন দেখতেউৎসাহিত করছে।’’
যুব সমাজের মধ্যে পরিবর্তনের এই বার্তাকে বুঝতে পেরেই মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা নিজেই পৌঁছে গিয়েছিলেন কর্নাটকের স্টেডিয়ামে। জয়ের পর ওমর বলেন, ‘‘অনেকেই ভেবেছিলেন এই জয় হয়তো সম্ভব হবে না। তবে আত্মবিশ্বাস যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেটাই প্রমাণিত হয়েছে। সময় এসেছে আমাদের খেলোয়াড়দের ভারতীয় দলের জার্সি পরার।’’ তাঁর কথায় ‘‘এই সাফল্য নতুন প্রজন্মের রোল মডেলদের নিয়ে আসবে। হয়তো ভাল দিন অপেক্ষা করে আছে।’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে