প্রাকৃতিক: সূর্যমুখীর পাপড়ি বা ঘৃতকুমারী গাছের আবর্ত, কিংবা নটিলাসের খোলসের সর্পিল প্যাঁচ (উপরে)— সর্বত্রই রয়েছে ফিবোনাচ্চি সংখ্যাক্রমের অব্যর্থ অনুসরণ।
আমেরিকার মেরিল্যান্ড রাজ্যের হাওয়ার্ড কাউন্টি পুলিশের ডিটেকটিভ লেফটেন্যান্ট রিক পেলের-এর কাছে পৌঁছল অদ্ভুত একটি চিরকুট, যাতে লেখা, “আমি শূন্য দিয়ে শুরু করলাম। আজ কেউ মারা যাবে না।”
এই নোটটি তো সূত্রপাত মাত্র। শীঘ্রই পেলের এক জন ধূর্ত খুনির খোঁজে নেমে পড়বেন, যে ক্রমান্বয়ে খুন করে চলে ফিবোনাচ্চি সংখ্যার ক্রমের উপর ভিত্তি করে। ‘ফিবোনাচ্চি সংখ্যাক্রম’—এমন একটি সংখ্যার ক্রম যেখানে প্রতিটি সংখ্যা তার পূর্ববর্তী সংখ্যা দু’টির যোগফল।
ধারাবাহিক হত্যার ক্রমসূত্র
এ ক্ষেত্রে কিন্তু প্রতিটি হত্যাকাণ্ডে সংখ্যাগুলির অর্থ ভিন্ন ভিন্ন রূপে দেখা দিতে থাকল, যা প্রাথমিক ভাবে হতবাক করে দেয় পেলের এবং তাঁর সহকর্মীদের। এমনিতে ফিবোনাচ্চি সিকোয়েন্সের সংখ্যাগুলি অনেকেরই জানা। ১, ১, ২, ৩, ৫, ৮... এবং পেলের বা তাঁর দলবল নিশ্চিত ভাবে জানেন যে, এই সিকোয়েন্সটি শেষ হয় না। তবে ঘটনাক্রমের প্রতিটি বাঁকেই খুনি যেন তাঁদের থেকে এক ধাপ এগিয়ে। সে কি এক জন সিরিয়াল কিলার, নাকি সে এমন কাজ করছে বিশেষ কোনও উদ্দেশ্যে? ওদিকে খুনের স্তূপ জমতে থাকে। পেলের, তাঁর পুলিশ সহকর্মী ডিটেকটিভ সার্জেন্ট করিনা মন্টুফার আর এরিক ডুমাস, এবং পরামর্শদাতা গণিতবিদ টোমিয়ো কানেকো হত্যাকারীকে শনাক্ত করতে ও ধরতে দৌড়তে থাকেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। কী ভাবে তাকে খুঁজে থামানো যেতে পারে এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড? খুনি কেনই বা পেলের-কে চেনে বলে মনে হচ্ছে? পেন্টাগনই বা কেন তদন্তকে আড়ালে রাখতে আগ্রহী? এবং গোয়েন্দারা কি তার চূড়ান্ত, ভয়ানক অপরাধের আগে খুঁজে পাবে খুনিকে?
উত্তেজক এই গল্পটা আমেরিকান লেখক ডেল ই লেম্যানের ২০১৭-র রহস্য-উপন্যাস ‘দ্য ফিবোনাচ্চি মার্ডারস’-এর। আধুনিক মেরিল্যান্ডের হাওয়ার্ড কাউন্টির পটভূমিতে একটি হত্যারহস্য। কিন্তু ওই যে লতার মতো গল্পের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকে ফিবোনাচ্চি সিকোয়েন্স— তার রহস্য আরও জটিল, আরও বিস্তৃত এবং দীর্ঘায়িত।
প্রকৃতিতে সংখ্যার ছন্দ
গণিত এমনিতেই এক আশ্চর্য, অপার রহস্যের খনি। সংখ্যার ছন্দে আর তালে তালে ঘটে চলে দুনিয়ার কত না ওঠাপড়া। সংখ্যার রূপমাধুরীকে রবীন্দ্রনাথ ইংরেজিতে বর্ণনা করেছেন, “সময় এবং স্থানের আঙিনায় সংখ্যার নৃত্যের ধাপ, যা মায়ার আবেশ বুনছে।” ফিবোনাচ্চি ক্রম এই আবেশের এক সহজ, বাস্তব উদাহরণ— মহান মায়ার এক খণ্ডরূপ মাত্র। কিন্তু এ হয়তো তার সবচেয়ে পরিচিত এবং জনপ্রিয় উদাহরণও। ফিবোনাচ্চি ক্রম এবং প্রকৃতি আর মানুষের কর্মকাণ্ডের মধ্যে তার বিস্তীর্ণ অনুরণন আর অন্ধ অনুকরণ— দুই-ই আমাদের দেখায় যে, একটি অনন্য সংখ্যা-সিরিজ়ের মধ্যেও জমে থাকতে পারে কতটা রহস্য। এর অনুষঙ্গে ঘটে চলে কত কিছু!
যেমন, শঙ্কু-আকৃতির পাইন গাছের ফলের উপর সর্পিল আঁশ। শেয়ার-বাজারের মূল্য তালিকা। আনারসের পৃষ্ঠে অংশগুলির সংখ্যা। ধ্রুপদী স্থাপত্য। মৌমাছি কিংবা খরগোশের প্রজনন। রোমান কবিতা— এদের মধ্যে মিল কোথায়? কুইজ়ের এই আপাত-অদ্ভুত প্রশ্নটার উত্তর হল— কোনও না কোনও ভাবে, প্রকৃতির এই সব এবং সেই সঙ্গে আরও অনেক সৃষ্টি অথবা মানুষের নানা কীর্তি, সবই সংখ্যার এক বিশেষ নাচের তালে বাঁধা। যে নৃত্যছন্দ ত্রয়োদশ শতাব্দীর ইটালীয় গণিতবিদ লিয়োনার্দো ফিবোনাচ্চির নামাঙ্কিত। ফিবোনাচ্চি সংখ্যা, যে সংখ্যার রূপচিহ্ন স্পষ্টতই বিস্তৃত বিশ্ব জুড়ে। অনেক গাছের শাখাপ্রশাখার ধরন, শাখাপ্রশাখায় পাতার অবস্থান এবং অনেক ফুলের পাপড়ির গঠনও ফিবোনাচ্চি সিরিজ়ের সংখ্যা দ্বারা বর্ণনা করা হয়েছে।
সংখ্যার এই আকর্ষণীয় ক্রমটি ফিবোনাচ্চি উল্লেখ করেছিলেন তাঁর বই ‘লাইবার আবাচি’-তে, যার অর্থ ‘গণনার বই’, প্রকাশিত হয়েছিল ১২০২ খ্রিস্টাব্দে, পিসায়। সেখানে ফিবোনাচ্চি সংখ্যার উল্লেখ ছিল খরগোশের সংখ্যা-বৃদ্ধি সম্পর্কিত একটি কাল্পনিক সমস্যার সমাধানের জন্য।
কাল্পনিক খরগোশের একটা প্রজন্ম নিয়ে সেই গল্পটা শুনে মজা লাগতে পারে। একটি পুরুষ আর একটি স্ত্রী, এক জোড়া খরগোশ নিয়ে শুরু করা হয় প্রক্রিয়াটি। ধরে নেওয়া হয় যে, প্রতি জোড়া খরগোশ তাদের জীবনের দ্বিতীয় মাস থেকে প্রতি মাসে জন্ম দেয় এক জোড়া খরগোশের। কেবল প্রথম জোড়াটি জন্ম দেয় প্রথম মাসে, তাই এক মাস পরে খরগোশ হয় দুই জোড়া। এর মধ্যে একটি, অর্থাৎ প্রথম জোড়াটি, দ্বিতীয় মাসে আবার জন্ম দেয় এক জোড়ার; তাই দু’মাস পরে খরগোশ হয় তিন জোড়া। পরের মাসে খরগোশ জন্মায় দু’জোড়া— প্রথম জোড়াটি এবং প্রথম মাসে জন্ম নেওয়া খরগোশ জোড়াটি জন্ম দেয় এক জোড়া করে। এর অর্থ, এ বার মোট খরগোশ হল পাঁচ জোড়া। পরের মাসে নতুন তিন জোড়া খরগোশ সহযোগে খরগোশের মোট সংখ্যা হল আট জোড়া। এ ভাবে চলতে থাকলে প্রতি মাসে কত জোড়া খরগোশ থাকছে, সেই সংখ্যাগুলোই তৈরি করে ফিবোনাচ্চি সংখ্যার ক্রম। এই হিসাবে অবশ্য ক্রমের প্রথম সংখ্যা ‘১’-কে ধরা হয়নি। অবশ্য প্রাথমিক খরগোশ-জোড়া নতুন খরগোশ জন্ম দেয় এক মাস পর থেকে— এই অনুমান করে নিলে মূল ফিবোনাচ্চি সংখ্যাশ্রেণির প্রথম ‘১’ টাও চলে আসে হিসাবে।
সংখ্যাক্রমের স্বীকৃত আবিষ্কারক, ইটালির গণিতবিদ লিয়োনার্দো ফিবোনাচ্চি।
প্রকৃতির গোপন সঙ্কেত
ফিবোনাচ্চি সংখ্যার ক্রম বা সিকোয়েন্সের প্রথম দুটো সংখ্যা ১ এবং ১। এর পর প্রতিটি সংখ্যা তার পূর্ববর্তী দু’টি সংখ্যার যোগফল, ওই যে ক্রম অনুসারে ‘দ্য ফিবোনাচ্চি মার্ডারস’-এর গণিতজ্ঞ খুনি করে যাচ্ছিল তার হত্যাকাণ্ড! অর্থাৎ ১ আর ১ যোগ করে তৃতীয় সংখ্যাটা হবে ২। চতুর্থ সংখ্যা ৩ তৈরি হবে ১ আর ২ যোগ করে। পরের সংখ্যাটা ২+৩=৫। এ ভাবে ক্রমটা চলতে থাকবে সংখ্যার অন্তহীনতার মাঝে একটা নির্দিষ্ট পথ করে, অনন্তের দিকে। ১,১,২,৩,৫,৮,১৩,২১,৩৪, ৫৫, ৮৯... এবং তা চলতেই থাকবে, কখনও শেষ হবে না।
ফিবোনাচ্চি কিন্তু সর্বত্র। এই অনন্য ক্রমটি দেখা যায় বিবিধ মৌলিক জিনিসের মধ্যে। প্রকৃতি ফিবোনাচ্চি-র প্যাটার্নে পরিপূর্ণ। ছায়াপথের সর্পিল বাহু থেকে নানাবিধ প্রাকৃতিক এবং মানব-প্রকৌশলী জিনিসে দেখা যায় ফিবোনাচ্চি ক্রম। এই সংখ্যার ক্রম চোখে পড়বে ডেইজ়ি ফুলের পাপড়িতে। ফুলের পাপড়ির বিন্যাস, উদ্ভিদের পাতার ক্রম, গাছের ডালের জটিল এবং আপাতদৃষ্টিতে এলোমেলো শাখাপ্রশাখা পর্যন্ত, সামুদ্রিক প্রাণী নটিলাসের সর্পিল খোলস, ডিএনএ-প্যাটার্ন, এমনকি হারিকেন-ঘূর্ণিঝড়ও সামঞ্জস্যপূর্ণ নিদর্শন দেখায় এই ক্রমের সঙ্গে। ফিবোনাচ্চি সংখ্যাগুলিকে রূপান্তরিত করা যেতে পারে টাইলস-এ— সংখ্যাগুলি প্রতিটি বর্গক্ষেত্রের বাহুর দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করে। বর্গক্ষেত্রের বিপরীত কোণগুলিকে সংযুক্ত করে তৈরি করা যেতে পারে একটি ফিবোনাচ্চি সর্পিল। পাইন কোনের সর্পিলের সংখ্যা মিলে যায় ফিবোনাচ্চি সংখ্যার সঙ্গে। ৮টি সর্পিল ঘড়ির কাঁটার দিকে এবং ১৩টি সর্পিল ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে। তির্যক দৃষ্টিকোণ থেকে আনারসের দিকে তাকালে দেখা যাবে যে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আঁশের বিন্যাসে ফিবোনাচ্চি ক্রম উপস্থিত।
এ সব মিলেমিশেই ফিবোনাচ্চি ক্রমকে ‘প্রকৃতির গোপন কোড’ বা ‘প্রকৃতির সর্বজনীন নিয়ম’ও বলেন কেউ কেউ। এমনিতে প্রকৃতিতে পাওয়া বেশির ভাগ ফুলেই পাপড়ি-সংখ্যা ফিবোনাচ্চি ক্রম অনুসারে হয়— ১, ৩, ৫, ৮, ১৩ অথবা ২১টি পাপড়ি। খুব কম ফুলেই থাকে ৪, ৬ অথবা ৭টি পাপড়ি। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, যেমন চার-পাপড়ির ক্লোভার।
আবার ভাবা যাক পিয়ানোর অক্টেভের কথা। সেখানে মোট ‘কি’ আছে ১৩টি, আটটি সাদা, পাঁচটি কালো। এগুলি সবই তো ফিবোনাচ্চি সংখ্যা। ভার্জিল এবং অন্যান্য রোমান কবিদের কাজেও খুঁজে পাওয়া গেছে ফিবোনাচ্চি সংখ্যাসূচক নিদর্শন। গ্রিক এবং রোমান ধ্বংসাবশেষের মেঝেয় বিভিন্ন আকারের মোজ়াইক নিদর্শনের মধ্যেও রয়েছে ফিবোনাচ্চি সম্পর্ক।
সোনালি অনুপাতের রহস্য
কম্পিউটারে ডেটা স্টোরেজ এবং তার প্রক্রিয়াকরণেও আজ এই সংখ্যা-ক্রমটির ব্যবহার হচ্ছে। ২০২৩-এও বিজ্ঞান-পত্রিকা ‘নেচার’-এ ‘আ প্রমিসিং অ্যাপ্রোচ ইউজ়িং ফিবোনাচ্চি সিকোয়েন্স-বেসড অপটিমাইজ়েশন অ্যালগরিদমস অ্যান্ড অ্যাডভান্সড কম্পিউটিং’ শীর্ষক এক গবেষণাপত্রে একটি বৃহৎ মাপের রেলওয়ে সেতুর জন্য একটি অভিনব ফিবোনাচ্চি সিকোয়েন্স-ভিত্তিক অপটিমাইজ়েশন অ্যালগরিদম এবং আধুনিক কম্পিউটিং কৌশল ব্যবহার করে তার গঠনের তত্ত্বাবধান অনুসন্ধান করা সম্ভব হয়েছে।
ফিবোনাচ্চি সংখ্যার স্রোতের মধ্যে কিন্তু লুকিয়ে আছে আরও অনেক রহস্য। দু’-একটা উদাহরণ নেওয়া যাক। ফিবোনাচ্চি সিকোয়েন্সের প্রতি তৃতীয় পদ, তৃতীয়, ষষ্ঠ, নবম, দ্বাদশ ইত্যাদি, ২ দ্বারা বিভাজ্য; প্রতিটি চতুর্থ পদ, চতুর্থ, অষ্টম, দ্বাদশ, ষোড়শ ইত্যাদি, ৩ দ্বারা বিভাজ্য; প্রতিটি পঞ্চম পদ ৫ দ্বারা বিভাজ্য; প্রতিটি ষষ্ঠ পদ ৮ দ্বারা বিভাজ্য; প্রতিটি সপ্তম পদ ১৩ দ্বারা বিভাজ্য ইত্যাদি।
ফিবোনাচ্চি ক্রমের আর একটা নান্দনিক রহস্য হল ‘সোনালি অনুপাত’ বা ‘গোল্ডেন রেশিয়ো’। দেখানো যায় যে, যে কোনও দু’টি ধারাবাহিক ফিবোনাচ্চি সংখ্যার বড়টির সঙ্গে ছোটটির অনুপাত ১ থেকে ১.৬১৮-এর মধ্যে। পর পর এই অনুপাত বার করতে থাকলে দেখা যাবে, সামান্য ওঠাপড়া নিয়েও তা ক্রমেই পৌঁছে যায় ১.৬১৮-এর কাছাকাছি। মোটামুটি প্রথম দশটি অনুপাতেই তা পৌঁছয় ওই মানের ধারেকাছে। ১.৬১৮ আবার অঙ্কের দুনিয়ায় একটা গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা, যা ‘গোল্ডেন রেকট্যাঙ্গল’ বা ‘সোনালি আয়তক্ষেত্র’-এর দু’টি বাহুর অনুপাত। একে বলে ‘সোনালি অনুপাত’। ফিবোনাচ্চি নিজে অবশ্য এই ক্রমানুসারে ধারাবাহিক সংখ্যার অনুপাতের সীমা হিসেবে ‘গোল্ডেন রেশিয়ো’ সম্পর্কে কিছু বলেননি।
তবে ঐতিহ্যগত ভাবেই শিল্পী ও স্থপতিরা দীর্ঘকাল ধরেই এই অনুপাত ব্যবহার করে আসছেন চোখের পক্ষে সবচেয়ে আনন্দদায়ক প্রভাব তৈরি করতে। লিয়োনার্দো দা ভিঞ্চি গোল্ডেন রেশিয়ো ব্যবহার করেছেন তাঁর ‘লাস্ট সাপার’, ‘ভিট্রুভিয়ান ম্যান’, এমনকি ‘মোনালিসা’-তেও। মাইকেলেঞ্জেলো, রাফায়েল, রেমব্রান্ট, জর্জেস সেউরাত এবং সালভাদোর দালি-ও গোল্ডেন রেশিয়ো প্রয়োগ করেছেন তাঁদের কাজে। গিজ়ার গ্রেট পিরামিডে ভিত্তির প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য ৭৫৬ ফুট এবং উচ্চতা ৪৮১ ফুট। তাই ভিত্তির উচ্চতার অনুপাত প্রায় ১.৫৭১৭, যা সোনালি অনুপাতের খুব কাছাকাছি। প্রাচীন গ্রিক ভাস্কর ফিডিয়াস আবার পার্থেননের জন্য তৈরি ভাস্কর্যগুলির নকশায় সোনালি অনুপাত প্রয়োগ করেছিলেন বলে জানা যায়। ইউক্লিড একে একটি পাঁচ-পার্শ্বযুক্ত মূর্তি নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। অতি আধুনিক কালে, ১৯৭০-এর দশকে, ব্রিটিশ পদার্থবিদ রজার পেনরোজ় তাঁর ‘পেনরোজ় টাইলস’-এ অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন এই সোনালি অনুপাতকে।
আবিষ্কারকের অনুসন্ধান
ফিবোনাচ্চি ছিলেন পিসা প্রজাতন্ত্রের এক ইটালীয় গণিতবিদ, যাঁকে মধ্যযুগের সবচেয়ে প্রতিভাবান পশ্চিমি গণিতবিদও বলা হয়। উনিশ শতকে ফিবোনাচ্চির মূর্তি স্থাপিত হয় পিসায়, যা আজও আছে ক্যাম্পোসান্তোর পশ্চিম গ্যালারিতে। আসলে বেশ কয়েকশো বছর পরে, ফিবোনাচ্চির নাম আবার উঠে আসে অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে। বিখ্যাত গণিতবিদ লুকা প্যাসিয়োলির লেখা পড়ার সময়, গণিতবিদ পিয়েত্রো কোসালি এমন একটি নাম লক্ষ করেন, যা তিনি আগে কখনও শোনেননি। হ্যাঁ, সেই নামটিই ফিবোনাচ্চি।
তার পর ১৮৭৭ সালের আগে ফরাসি গণিতবিদ এডুয়ার্ড লুকাস খরগোশের বংশবৃদ্ধি সংক্রান্ত এই বিশেষ সংখ্যামালাটিকে চিহ্নিত করেন ‘ফিবোনাচ্চি ক্রম’ বা ‘ফিবোনাচ্চি সিকোয়েন্স’ হিসেবে। স্পষ্টতই ফিবোনাচ্চির কাজের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এই নামকরণ। ১৯৬০-এর দশকের মধ্যেই ফিবোনাচ্চির প্রকৃত অর্জনগুলি স্বীকৃতি পায় বিশ্বময়।
ফিবোনাচ্চির ১২০২ সালের বইটি, ‘লাইবার আবাচি’, পশ্চিমি বিশ্বে সূচনা করে আধুনিক পাটিগণিতের। দুর্দান্ত গণিতবিদ ফিবোনাচ্চি পশ্চিমি দুনিয়াকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের জন্মভূমি হিসেবে পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্য করেছিলেন বটে, তবুও এক সময় তিনি কয়েক শতকের জন্য হারিয়ে যান ইতিহাস থেকে। সাম্প্রতিক অতীতে তাঁর প্রকৃত মূল্যায়নের চেষ্টা করেছেন কিথ ডেভলিন। এই অনুসন্ধানের ফসল ২০১৭-তে ডেভলিনের লেখা ফিবোনাচ্চির জীবনীমূলক বই ‘ফাইন্ডিং ফিবোনাচ্চি: দ্য কোয়েস্ট টু রিডিসকভার দ্য ফরগটন ম্যাথম্যাটিক্যাল জিনিয়াস হু চেঞ্জডদি ওয়ার্ল্ড’।
ডেভলিনের বইটা ফিবোনাচ্চির গল্প বলার ক্ষেত্রে দশ বছরের প্রচেষ্টার একটি আকর্ষণীয় প্রত্যক্ষবিবরণ। ডেভলিন নিজে এক জন গণিত-বিশ্লেষণকারী। তিনি ইটালীয় গণিতবিদ ফিবোনাচ্চির জীবন ও উত্তরাধিকার নিয়ে গবেষণা শুরু করেন ২০০০ সালে। একটি ডায়েরি লিখেছিলেন, যাতে বিস্তারিত বর্ণনা দেন এই প্রকল্পের।
ভারতীয় পিঙ্গল সূত্র
কিথ ডেভলিন তাঁর বইতে বলেছেন, “লিয়োনার্দো যে আবিষ্কারটি সম্পর্কে লিখেছিলেন তা ছিল সংখ্যা লেখার এবং গণনা করার একটি অসাধারণ নতুন উপায়।” বাস্তবে কিন্তু উপায়টাকে নতুন রূপে পশ্চিমি দুনিয়ার সামনে বিকশিত করলেও, সম্ভবত সেটা একেবারে ‘নতুন’ ছিল না। ফিবোনাচ্চির নামে সিকোয়েন্সটির নামকরণ হলেও তিনি এটি আবিষ্কার করেননি, অনেক আগে থেকেই ভারতীয় গণিতবিদদের কাছে পরিচিত ছিল এটি, এমন দাবি করা হয়েছে বার বার।
প্রাচীন ভারত অঙ্কে দড় ছিল অবশ্যই। শূন্যের আবিষ্কার হয়েছিল এ দেশেই। তথ্য সহযোগে অনেকেই দেখিয়েছেন যে, প্রাচীন ভারতীয় গণিতবিদরা ফিবোনাচ্চি ক্রমটিও আবিষ্কার করেছিলেন অনেক আগেই। এ প্রসঙ্গে নানা আর্টিকল ঘেঁটে চারটি নাম পাচ্ছি। প্রথমত, ২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সংস্কৃত কাব্যিক ছন্দ বিষয়ে তাঁর রচনায় এই ক্রমটি প্রথম বর্ণনা করেছিলেন আচার্য পিঙ্গল। তাঁর বই ‘ছন্দশাস্ত্র’-এ তাই ক্রমটির ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন পিঙ্গলই, বলা হয় এমনটাই। ‘ছন্দশাস্ত্র’ সম্ভবত সংস্কৃত ছন্দের উপর প্রাচীনতম গ্রন্থ। তাঁর রহস্যময় সূত্র, ‘মিশৌ চ’, যার অর্থ, ‘দু’টি মিশ্রিত’— নির্দিষ্ট সংখ্যক তাল-সহ কাব্যিক ছন্দে নিদর্শনগুলির সংখ্যা গণনা করার জন্য হয়েছিল এর ব্যবহার। পরবর্তী কালে ভারতীয় গণিতবিদরা আরও বিস্তৃত করেছিলেন এই ধারণাটিকে। ৭০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ের ভারতীয় ছন্দবিদ ও গণিতবিদ বীরহঙ্কের প্রচেষ্টার মাধ্যমে স্পষ্টতা লাভ করে এই ক্রমটি। সংখ্যা তৈরির পদ্ধতিগুলি সম্পর্কে আরও বিশদ ভাবে বর্ণনা করেছিলেন গোপালা, মোটামুটি ১১৩৫ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ। তার পর দ্বাদশ শতাব্দীর কবি, গণিতবিদ ও দার্শনিক আচার্য হেমচন্দ্র ১১৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এই ক্রমটি আরও জনপ্রিয় করে তোলেন তাঁর লেখায়।
তবে এটাও ঠিক যে, সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে এই ক্রমটির স্থায়ী আকর্ষণ এবং প্রয়োগ, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সীমানা অতিক্রমকারী গাণিতিক ধারণার কালজয়ী প্রকৃতিকে তুলে ধরে। সেই সঙ্গে এটাও অনস্বীকার্য যে, আধুনিক কালে ফিবোনাচ্চি ক্রম জনপ্রিয় হয়েছে ত্রয়োদশ শতকের ইটালীয় গণিতবিদের সূত্র ধরেই। এবং গণিতবিদ এডুয়ার্ড লুকাসই সেই পরিচিতি দেওয়ার প্রধান রূপকার।
জনপ্রিয়তার রহস্য
কিন্তু ‘ফিবোনাচ্চি’ নামের এই সংখ্যার ক্রমটি এমন সর্বব্যাপী হতে পারল কী ভাবে? আসলে এই ক্রমটি গড়ে ওঠার সূত্রটি অতীব সহজ, যে কোনও সংখ্যা কেবল তার পূর্ববর্তী সংখ্যা দুটির যোগফল। গাণিতিক চৌহদ্দিতে এর চেয়ে কঠিন সূত্র রয়েছে ভূরি ভূরি। তবু গণিতে এবং সম্ভবত বাস্তবজগতের অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় সহজ পুনরাবৃত্ত নিয়ম দ্বারা, যেখানে প্রতিটি ঘটনা পরিচালিত হয় পূর্ববর্তী ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কোনও এক সহজ সূত্র দিয়েই।
ভেবে আশ্চর্য হতে হয় যে, ফিবোনাচ্চি ক্রম বাজারের কেনাবেচাতেও কার্যকর। বাজার বলতে শেয়ার-বাজারের কথা বলছি এখানে। শেয়ারের একটি বড়সড় মূল্য বৃদ্ধির পর দাম কিছুটা কমে যেতে পারে, বা একটি শক্তিশালী মূল্য পতনের পর দাম কিছুটা বাড়তে পারে। এই প্রাথমিক বিপরীতমুখী গতিকে বলা হয় ‘রিট্রেসমেন্ট’। রিট্রেসমেন্ট লেভেল নানা ভাবে সাহায্য করে ট্রেডারদের। বুঝতে সাহায্য করে এন্ট্রি পয়েন্ট, সম্ভাব্য ‘পুলব্যাক’ বা ‘কারেকশন’ স্তরগুলি। এবং, কী আশ্চর্য, এই স্তরগুলিও সাধারণত গণনা করা হয় ফিবোনাচ্চি অনুপাত ব্যবহার করে। যেমন, গুরুত্বপূর্ণ যে শতাংশগুলি ব্যবহার করা হয় এ জন্য, তার মধ্যে রয়েছে ৩৮.২ শতাংশ, ৫০ শতাংশ, এবং ৬১.৮ শতাংশ। টেকনিক্যাল বিশ্লেষণকারীরা ফিবোনাচ্চি ক্রমের সংখ্যার অনুপাতের সঙ্গে সম্পর্কিত সংখ্যার সম্পূর্ণ সারণি থেকে সহজেই বার করে নেন এই শতাংশগুলির মান। কিন্তু দেখা যাক, এই সংখ্যাগুলি কী ভাবে ফিবোনাচ্চি ক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন, আগেই আমরা দেখেছি যে, একটি মাত্রার পর থেকে যে কোনও ফিবোনাচ্চি সংখ্যাকে তার পরের সংখ্যা দ্বারা ভাগ করলে মোটামুটি ০.৬১৮ হয়। ওদিকে একটি মাত্রার পরে কোনও ফিবোনাচ্চি সংখ্যাকে ক্রমের দুই স্থান পরে থাকা সংখ্যাটি দিয়ে ভাগ করলে কিন্তু হয় প্রায় ০.৩৮২। তাই এ সবই যেন গণিতের এক রহস্যময় শিকলে বাঁধা।
গল্প-উপন্যাস-সিরিজ়-গান
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতবিদ তারা হোলম বলেছিলেন, ফিবোনাচ্চি সংখ্যা নাকি সর্বদা আনন্দ দেয় গণিতবিদদের। কিন্তু এটাও ঠিক যে, সেই সঙ্গে সংখ্যার ফিবোনাচ্চি ক্রম নিয়ে আগ্রহ গণিতের বাইরেও বহুবিস্তৃত। প্রকৃতি ও বাস্তবজগতে এই প্যাটার্নটি দেখা যায় প্রায়শই নানা ভাবে। হয়তো বা প্যাটার্নটির গাণিতিক নিয়ম সহজ বলেও জনসংস্কৃতিতে বার বার উঁকি দিয়েছে ফিবোনাচ্চি সিরিজ়। শুধু ‘দ্য ফিবোনাচ্চি মার্ডার’ই নয়, নানা সময়ে গল্প-উপন্যাসে, চলচ্চিত্রে বা টিভি সিরিজ়ে ঘুরেফিরে এসেছে ফিবোনাচ্চি সংখ্যার উল্লেখ। ‘দ্য দা ভিঞ্চি কোড’ বইয়ে যেমন ফিবোনাচ্চি সিকোয়েন্স ব্যবহৃত হয়েছে দু’ভাবে। একটি সেফ-ডিপোজ়িট বাক্স খোলার পাসওয়ার্ড হিসেবে, এবং একটি বার্তা স্ক্র্যাম্বল করা হয়েছে তা বোঝাতে। সংখ্যাগুলি বিকৃত ভাবে মেঝেয় লেখা থাকে ইঙ্গিত করার জন্য যে বার্তাটি নিজেই একটি অ্যানাগ্রাম, বিকৃত ভাবে সাজানো, এবং তা পুনরায় সাজানো প্রয়োজন। গল্পের পরের দিকে, ফিবোনাচ্চি সিকোয়েন্স ব্যবহৃত হয় একটি ক্রিপ্টেক্স বা ধাঁধার বাক্স খোলার জন্য সূত্র হিসেবে। প্রকাশিত হয় একটি নলাকার ভল্টে প্যাপিরাসে লেখা লুকানো বার্তা।
আমেরিকান মিউজ়িশিয়ান ডক্টর স্টিল-এর ২০০১-এর অ্যালবাম ‘পিপল অব আর্থ’-এ ছিল ‘ফিবোনাচ্চি সিকোয়েন্স’ গানটি। “মেক মি (ওয়ান)/ কপি অ্যান্ড পেস্ট। রিপিট/ মেক মি (ওয়ান)/ কপি অ্যান্ড পেস্ট। রিপিট/ মেক মি (টু)/ কপি অ্যান্ড পেস্ট। রিপিট/ মেক মি ফিবোনাচ্চি/ মেক মি (থ্রি)/ কপি অ্যান্ড পেস্ট। রিপিট/ মেক মি (ফাইভ)/ কপি অ্যান্ড পেস্ট। রিপিট/ মেক মি (এইট)/ কপি অ্যান্ড পেস্ট। রিপিট/ মেক মি ফিবোনাচ্চি।”
আবার ‘রোল রতি জ্যায়সে ব্যারেল/ ফিবোনাচ্চি ওয়ালা স্পাইরাল’ এই লাইনদুটো রেমো ডি’সুজ়া পরিচালিত এবং টাইগার শ্রফ অভিনীত ২০১৬ সালের বলিউড সুপারহিরো সিনেমা ‘আ ফ্লাইং জাট’-এর অন্তর্গত ভায়ুর গান ‘বিট পে বুটি’ থেকে নেওয়া।
হিপ হপ-এর গায়ক জুড়ি ব্ল্যাক স্টার-এর ১৯৯৮-এর অ্যালবাম ‘মস ডেফ অ্যান্ড তালিব কোয়েলি আর ব্ল্যাক স্টার’-এর গান ‘অ্যাস্ট্রোনমি (এইটথ লাইট)’-এর কোরাস থেকেও স্মরণ করা যাক ক’টা লাইন, যার অনুবাদ মোটামুটি এ রকম হতে পারে, “এ বার সবাই একটার উপর ঝাঁপ দাও, দুটোর শব্দ।/ এটা তৃতীয় চোখের দৃষ্টি, পাঁচ পার্শ্বীয় মাত্রা।/ অষ্টম আলো, আজ রাতে জ্বলবে উজ্জ্বলভাবে।” ১-২-৩-৫-৮, এও তো একেবারে ফিবোনাচ্চি সংখ্যাক্রম ছাড়া আর কী!
তারিখ ধরে চিহ্নিত দিন
বচ্ছরকার হাজার গন্ডা বিশেষ দিনের মধ্যে ফিবোনাচ্চি দিনটাও কিন্তু ঢুকে গিয়েছে সেই জনসংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে। হ্যাঁ, প্রতি বছর ২৩ নভেম্বর পালিত হয় ‘ফিবোনাচ্চি দিবস’ হিসেবে। কারণটা সহজ, এই তারিখটিকে এমএম/ডিডি ফর্ম্যাটে লিখলে হয় ১১/২৩, যা ফিবোনাচ্চি সিরিজ়ের প্রথম চারটি সংখ্যা দিয়ে তৈরি। ঠিক যেমন, মার্চ মাসের ১৪ তারিখকে বলা হয় ‘পাই ডে’ কারণ, এমএম/ডিডি ফর্ম্যাটে সে দিনটা ০৩/১৪, আর আমরা তো জানি যে পাই-এর কাছাকাছি মান হিসেবে ধরা হয় ৩.১৪কে। সে ভাবেই এই ফিবোনাচ্চি দিবস। তবে কবে যে প্রথম এই উদ্যাপনটা হয়, বা কে করেন, তার সঠিক তথ্য পাইনি খুঁজে। যদিও ২০১০ সালে এই দিনটা পালন করা হয়েছে, এমন তথ্য মিলছে। তার পর ২০১৭ সাল নাগাদ সমাজমাধ্যম এবং ছুটির ওয়েবসাইটগুলিতে উল্লেখ পাওয়া যায় এই বিশেষ দিনটির।
সব মিলিয়ে তাই সংখ্যার নিয়ম আর তার জটিল শৃঙ্খলও একটি দিনকে বিশেষ করে তুলতে পারে। এ যেন গাণিতিক নিয়মে বাঁধা মহাকালের একটি বিশেষ নৃত্যছন্দের এক উৎসবঘন উদ্যাপন।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে