অতিথিকে ছাদ দিতে স্কুল সিপিএমের

অ-এ অবরোধ, আ-এ আন্দোলন! স্কুল খুলছে সিপিএম। শেখানো হবে, কী ভাবে গড়ে তুলতে হয় গণ-আন্দোলন। পড়ানো হবে মার্ক্সবাদী তত্ত্ব।

Advertisement

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০৩:৪৬
Share:

অ-এ অবরোধ, আ-এ আন্দোলন! স্কুল খুলছে সিপিএম। শেখানো হবে, কী ভাবে গড়ে তুলতে হয় গণ-আন্দোলন। পড়ানো হবে মার্ক্সবাদী তত্ত্ব।

Advertisement

দিল্লিতে প্রয়াত হরকিষেণ সিংহ সুরজিতের নামে একটি বাড়ি তৈরি করে সেখানে পার্টির স্কুল তৈরির পরিকল্পনা করেছিলের প্রকাশ কারাট। বছর ছয়েক আগের কথা। তখন অনেকেই বেজিংয়ের চিনা কমিউনিস্ট পার্টির স্কুলের সঙ্গে সেই ভাবনার মিল খুঁজে পেয়েছিলেন। যেখানে চিনা সরকার ও কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতারা এসে মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্ব পড়িয়ে যান। ঠিক হয়েছিল, দিল্লির রউস অ্যাভিনিউয়ের এই স্কুলেও গোটা দেশ থেকে পার্টির ক্যাডাররা এসে থাকবেন। মার্ক্সবাদে দীক্ষিত হবেন। মাথায় বোঝাই করে নিয়ে যাবেন দলের রাজনৈতিক আদর্শ।

বৃহস্পতিবার সেই স্কুলের শিলান্যাস। কিন্তু গত ছয় বছরে হোয়াংহো দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গিয়েছে। আর যমুনাও জল কমতে কমতে শুকিয়ে গিয়েছে অনেক। একেবারে সিপিএমের মতোই! এই ছ’বছরে সিপিএমের সাংসদ সংখ্যা কমেছে অনেক। দিল্লিতে সাংসদদের ফ্ল্যাট ও বাংলোতেই সিপিএমের নেতা-কর্মীরা ভাগাভাগি করে থাকেন। ভোটে হেরে সাংসদদের ফ্ল্যাট-বাংলোর সংখ্যা কমায় সেই জায়গাতেও টান ধরেছে। অথচ দিল্লিতে নিযুক্ত পার্টির নেতা-কর্মীদের থাকার জায়গাই শুধু নয়, চাপ বেড়ে যায় দলের গুরুত্বপর্ণ বৈঠকগুলির সময়ে। তখন বাইরের রাজ্যগুলি থেকেও নেতারা ভিড় জমান দিল্লিতে।

Advertisement

সিপিএমের নেতাদের চোখে স্কুল তা-ই এখন হয়ে উঠেছে অতিথিশালা। শিলান্যাসের আগে যাঁকেই জিজ্ঞাসা করা হোক, সুরজিৎ ভবন তৈরি হলে কী সুবিধা হবে? উত্তর মিলবে, অনেকের থাকার জায়গা হবে। এখন কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে যোগ দিতে এলেও বিভিন্ন রাজ্যের প্রতিনিধিরা রাজ্য সরকারি অতিথিশালায় আশ্রয় নেন। তার জন্য ভাড়াও গুনতে হয়। পার্টি স্কুলেই মাথা গোঁজার ঠাঁই হলে সেই খরচ বাঁচবে। দিল্লিতে নিযুক্ত পার্টি কর্মীরাও দরকারে সেখানে আশ্রয় নিতে পারবেন।

সিপিএমের নেতারা অবশ্য দাবি করছেন, শুধু অতিথিশালা হিসেবেই নয়। দলের মতাদর্শগত কৌলীন্য বজায় রাখতে এবং পার্টির নিজস্ব শক্তিবৃদ্ধির জন্য পার্টি স্কুলের গুরুত্ব অপরিসীম। কলকাতায় সদ্য অনুষ্ঠিত প্লেনামেও বলা হয়েছে, সুরজিৎ ভবন তৈরির পরে পার্টির ক্যাডারদের নিয়মিত ভাবে স্কুলে পাঠাতে হবে। এর আগে শুদ্ধিকরণ অভিযানের সময়েও পার্টি দলিলে স্কুলের উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। তখন বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গে বহু দিন ক্ষমতায় থাকায় দলে বেনো জল ঢুকেছে। এদের না আছে মার্ক্সবাদের শিক্ষা, না আছে দলের আদর্শ সম্পর্কে কোনও ধারণা। এই ক্যাডার-বাহিনীকে শিখিয়ে পড়িয়ে তৈরি করে নেওয়ার জন্যই স্কুলের দরকার।

প্লেনামে সিদ্ধান্ত হয়েছে, এ কে গোপালন ভবনে পার্টি সেন্টারের নেতাদেরই হাতেই থাকবে স্কুলের দায়িত্ব। আমন্ত্রণ জানানো হবে বামপন্থী তাত্ত্বিক ও শিক্ষাবিদদের। শুধু দলের মতাদর্শ নয়, পড়ানো হবে ইতিহাস, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানও। উদারবাদী অর্থনীতির খারাপ দিক থেকে লাতিন আমেরিকায় বামপন্থার অবদান, চিন বা উত্তর কোরিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সিপিএমের পার্থক্য একেবারে নোট লিখিয়ে মুখস্ত করিয়ে দেওয়া হবে।

স্কুল তো খুলবে। প্রশ্ন হল, তাতে কি দলের রাজনৈতিক শক্তি বাড়বে?

এ কে গোপালন ভবনে বহু দিন কাটানো এক নেতার মন্তব্য, ‘‘এমনিতেই মতাদর্শ আঁকড়ে ধরে থাকার ঠেলায় জাতীয় রাজনীতিতে কোণঠাসা অবস্থা। মতাদর্শ থাকবে না ভোটে জেতার কথা ভাবা হবে, তাই নিয়েই দলের নেতারা দুই শিবিরে বিভক্ত। এ বার পাঠশালা খুলে মতাদর্শ পড়ালে যে কী হবে, ভাবতেই ভয় করছে।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement